ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

নাহিদের গতির ঝড়ে দাপুটে জয়

ঢাকা টেস্টে পাকিস্তানকে হারাল বাংলাদেশ

নাহিদের গতির ঝড়ে দাপুটে জয়
×

শাহিন আফ্রিদিকে আউট করে জয় নিশ্চিত করার পর নাহিদ রানার বুনো উল্লাস। গতকাল মঙ্গলবার শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ৪০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে দেন তিনি। টেস্টে এটাই তাঁর সেরা বোলিং -এএফপি

 সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:৪৫ | আপডেট: ১৩ মে ২০২৬ | ০৮:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

কিলোমিটারের হিসাবে নাহিদ রানার বোলিংকে বেপরোয়া বলে অনুযোগ তুলতেই পারেন ব্যাটাররা। গতির ঝড় তুলে বা বাউন্সারের আঘাতে পাকিস্তানের ব্যাটারদের মনে ভীতি সঞ্চার করেছেন তিনি। কখনও উইকেট ভেঙেছেন তীব্র গতির বলে। সদ্য শেষ হওয়া ঢাকা টেস্টে এসব ধরনের রোমাঞ্চ বোলিংয়ে রেখেছিলেন রানা। আজান আওয়াইসের হেলমেটে বল লাগিয়েছেন, ১৪৭ কিলোমিটার গতির রিভার্স সুইংয়ে মোহাম্মদ রিজওয়ানকে বোল্ড আউট করেছেন। মুগ্ধতা ছড়ানো বোলিংয়ে চতুর্থ ইনিংসে পাঁচ উইকেট শিকার করে টেস্ট জয়ের শেষের নায়ক হয়েছেন। এই বছরের প্রথম ভাগ রানা যেন এলেন দেখলেন জয় করলেন। ওয়ানডে ক্রিকেটে ফিরে ৫ উইকেট পেয়েছেন পাকিস্তানের বিপক্ষে। ফাইফার উদযাপন করেছেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ম্যাচে। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে ইনিংসেও পেলেন ৫ উইকেট। মিরপুরের সবুজ উইকেট থেকে তিন মাসে সাফল্যের মণি-মুক্তায় দুই হাত ভরিয়ে নিয়েছেন তিনি। চাঁপাই এক্সপ্রেসের বোলিং ঝলকেই গতকাল মঙ্গলবার পাকিস্তানকে ১০৪ রানে হারিয়েছে বাংলাদেশ।

মাউন্টমঙ্গানুই থেকে সিলেটে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয় দেখেছে দেশের মানুষ। রাওয়ালপিন্ডি থেকে মিরপুরে পাকিস্তানের বিপক্ষে সাক্ষী ঐতিহাসিক মুহূর্তের। দেশের মাটিতে প্রথমবার পাকিস্তানকে টেস্টে হারানোর ইতিহাস লেখা হলো রেকর্ডের খেরোখাতায়। এই ঐতিহাসিক সাফল্যের পেছনে আছে একটি দলীয় পারফরম্যান্সের কোরাস। নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিমরা ব্যাট হাতে রানের প্রদীপ জ্বেলেছেন। নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ, মেহেদী হাসান মিরাজ ও তাইজুল ইসলামরা বল হাতে সেই আলো ছড়িয়ে দেন। আর আছে ইনিংস ঘোষণা করার একটি সাহসী সিদ্ধান্ত, যা টেস্ট ম্যাচ জিততে উজ্জীবিত করেছে পুরো দলকে।

