মুশফিক যেন ব্যাটিংয়ের বাতিঘর
ছবি- ইউসুফ আলী
সেকান্দার আলী, সিলেট থেকে
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ | ১০:২৯
পুরস্কার বিতরণীর মঞ্চ প্রস্তুতের সময়ে সতীর্থদের নিয়ে ডাগআউটে অপেক্ষায় ছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। কোচিং স্টাফের সদস্যরাও ছিলেন পেছনে। দেখে মনে হচ্ছিল একটি সুখী পরিবারের বাঁধানো ছবি, যারা কিছুক্ষণ আগে পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করে বিশ্রাম নিচ্ছেন শান্তিতে। এই বিজয়ী বীরদের চোখেমুখে ছিল প্রশান্তি। বড় কোনো অর্জনের পর যেমনটা থাকে। গত দুই তিন বছর ধরেই টেস্ট ক্রিকেটে এরকম একটা সুখী পরিবারের ছবি ক্যামেরার ফ্রেমবন্দি করার সুযোগ হচ্ছে। এবারের সুখটা একটু বেশিই হওয়ার কথা। কারণ পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার চক্রপূরণ করা সম্ভব হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দল হিসেবে সমন্বিত পারফরম্যান্সের কোরাস।
পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করার সিরিজে ১১ জন ভালো করলেও আলাদা করে মূল্যায়ন করতেই হবে কয়েক জনের পারফরম্যান্স। তাদেরই একজন মুশফিকুর রহিম, যিনি ধারাবাহিক ছিলেন দুই টেস্টেই। ঢাকা টেস্টে ৭১ ও ২৩ আর সিলেট টেস্টে ২২ ও ১৩৭ রান করেন। দুই টেস্ট মিলে ২৫৩ রান করে সিরিজ সেরা হন অভিজ্ঞ এ ব্যাটার। ২১ বছরের টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথম সিরিজ সেরা হওয়া মুশফিকের জন্য সত্যিই আনন্দের। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে এত ভালো ক্রিকেট খেলার প্রেরণা সম্পর্কে এভাবেই বলছিলেন, ‘সত্যি বলতে, আমি বেঁচে আছি এবং আমার দেশের হয়ে খেলছি। কেউ যদি তার দেশের হয়ে খেলতে চায়, সেটা সহজে হয় না। তাই আপনাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে, কোনো কিছুর যোগ্য হতে হবে এবং মাঠে নেমে সেই পরিশ্রমটুকু করতে হবে। আমি আমার জীবন উপভোগ করছি, আল্লাহর কাছে শুকরিয়া।’
সিলেট টেস্টের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন লিটন কুমার দাস। প্রথম ইনিংসে দারুণ ব্যাটিং করে বিপর্যয় থেকে দলকে টেনে তোলেন। যেটি পুরো দলকে উজ্জীবিত করেছে বলে জানান মুশফিক। সতীর্থের ইনিংস থেকে প্রেরণা নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে সেঞ্চুরি করেন তিনি। তাঁর মতে, ‘সত্যি বলতে, প্রথম ইনিংসে লিটনের সেঞ্চুরিটা ছিল অসাধারণ, ওটাই আমাদের খেলায় টিকিয়ে রেখেছিল। ড্রেসিংরুমের মনোবল ছিল তুঙ্গে এবং আমরা তাঁর জন্যও খেলতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল উইকেটটা ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো, তাই প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল অন্তত ৪০০ বা ৪৫০-এর বেশি রান করা। কারণ আমি জানতাম এটা পঞ্চম দিনের সেই গতানুগতিক উইকেট হবে না।’ বোলারদেরও কৃতিত্ব দেন মুশফিক, ‘বোলাররা সত্যিই তাদের মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চলেছে এবং এর সমস্ত কৃতিত্ব তাদেরই প্রাপ্য।’
সিরিজ নির্ধারণী টেস্টে খুবই প্রাণবন্ত ছিলেন লিটন। রান করার পাশাপাশি কিপিংটা ছিল হৃদয় হরণ করার মতো। আর উইকেটের পেছন থেকে স্লেজিং তো ছিলেই। সবকিছু মিলিয়ে লিটন ছিলেন অসাধারণ। তাঁর মতে, ‘শেষ দুই ইনিংসে (ঢাকা টেস্ট) আমি কোনো রান করতে পারিনি। তাই উইকেটে নামার পর আমার ওপর কোনো চাপ ছিল না। হঠাৎ করেই দুটো উইকেট পড়ে গেল এবং আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না। আমি অধিনায়কের কাছে বার্তা পাঠিয়েছিলাম, তিনি আক্রমণাত্মক হতে বলেন। তাই আমি শুধু নিজের শক্তির ওপর ভরসা করার চেষ্টা করেছি। দুটো বাউন্ডারি মারার পর আমার মনে হলো এটি টেস্ট ক্রিকেট এবং আমার সময় নেওয়া উচিত। আমি ভাবলাম যে বৃষ্টির মধ্যে যদি আমি মাত্র ১০-১৫ ওভার ব্যাট করি, তাহলে খেলার চিত্রটা অন্যরকম হবে।’
টেল এন্ডারদের নিয়ে একটি লড়াইয়ের গল্প বলছিলেন উইকেটরক্ষক এ ব্যাটার, ‘আমি নিজেকে সামলে রাখছিলাম এবং বল বেশি খেলছিলাম। যখনই ওরা (টেল এন্ডার) নিরাপদ, আমিও নিরাপদ।’
পাকিস্তানের বিপক্ষে পাওয়া নিজের সেঞ্চুরিটাকে ক্যারিয়ার সেরা মনে করেন লিটন। তাঁর মতে, টেলের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে ব্যাটিং করা সহজ নয়, সব ফিল্ডার বাইরে থাকে। প্রথম দিনের উইকেট সহজ ছিল না এবং আউটফিল্ড ধীরগতির ছিল।’
এই সিরিজে বোলিং বিভাগ ছিল বৈচিত্র্যে ভরপুর। প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজ নিয়েছেন পাঁচ উইকেট। নাহিদ রানা দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিলে ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ। সিলেট টেস্টে বাঁহাতি তাইজুল ইসলাম সেরা। ইনিংসে ৬ ও ম্যাচে ৯ উইকেট নিয়ে ভ্যালুয়েভল পুরস্কার জিতেছেন।
- বিষয় :
- মুশফিকুর রহিম
