নেপথ্যের নায়ক ডমিঙ্গো
ছবি: ফাইল
আলী সেকান্দার, রাজকোট থেকে
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০১৯ | ০১:৫৪
দেশের ক্রিকেটে তখন উল্টো হাওয়া, ক্রিকেটারদের ধর্মঘট, ছাড়পত্র না নিয়ে টেলকো কোম্পানির সঙ্গে সাকিবের বাণিজ্যিক চুক্তি এবং আইসিসি অ্যান্টিকরাপশন ইউনিট কর্তৃক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেট। কঠিন হয়ে পড়েছিল জাতীয় দলের খেলায় ফোকাস করা। ঠিক তখনই ক্রিকেটারদের এক ছাতার নিচে নিয়ে আসেন রাসেল ডমিঙ্গো। খেলোয়াড়দের আগলে রাখলেন আপন সন্তানের মতো করে। সাকিব-বিচ্ছেদে হতাশ খেলোয়াড়দের বুকে টেনে নিয়ে সাহস দিয়ে গেছেন এই কোচ।
নানা ইস্যুতে জেরবার দলকে পুনর্গঠন করেছেন এক সপ্তাহের মধ্যে। তাই দিল্লিতে টাইগারদের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের রূপকার বলতে হবে প্রধান কোচ রাসেল ডমিঙ্গোকেই। তিনি যে খেলোয়াড়দের জন্য এত বেশি নিবেদিত প্রাণ, কে জানত। বাইরের কেউ জানুক আর নাই জানুক, কোচের অবদান জানেন ক্রিকেটাররা। মুশফিকুর রহিম তাই ধন্যবাদ জানিয়ে ডমিঙ্গোর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
একজন ভালো কোচ শুধু ক্রিকেট নিয়েই থাকেন না। কখনও মেন্টর, কখনও অভিভাবক, কখনও বা বন্ধু হয়ে খেলোয়াড়দের পাশে দাঁড়ান। ডমিঙ্গো যে সেই চরিত্রের একজন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। জাতীয় দলের সাপোর্ট স্টাফের একজন জানান, বাংলাদেশ দল দিল্লি পৌঁছানোর পর থেকেই ক্রিকেটারদের নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন এই দক্ষিণ আফ্রিকান। যাকে যেভাবে বোঝানো যায় সেই পথ বেছে নিয়েছিলেন তিনি। সাকিব আল হাসানকে হারানোর বেদনায় কাতর খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করেছেন।
খেলার মাঠে ফোকাস ফেরানোর সব পথ তো তারই করে দেওয়া। অথচ দক্ষিণ আফ্রিকান এই কোচ বাইরের কাউকেই ঘুণাক্ষরে বুঝতে দেননি ক্রিকেটারদের জন্য কতটা করে যাচ্ছেন তিনি। বরং ১ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে আড়াল করে সাকিব ইস্যুতে ক্রিকেটারদের আবেগের প্রতি সম্মান দেখান। সেদিক থেকে দেখলে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম টি২০ জয়ের আসল নায়ক হলেন ডমিঙ্গো।
দিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা হলেই হাস্যোজ্জ্বল মুখে কুশল বিনিময় করে গেছেন ডমিঙ্গো। প্রত্যুরে তার কুশল জানতে চাওয়া হলে বলেছেন, 'আমি সব সময় ভালো থাকি।' এটা তার মানসিকতার উদার দিক। কতটা ইতিবাচক হলে একজন মানুষ কঠিন সময়েও নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে পারে। রোববারের আগে ডমিঙ্গোর কাছে যতবারই বাংলাদেশ দলের হালচাল জানতে চাওয়া হয়েছে, ততবারই তিনি বলেছেন, 'দল ভালো। খেলোয়াড়রা শান্ত। তারা খেলায় ফোকাস করছে। প্রস্তুতি ঠিকঠাক হচ্ছে। কোনো সমস্যা নেই। দেখে নিও ভালো খেলবে তারা।'
ভারতের বিপক্ষে টি২০ সিরিজের প্রথম ম্যাচ জিতে ক্রিকেটাররাও কোচের কথার প্রমাণ দিলেন। তারা ভালো থেকে ক্রিকেটে ফোকাস রেখেছেন। গত পরশু ভারতকে সাত উইকেটে হারিয়ে টি২০-তে নতুন ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। যে ম্যাচে তরুণ এবং অভিজ্ঞ ক্রিকেটাররা দারুণ পারফরম্যান্স করেন। চোখ ধাঁধানো বোলিং এবং ব্যাটিংয়ে ছিল আত্মবিশ্বাসের ছাপ। মুশফিক-মাহমুদুল্লাহরা পরিণত হওয়ার প্রমাণ দিয়ে গেছেন ম্যাচ জিতিয়ে। আর এই আলোড়ন তোলা পারফরম্যান্সের রূপকার হলেন প্রধান কোচ ডমিঙ্গো। অভিজ্ঞ এবং তরুণদের নিয়ে একটা ভালো দল সাজিয়েছেন তিনি। তাদের সবাইকে একসুতায় বেঁধেছেনও।
মুশফিক তাই তো বললেন, 'আমাদের প্রধান কোচকে আমরা ধন্যবাদ দিই। গত তিন সপ্তাহে যে অবস্থা চলছিল, সেখান থেকে তিনি দলকে একটা জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছেন। বিশেষ করে তরুণদের নিজের মতো করে খেলার স্বাধীনতা দেওয়া, ওদের দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে উপস্থাপন করার কাজটা তিনি করেছেন।' মুশফিকের এই কয়েকটি বাক্যই বলে দেয় ক্রিকেটারদের জন্য তিনি কতটা আন্তরিক। গতকাল যখন ডমিঙ্গোর এই গুণের কথা বলা হলো তিনি তখন লজ্জায় মুখ লুকাতে চাইলেন। শুধু বললেন, 'ধন্যবাদ। ছেলেরা ভালো খেলেছে, তাতেই আমি খুশি। আরও ভালো খেলতে হবে। অনেক মেধাবী ক্রিকেটার আছে এই দলটায়।' অথচ তিনি যে এত কিছু করলেন, তার প্রশংসাটুকুও নিতে চাচ্ছিলেন না।