সাক্ষাৎকার
অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট সংস্কৃতি শিখেছি
সেকান্দার আলী
প্রকাশ: ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:৪৮
চন্ডিকা হাথুরুসিংহের কাছে কোচিং শিক্ষা নিতে গিয়েছিলেন নিজ খরচে। খেলেছেন সিডনির লিগে। সেই অভিজ্ঞতা এবার কাজে লাগাতে চান বিপিএলে। মূলত বৈশ্বিক ক্রিকেট সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে পরিণত করার জন্যই মুমিনুল হকের এ প্রচেষ্টা। দেশ-বিদেশের ক্রিকেট, বিপিএল, জাতীয় এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ নিয়ে সিলেট থেকে মুমিনুল হকের একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সেকান্দার আলী।
সমকাল: জাতীয় দলের বাইরে প্রথম কোনো বিদেশি লিগে খেলেছেন। সিডনিতে খেলার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
মুমিনুল: অভিজ্ঞতা ভালো। এর আগে কখনোই বিদেশে কোনো লিগে খেলার সুযোগ হয়নি। এই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য চন্ডিকা হাথুরুসিংহের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি ওখানে খেলতে গিয়েছিলাম খেলার পরিবেশ, খেলোয়াড়দের চিন্তাভাবনা, তাদের একাগ্রতা, নিবেদন, সর্বোপরি খেলাটাকে কীভাবে নেয়, সেটা বোঝার জন্য। এই জিনিসগুলো দেখেছি এবং শিখেছি। আমি যে দলে খেলেছি, সেখানে আমার আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পেরেছি। যেখান থেকে ওরাও অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করেছে।
সমকাল: সিডনির গ্রেড লিগের মান কেমন?
মুমিনুল: সিডনি বিশ্ববিদ্যালয় দলে খেলেন অ্যাশেজ খেলা ক্রিকেটার ওয়ালি রবিনসন। বেন ডাকেটের মতো ক্রিকেটারও সিডনি লিগে খেলেছেন। এই জায়গায় যারা ভালো করে, তারা শেফিল্ড শিল্ডে খেলার সুযোগ পায়। শেফিল্ড শিল্ড হলো অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট লিগ।
সমকাল: কোনো বিষয়গুলো জানার ও শেখার চেষ্টা করেছেন?
মুমিনুল: অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে গেলে মাইন্ড-সেট কেমন থাকা উচিত, কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত, প্র্যাকটিস কেমন হয় এবং কীভাবে হয়, সেগুলো উপলব্ধি করা। তারাও আমার অভিজ্ঞতা জানতে চেয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ কেমন, কোন দেশের সঙ্গে খেলা কঠিন, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে খেলা থাকলে তারা কেমন করে? এগুলো জানতে চেয়েছিল ক্লাব সতীর্থরা। আমি অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছি। অস্ট্রেলিয়ানরা মাঠের ভেতরে অন্য মানুষ। তারা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়কে সিনিয়র হিসেবে দেখে না, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখে। বিদেশি ক্রিকেটার পেলে মরিয়া হয়ে বোলিং করার চেষ্টা করে।
সমকাল: আপনি কি ২০২৬ সালের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের সিরিজ মাথায় রেখে অস্ট্রেলিয়ার লিগে খেলছেন?
মুমিনুল: একটা সিরিজ খেলার পরিকল্পনা নিয়ে ওখানে অনুশীলন করতে বা লিগে খেলতে যাইনি। আমার আগে থেকে ইচ্ছা ছিল অফ সিজনে বিদেশে গিয়ে অনুশীলন করা এবং স্কিল, মানসিকতায় উন্নতি আনা। আমি আমার গেমে উন্নতি করার জন্য ওখানে গিয়ে অনুশীলন করেছি এবং খেলেছি।
সমকাল: ওখানে তো সব নিজেকে করতে হয়। স্বনির্ভর হওয়া শিখেছেন?
মুমিনুল: হ্যাঁ, ওখানে নিজেরটা নিজের করতে হয়। কেউ আপনাকে পানির বোতল টেনে দেবে না। দেশে যেটা হয় খেলোয়াড়দের চারপাশে চার-পাঁচজন লোক থাকে। এই বিলাসিতা ওখানে পাবেন না। পানির বোতল নিজেকে ভরে নিয়ে যেতে হবে। বলটাও নিজেকে কুড়িয়ে নিতে হয়। ওখানে কেউ কারও না। সব নিজেকে করতে হয়। কাউকে দিয়ে কিছু করাতে হলে টাকা লাগবে। সিডনিতে এই জিনিসগুলো শিখেছি। বাড়ি গুছিয়ে রাখা, রান্না করে খাওয়া দারুণ অভিজ্ঞতা। এগুলো করার ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, দায়িত্ব বোধ তৈরি হয়। এই কারণেই দেখবেন ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষ স্বনির্ভর।
সমকাল: বাংলাদেশের ক্রিকেটে এই সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব?
