ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাক্ষাৎকারে গামিনি

কিছু লোক আমাকে হিংসা করত

কিছু লোক আমাকে হিংসা করত
×

ছবি- বিসিবি

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:৪০ | আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:০২

শ্রীলঙ্কান কিউরেটর গামিনি ডি সিলভা ২০১০ সালে দুই বছরের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। এরপর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামেই কাটিয়ে দিয়েছেন ১৬টি বছর। তাঁর কাজ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও বিসিবির কাছ থেকে পেয়েছেন সমর্থন। চুক্তি শেষ হওয়ার আগেই নবায়ন করেছে বোর্ড। তবে দেড় দশকে তাঁর সমালোচনাও কম হয়নি। কেমন ছিল কিউরেটর গামিনির এই সফর– বিদায় বেলায় তা নিয়ে মুখ খুললেন। তিক্ততা ও অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেকান্দার আলী।  

সমকাল: মিরপুরের উইকেট নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। আপনি কি নিজ থেকে স্লো ও লো উইকেট বানাতেন?
গামিনি:
যারা সমালোচনা করেছে, তারা ক্রিকেট বোর্ডের কেউ না। বাইরের লোকেরা কথা বলেছে। যা কিছু করা হয়েছে, সবই স্বাগতিকতার সুবিধা নেওয়ার জন্য। বিসিবি পরিচালকরা যে নির্দেশনা দিতেন, আমি সেটা অনুসরণ করেছি। আমি নিজে থেকে কিছু করিনি। কারণ এখানে আমার কোনো স্বার্থ নেই। আমাকে এখানে রাখাই হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের চাহিদা পূরণের জন্য। আমি সুস্পষ্ট করে বলতে চাই– আমার পছন্দে কোনো দিন উইকেট তৈরি করিনি। 

সমকাল: টিম ম্যানেজমেন্টের চাওয়া কী থাকত?
গামিনি:
দলের সক্ষমতা অনুযায়ী তারা বলত আমরা এ ধরনের উইকেটে খেলতে চাই। সিরিজ জেতার জন্য কন্ডিশন প্রস্তুত করতে হতো।

সমকাল: বিসিবি থেকেও আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। ভালো উইকেট বানাতে পারেন না। আপনার আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ সম্পর্কে কী বলবেন? 
গামিনি:
এক জায়গায় লম্বা সময় থাকলে, ভালো কাজ করলে কিছু শত্রু তৈরি হয়। ওই মানুষগুলো পেছনে কথা বলত এবং আমার ক্ষতি করার চেষ্টা থাকত। তাদের হাতে কোনো ক্ষমতা ছিল না। ফলে তারা সমালোচনা করতে পছন্দ করত। যদিও ওই মানুষগুলো আমার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। আমি খারাপ হলে, খারাপ কাজ করলে ১৬ বছর বাংলাদেশ কিউরেটর থাকতে পারতাম না। বিসিবি আমার কাজে খুশি ছিল বলেই থাকা সম্ভব হয়েছে। 

সমকাল: পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচ টি২০ সিরিজের উইকেট নিয়ে খুব সমালোচনা হয়েছে। তাদের কোচ প্রথম থেকে বলেছে খারাপ উইকেটে খেলা হচ্ছে। বিসিবি ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের চেয়ারম্যান নাজমুল আবেদীন বলেছেন, বাংলাদেশ কোচ উইকেট নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিল। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?
গামিনি:
পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজে সব ঘাস তুলে ফেলা হয়েছিল। কারণ এখানে প্রচুর ক্রিকেট খেলা হয়েছে। বৃষ্টি মৌসুম থাকায় পিচ শুকাতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা হোম কন্ডিশনের সুবিধা নেওয়ার জন্য উইকেট বানাতে বলা হয়েছিল। টিম ম্যানেজমেন্টের চাওয়া মতো উইকেট হওয়ায় বোলিং ভালো করেছে। সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জিতেছে। শেষ ম্যাচটি স্পোর্টিং উইকেটে খেলায় ভালো করতে পারিনি। বুঝতেই পারছেন কোনো কিছুই আমার ইচ্ছায় হয়নি, বিসিবি ও জাতীয় দল থেকে যেভাবে চাওয়া হয়েছে, সেই উইকেট দেওয়া হয়েছে। 

