বসনিয়ার অবাক প্রতিশোধ
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ | ১৪:১৪
‘এমন একটি পরিকল্পনা ছিল যাতে এই ছেলেটি কখনও জন্ম না নেয়, যাতে আমার সন্তানেরা কখনও জন্ম না নেয়, যাতে আমাদের কোনো সন্তান জন্ম না নেয়। তাদের হাসিই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিশোধ’– ইতালিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট পাওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে এই কথাগুলো লিখেছেন স্রেব্রেনিৎসা মেমোরিয়াল সেন্টারের প্রধান এমির সুলজাগিচ।
স্রেব্রেনিৎসার কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। এটা হলো বসনিয়ার সেই শহর, যেখানে ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বর্বর সার্ব বাহিনী আট হাজারের বেশি মুসলিম পুরুষ ও বালককে হত্যা করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। ওই মন্তব্যের সঙ্গে একটি ছবিও জুড়ে দেন সুলজাগিচ। যে ছবিতে প্লে-অফ ফাইনালে ইতালিকে হারানোর পর বসনিয়া-হার্জেগোভিনা ফুটবল দল উল্লাস করছে। এই উদযাপনের কেন্দ্রে রয়েছেন টাইব্রেকারে নিষ্পত্তিসূচক গোলটি করা এসমির বায়রাকাতারেভিচ। ২০ বছরের এ তরুণ স্রেব্রেনিৎসার সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড থেকে কপাল গুণে বেঁচে যাওয়া এক রিফুইজি দম্পতির সন্তান।
১৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষম জেনিকার সেই স্টেডিয়ামে উপস্থিত ছিলেন এসমিরের পিতা এলমির ও মাতা ইমানা। সেই জাতিগত নিধন থেকে ভাগ্যগুণে বেঁচে পালিয়ে গিয়েছিলেন এই দুই মুসলিম নর-নারী। অথচ এই যুদ্ধের শুরুর দিকেও যুগোস্লাভিয়ার এই ভূখণ্ডে ভিন্ন ভাষাভাষী ও ধর্মের মানুষ মিলেমিশে বসবাস করত। কিন্তু নব্বই দশকের শুরুতে আচমকা বদলে যায় পরিস্থিতি। একের পর এক সংঘর্ষে হাজারো লোক প্রাণ হারায়। এমনি এক ভয়াবহ যুদ্ধের রাতে প্রাণ নিয়ে স্রেব্রেনিৎসা থেকে পালিয়ে যান এলমির ও ইমানা। তারা দুজন প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হলেও তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজন পারেননি। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিভিন্ন রিফুইজি শিবিরে ঘুরতে ঘুরতে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে ঠাঁই নেন তারা। সেখানে ২০০১ সালে একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে ২০০৪ সালে এসমিরের জন্ম হয়।
রিফুইজি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গেলেও নিজের দেশকে ভুলে যাননি এলমির ও ইমানা। পিতা-মাতার কাছে গল্প শুনে এসমিরও পিতৃভূমির প্রতি অনুরক্ত হয়ে ওঠেন। ইতালির বিপক্ষে জয়ের পর বসনিয়ার গণমাধ্যমে স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের কথা বলেন এসমির, ‘ওই যুদ্ধে আমার পিতা-মাতা তাদের পরিবারের অনেক সদস্যকে হারিয়েছে। এটা এমন একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা, যা আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না। আমার জন্মের আগের ঘটনা হলেও এটি আমার জীবনের অংশ। আমার রক্তে স্রেব্রেনিৎসা।’ এসমির ফুটবলে আসার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর ফুটবল পাগল বাবার। তবে এসমিরকে ফুটবলার বানাতে অনেক ত্যাগ স্বীকার ও পরিশ্রম করতে হয়েছে পুরো পরিবারকে। এমনকি তাঁর ছোটবেলার বন্ধু লিয়ামের পরিবারও আর্থিকভাবে সহায়তা করেছিল তাঁকে।
যুক্তরাষ্ট্রের বয়সভিত্তিক দলে খেলার পর ২০২৪ সালে ১৯ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় দলে ডাক পেয়েছিলেন এসমির। স্লোভেনিয়ার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে অভিষেকও হয়েছিল তার। কিন্তু এরপরও মন বদল করেন তিনি। পিতৃভুমি বসনিয়ার পক্ষে খেলার সিদ্ধান্ত নেন এসমির, ‘আমি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক, আমার ভাষা ইংলিশ। যুক্তরাষ্ট্র আমার পরিবারকে নতুন জীবন দিয়েছে। কিন্তু আমার নাম তো এসমির, এটা একটা বসনিয়ান নাম। বসনিয়ান রক্ত আমার ধমনিতে।’
বসনিয়ার অধিনায়ক এইডেন জেকো কিন্তু তিন দশক আগের সেই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী। ৪০ বছর বয়সী এ স্ট্রাইকার ২০১৪ সালে বসনিয়ার প্রথম বিশ্বকাপ দলেও ছিলেন। বর্ষীয়ান এ তারকা জানিয়েছেন, এক যুগ আগে তারা যে মিশন শুরু করেছিলেন, সেটাই এসমিররা এগিয়ে নেবেন। যুদ্ধের ধ্বংসলীলা পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে নতুন প্রজন্ম। যাদের এই পৃথিবীর আলোবাতাস দেখারই সম্ভাবনা ছিল না, তারাই বসনিয়ায় নতুন দিন আনবে।
- বিষয় :
- বসনিয়া
- বিশ্বকাপ বাছাই