মুমিনুল: ধীরে ধীরে হবে। যেটা আছে, এখনই সেটা পরিবর্তনের পক্ষে না। কারণ এই ব্যবস্থা থাকার কারণে প্রতিটি দলে বেশ কয়েকজন লোক কাজ করতে পারে। আর্থিকভাবে লাভবান হয়। আমরা দলে সাপোর্ট স্টাফ না রাখলে অনেকের সংসার চলবে না।
সমকাল: হাথুরুসিংহের ক্যাম্পে কেন গিয়েছিলেন, স্কিলে উন্নতি করতে?
মুমিনুল: বাংলাদেশে ভালো প্র্যাকটিস হয় টেস্ট সিরিজ শুরুর চার-পাঁচ দিন আগে। সর্বোচ্চ দুই দিন ভালো অনুশীলন হবে। এই দুই দিন অনুশীলন করে ভালো খেলোয়াড় হতে পারবেন না। এই চিন্তা থেকে আমি দেশের বাইরে যেতে চেয়েছি। ভারতেও অনুশীলন করার সুযোগ খুঁজেছি। বর্তমান পরিস্থিতির কারণে ভারতে যেতে পারিনি। অস্ট্রেলিয়ায় হাথুরুসিংহের কাছে যাওয়ার কারণ হলো তিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করেছেন। আমার মানসিকতা, স্কিল এবং কী করতে হবে, তা জানেন। কিছু বলার আগেই হাথুরুসিংহে জিনিসগুলো ঠিক করে দেন। এ কারণে আমার ওখানে যাওয়া। তিন-চার বছর ধরেই চিন্তা করেছি বিদেশি গিয়ে অনুশীলন করার।
সমকাল: ওখানে কোনো বড় কোচ বা ক্রিকেটারের সঙ্গে কথা হয়েছে?
মুমিনুল: নাথান লায়নের সঙ্গে একদিন পরিচয় করিয়ে দেন হাথু। পরের দিন প্র্যাকটিস করতে গেলে নাথান নিজে থেকেই আমাকে ডেকেছিলেন। ওই সময় আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়েছে। ওই সময় অস্ট্রেলিয়া ‘এ’ দলের প্র্যাকটিস চলছিল। নাথান আমাকে বলেছিলেন, ভারতের কন্ডিশনে কীভাবে স্পিন খেলতে হয়, সেটা জানতে চেয়েছিল কয়েকজন। আমি সেটা শেয়ার করেছি।
সমকাল: একটা সময়ে হাথুরুসিংহে আপনাকে কষ্ট দিয়েছেন। এখন মধুর সম্পর্ক হলো কী করে?
মুমিনুল: প্রথম মেয়াদে আমাকে সে খুব ভালোভাবে নেয়নি। তাঁর অনেক আচরণে আমি আহত হয়েছি। দ্বিতীয়বার যোগ দেওয়ার পর উল্টোটা ঘটেছে। আমি অনেক পছন্দের খেলোয়াড় হয়ে গিয়েছিলাম। আমার ভালো মানুষ দরকার নেই। ভালো কোচ দরকার; যে কোচ ভালো শেখাবে, পরিকল্পনা দেবে এবং দলকে সফল করবে। তাতে সে উগ্র মেজাজের হলেও আমার কিছু না। ওর কোচিং দর্শন ভালো এবং শেখাতে পারে। আমার কাছে হাথুরুসিংহেকে অনেক পেশাদার মনে হয়েছে। তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের খোঁজখবর রাখেন। বাংলাদেশের প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
সমকাল: ইংল্যান্ডেও তো খেলার অনেক সুযোগ আছে। সেগুলো কাজে লাগাতে চান?
মুমিনুল: ইংল্যান্ডে আগামী বছর খেলতে যেতে পারি। প্রিমিয়ার কাউন্টিতে খেলার সুযোগ আছে। অফ সিজনে সুযোগ পেলে খেলব। আর ট্রেনিংয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার বাইরে কোথা যেতে চাই না। কারণ তাদের ক্রিকেটীয় সংস্কৃতি অনেক ভালো।
সমকাল: বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে এবার লক্ষ্য কী? গত আসরের সপ্তম স্থান ধরে রাখা, না আরও উন্নতি করা?