সমকাল: ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের উইকেট নিয়ে খুব সমালোচনা হয়েছিল। ওই স্লো উইকেট মিথ্যা আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল ক্রিকেটারদের। এ জন্য আপনাকে দায়ী করা হয়?
গামিনি:
না না। ওখানে আমার কোনো ভূমিকা বা ভুল নেই। বিসিবি ওই সিরিজ দুটি জিততে চেয়েছে। নির্বাচক, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগ, গ্রাউন্ডস কমিটি, টিম ম্যানেজমেন্ট স্লো ও লো উইকেট চেয়েছিল। কারণ ওই সিরিজ জেতায় বাংলাদেশ সরাসরি টি২০ বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পেয়েছিল। বোর্ড থেকে তো আমাকে কিছু বলেনি। তারা বরং ধন্যবাদ দিয়েছে সিরিজ জেতায়। 

সমকাল: টনি হেমিং আপনাকে মাফিয়া ডন বলেছিল। আপনি এমন কী করেছিলেন তাঁর সঙ্গে?
গামিনি:
আমি কোনো কিছুই করিনি। তাঁর স্বভাবই হয়তো এমন। আমার সঙ্গে তাঁর তেমন কোনো কথাই হয়নি। তিনি শুধু আমাকে না, বিসিবি পরিচালকের বিরুদ্ধে অনেক কিছু বলেছেন। একটি দেশের ক্রিকেট বোর্ডের একজন পরিচালক ও একজন প্রধান কিউরেটরের বিরুদ্ধে বাজে কথা বলে বাংলাদেশকে অপমান করেছেন। বেশি টাকা পেয়ে সেই মানুষটিই এখন বিসিবিতে কাজ করছেন। বাংলাদেশ কি মাফিয়া ডন তৈরি করে? বিসিবি কি মাফিয়া তৈরি করে? এমন কথা বলার পরও মিডিয়া তাঁর সমালোচনা করেনি। যে লোকটি বাংলাদেশকে অপমান করে গেছে, মিডিয়া তাঁর পক্ষ নিয়ে নিউজ ছাপিয়েছে। আমার কাছে এগুলো বিস্ময়কর।

সমকাল: নিশ্চয়ই আপনি অপমানিত হয়েছিলেন?
গামিনি:
আমি বাংলাদেশের হয়ে কাজ করেছি। টনির কথা পুরো জাতির জন্য লজ্জাজনক ছিল। এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল। ক্রিকেট মাফিয়া তৈরির জায়গা না। একজন বিদেশি হিসেবে আমি যোগ্যতা ও সততা দিয়ে কাজ করেছি। বিসিবির পরিচালকদের কথামতো উইকেট বানিয়ে ভুল করে থাকলে, এই অপবাদ মাথা পেতে নিতে রাজি আছি। একজন বাংলাদেশি হিসেবে আপনি কি কখনও চাইবেন একজন বিদেশির কাছ থেকে অপমানসূচক কথা শুনতে? অথচ ওই লোকটা এই দেশটাকে অপমান করেছিল। 

সমকাল: মানুষ তো বলে আপনি মাহাবুবুল আনামের সুপারিশে বিসিবিতে চাকরি করতেন। 
গামিনি:
দেখুন আমাকে এখানে এনেছেন মিস্টার– বিসিবির সাবেক সভাপতি আ হ ম মুস্তফা কামাল। ওই সময় মাহাবুবকে আমি চিনতাম না। আমি নাজমুল হোসেন পাপন, ফারুক আহমেদ ও আমিনুল ইসলামের সময়ও কাজ করেছি। ১৯৯৬ সালে আমি যখন আন্তর্জাতিক আম্পায়ার ফারুক-বুলবুল তখন খেলেন। আগে থেকেই তারা আমাকে চেনেন এবং জানেন। কারও আর্শীবাদপুষ্ট হয়ে ১৬ বছর চাকরি করিনি। একজন মানুষ অযোগ্য কিউরেটরকে কতদিন সাপোর্ট দিতে পারে? সম্ভব না। যারা বলেন মাহাবুবের জোরে থেকেছি, তারা ভুল বলেন।  