ঢাকা টেস্টের সবকিছুই যেন বাংলাদেশের চাওয়া মতো হয়েছে। প্রথম ইনিংসে আগে ব্যাট করার পরিকল্পনা ছিল, সে সুযোগ করে দিয়েছে পাকিস্তান টসে জিতে। ৪১৩ রান করে লিড নিয়েছিল ২৭ রানের। নাজমুল হোসেন শান্ত ১০১, মুমিনুল হক ৯১, মুশফিকুর রহিম ৭১ রান করেন। মেহেদী হাসান মিরাজের স্পিন জাদুতে ৩৮৬ রানে বেঁধে ফেলা হয় পাকিস্তানকে। মিরাজ নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। তৃতীয় ও চতুর্থ দিন বৃষ্টিতে ৫ ঘণ্টা ৫ মিনিট নষ্ট হওয়ায় শেষ দিনটি হয়ে ওঠে রোমাঞ্চকর। উভয় দলই ম্যাচের সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত ছিল। চতুর্থ দিনের খেলা শেষে কথার লড়াই জমে উঠেছিল– মোহাম্মদ আশরাফুল বলেছিলেন, ২৬০ রানের লক্ষ্য দিয়ে ৭০ ওভার বোলিং করার সময় পেলে ম্যাচ জিতবেন তারা। এই কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন পাকিস্তানি ব্যাটার সালমান আগা। সংবাদ সম্মেলনে ‘ওপেন চ্যালেঞ্জ’ ছুড়ে বলেন, ‘পারলে ওই রানে ইনিংস ঘোষণা করার সাহস দেখাক।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ ইনিংস ঘোষণা করবে না।’ সালমানের এই বক্তব্য না শুনেও নাজমুল হোসেন শান্তরা অজান্তেই চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন। ৯ উইকেটে ২৪০ রানে দ্বিতীয় ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ। ২৬৭ রানের লিড নিয়ে সফরকারীদের ব্যাট করতে পাঠায় মধ্যাহ্ন বিরতির আগে। ২৩.১ ওভার বাকি থাকতে ম্যাচ জিতে নেয় তারা।
বাংলাদেশ তৃতীয় দিনের শেষ বিকালে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করে। বিনা উইকেটে ৭ রানে দিনের খেলা শেষ করে। চতুর্থ দিন সকালে মাহমুদুল হাসান জয় ও সাদমান ইসলাম দ্রুত আউট হলে মুমিনুল ও নাজমুল জুটি গড়েন। মধ্যাহ্ন বিরতির পর বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকে ৩ ঘণ্টা ৫ মিনিট। এর পরও ভালোভাবে দিন শেষ করে স্বাগতিকরা। তিন উইকেটে ১৫২ রানে ছিলেন শান্তরা। গতকাল শুরুতে মুশফিকের উইকেট হারালেও অধিনায়ক সামনে থেকে ব্যাটিংয়ে নেতৃত্ব দেন। ৮৭ রানের ঝলমলে একটি ইনিংস খেলেন। নোমান আলির বলে রিভার্স সুইপ খেলে এলবিডব্লিউ না হলে আরেকটি সেঞ্চুরি করার সুযোগ ছিল তাঁর। অধিনায়ক আউট হওয়ার পরও আক্রমণাত্মক ছিলেন টেল এন্ডাররা। মেহেদী হাসান মিরাজ ২৬, তাসকিন এক চার এক ছয়ে ১১ রান করায় মধ্যাহ্ন বিরতির ২৫ মিনিট আগে ইনিংস ঘোষণা করেন শান্ত। বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সাহসী সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে শান্তর ইনিংস ঘোষণা শীর্ষে রাখার মতোই। অধিনায়ক ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে জানান, এই ইনিংস ঘোষণার সিদ্ধান্ত পুরো দলকে সাহসী করে তুলছে। ভবিষ্যতে বড় দলগুলোর বিপক্ষে ইনিংস ঘোষণার মতো সাহস দেখাতে পারবেন তারা।

জবাব দিতে নেমে পাকিস্তানের ওপেনিং জুটি ভাঙে মাত্র ৩ রানে। ইমাম উল হকের উইকেট নেন তাসকিন আহমেদ। বিরতি থেকে ফিরে প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান আজান আওয়াইসকে সাজঘরে পাঠান মেহেদী হাসান মিরাজ। নাহিদ রানা শান মাসুদের উইকেট শিকারের পরই টালমাটাল হয়ে পড়ে পাকিস্তান। ৫৪ রানের পর ৫১ রানের একটি জুটিতে সঙ্গী হন আব্দুল্লাহ ফজল। সালমান আগার সঙ্গে জুটি বড় হওয়ার পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়ান বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলাম। ফজলকে ৬৬ রানে আউট করেন। সালমানকে ফিরিয়ে বড় আঘাত করেন তাসকিন। সোদ সাকিল ও মোহাম্মদ রিজওয়ান টেনেটুনে ১৫২ রানে নিয়ে যেতে পেরেছেন। দুর্দান্ত এক রিভার্স সুইংয়ে রিজওয়ানকে বোল্ড আউট করে জয়ের ভিত রচনা করেন রানা। তাইজুলকে নিয়ে জুটি বেঁধে ১১ রানে শেষ পাঁচ ব্যাটারকে আউট করেন তারা। শাহিন শাহ আফ্রিদির উইকেট নিয়ে জয়ের ক্যানভাসে তুলির শেষ ছোঁয়ায় নায়কোচিত সম্মান পান রানা। জয় উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এই চাঁপাই এক্সপ্রেস।  

আরও পড়ুন

×