মুমিনুল: তিনটি সংস্করণের মধ্যে বাংলাদেশের টেস্ট দলটা এখন অনেক পরিণত। অনেক বেশি টেস্ট খেলা অভিজ্ঞ ক্রিকেটার আছে। ৫০-৬০টি করে ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় আছে। ওইদিক থেকে আমরা চাইব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপটা চার-পাঁচ নম্বরে শেষ করতে।
সমকাল: নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তানের সঙ্গে টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ খেলবেন। কোন দলের বিপক্ষে শতভাগ সফল হতে চান?
মুমিনুল: সবগুলো সিরিজই চ্যালেঞ্জিং। ভালো ক্রিকেট খেলে জিততে হবে। কারণ চারটি দলই টেস্টে ভালো। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হওয়ার পর থেকে সবাই লড়াকু ক্রিকেট খেলে।
সমকাল: টেস্ট ক্রিকেট বেসিক হলে এবং টেস্টে ভালো খেলতে পারলে সাদা বলের ক্রিকেটের জাতীয় দলে কেন থাকতে পারছেন না?
মুমিনুল: যে পারে সব জায়গায় পারে। আমি একটা সময়ে সব খেলতাম। এখন শুধু টেস্ট খেলি। আমাকে ওয়ানডে দলে ঢুকতে হলে এখন নির্বাচকদের দরজা ভেঙে ঢুকতে হবে। কারণ তারা আমাকে টেস্ট ক্রিকেটার হিসেবে দেখে। ঢাকা লিগে ভালো খেললেও সাদা বলের ক্রিকেটে বিবেচনা করা হচ্ছে না। আমি যে ওয়ানডে ক্রিকেট পারি, এটা বোধহয় ভুলেই গেছে। এই যেমন সাদমানকে টেস্ট ক্রিকেটারের তকমা দেওয়া হয়েছিল। সে এখন সেটা বিশ্বাস করে না। এই তো বিপিএলে সুযোগ পেল চট্টগ্রামের হয়ে খেলার। দেখবেন সাদমান ভালো করবে। আমি মনে করি, কাউকে লেবেল লাগিয়ে দেওয়া ঠিক না।
সমকাল: মুশফিক ১০০ টেস্ট খেলেছে। আপনি নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
মুমিনুল: সবকিছু আল্লাহর ওপরে। আমি তো চাইব ১০০ টেস্ট ছাড়িয়ে যেতে। ক্রিকেট শুরুর আগে আমি চিন্তা করিনি এতগুলো ম্যাচ খেলব। এখন তো ৭৫টি টেস্ট ম্যাচ হয়ে গেছে।
সমকাল: আপনি যখন শুরু করেন, তখন পাঁচজন তারকা ক্রিকেটার ছিল। এখন কেন তারকা ক্রিকেটার নেই?
মুমিনুল: এই দায় বিসিবির। পাঁচজন সিনিয়র ক্রিকেটার থাকার সময় বিকল্প তৈরি করেনি। বোর্ড শুধু তাদের ওপর মনোনিবেশ করেছে। এ ছাড়া সিনিয়ররাও বাকিদের সাপোর্টিভ রোল দিয়েছে। তারা খেলবে বাকিরা সাপোর্ট দেবে। বাংলাদেশ এ কারণে বেশি দূর এগোয়নি। বিসিবির উচিত ছিল সিনিয়রদের বিশ্রাম দিয়ে বিকল্পদের সুযোগ দেওয়া। জিম্বাবুয়ে, আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে তারকা ক্রিকেটার খেলানোর প্রয়োজন ছিল না।
সমকাল: বর্তমান দলে তারকা ক্রিকেটার কে এবং সামনে কে তারকা হতে পারেন?
মুমিনুল: সাদা বলে তাসকিন, মুস্তাফিজ তারকা ক্রিকেটার। তানজিদ হাসান তামিমের তারকা হওয়ার সুযোগ আছে। ইমন আন্ডার রেটেড। তারও তারকা হাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সমকাল: এবার বিপিএল কি জমবে?
মুমিনুল: বিপিএল জমে চার-পাঁচটা করে ম্যাচ খেলার পর। যদিও এবার খুব বেশি হাইপ ওঠার সম্ভাবনা দেখি না। কারণ দেশি ক্রিকেটারদের বাইরে বড় ক্রিকেটার কম। বিদেশি তারকা নেই।
- বিষয় :
- সাক্ষাৎকার
- মুমিনুল হক
- বিপিএল