সমকাল: আপনার স্ত্রী মাহাবুবুল আনামের শ্রীলঙ্কা অফিসে কাজ করতেন এবং প্রভাবশালী ছিলেন বলে শোনা যায়। আপনার স্ত্রীর অনুরোধেই নাকি গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান মাহাবুব প্রতিবার আপনার চুক্তি নবায়ন করেছেন?
গামিনি:
মানুষ তো কত কিই বলে। রংচং দেওয়ার জন্য যোগসূত্র খোঁজে। তারা জানেই না কোনটা সঠিক। কিছু একটা বলতে হবে, একজনের পেছনে লাগতে হবে, তাই উল্টাপাল্টা কথা বলে। এগুলো ছিল মানুষের কল্পনা। কোনো কিছু সঠিক না। মাহাবুবের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমাকে জড়িয়েছে কিছু মানুষ। 

সমকাল: বিগত ১৬ বছরে কোনো কিউরেটর তৈরি করেছেন?
গামিনি:
অবশ্যই করেছি। কয়েকজন গ্রাউন্ডস ম্যান কিউরেটর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সিলেটের কিউরেটর কবিরকে গড়ে তুলেছি। মামুন নেপালের কিউরেটর, চীনে কাজ করছে রাসেল। আরও তিনজন ছেলে দেখবেন শিগগিরই বড় পরিসরে কাজ করবে। সম্প্রতি সয়েল সায়েন্স থেকে যে চারজন ছেলেকে নিয়োগ দিয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি। এছাড়া অনেক সেমিনার এবং ওয়ার্কশপ হয়েছে দেশে। কিছু ছেলেকে দুবাই পাঠিয়েছি প্রশিক্ষণের জন্য। 

সমকাল: বলা হচ্ছে একাডেমির গ্রিন শেডের উইকেটগুলো ভুল বানানো হয়েছে, যে কারণে বৃষ্টির দিনে অনুশীলন করা সম্ভব হয়নি। এখন ভেঙে ফেলতে হচ্ছে। 
গামিনি:
না না। এখানে যেটা হয়েছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় সমস্যা আছে। বৃষ্টি হলে নিচে থেকে পানি উঠে উইকেট স্যাঁতসেঁতে হয়। এটাকে অন্যভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব। 

সমকাল: আপনি তো বলছেন উইকেট ভালো। কিন্তু লিটন কুমার দাস তো বলেছে মিরপুরে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করলে ব্যাটিং ভুলে যাবে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?
গামিনি:
লিটন এটা বলতেই পারে না। এগুলো কোথাও বলেনি। সব সময় সে আমাকে ধন্যবাদ দিয়েছে। যারা এগুলো বলে, তারা ভুল বলে।  

সমকাল: ১৬ বছরে আপনার দু-একটি ভালো স্মৃতি সম্পর্কে বলবেন?
গামিনি:
সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুশফিকুর রহিমরা যখন খেলেছে, তখন খুব প্রশংসা শুনেছি। লিটন কুমার দাস, মেহেদী মিরাজ, নাজমুল হোসেন ভালো খেলার পর আমাকে ধন্যবাদ দিতে এসেছে। গামিনি তুমি ভালো উইকেট বানিয়েছ। ধন্যবাদ তোমাকে। সাকিবের মতো কিংবদন্তি ক্রিকেটার কোনো দিন সমালোচনা করেনি। জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা যেভাবে চেয়েছে ব্যক্তিগত অনুশীলন করতে, আমি সহযোগিতা করেছি। রাত-দিন কখনও না করিনি। কারণ তারা চুক্তিভুক্ত ক্রিকেটার।

সমকাল: বিসিবি ও গ্রাউন্ডস ম্যানরা আপনাকে সংবর্ধনা দিল। কোনো ক্রিকেটার ধন্যবাদ জানাতে ফোন করেছিল?
গামিনি:
না, কেউ করেনি। তারা ব্যস্ত থাকায় বা আমার সময় কম থাকায়, সেটা সম্ভব হয়নি হয়তো। দেখা হলে নিশ্চয়ই তারা বাই বলত। শুভেচ্ছা জানাত। বিসিবি, গ্রাউন্ডস ম্যান এবং শ্রীলঙ্কান লোকজন আমাকে বিদায় সংবর্ধনা দিয়েছে। আমি তাতেই খুশি। 

সমকাল: বাংলাদেশে এত বছর কাজ করার জন্য সমকালের পক্ষ থেকে আপনাকে ধন্যবাদ। শুভকামনা থাকল আগামী দিনের।
গামিনি:
ধন্যবাদ। আপনাদের জন্যও শুভকামনা।

আরও পড়ুন

×