ঋতুপর্ণার অলিম্পিক গোল, সাগরিকার শেষ হাসি
ছবি: সংগৃহীত
ক্রীড়া প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬ | ১৭:০৮
জাতীয় সংগীতের সময় মা হারানো শিউলি আজিমের চোখে কান্না। দেশকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশে আসেননি মায়ের শেষকৃত্যে। তাঁর শোককে শক্তিতে রূপান্তর করার প্রতিজ্ঞা ছিল মারিয়া মান্দা-মনিকা চাকমাদের। কিন্তু গতকাল বুধবার গোয়ার জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে নেপালের বিপক্ষে শুরুতেই গোল হজম করে বাংলাদেশ। ছন্নছাড়া পারফরম্যান্স দেখানো লাল-সবুজের দলটি প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে সমতায় ফেরে ঋতুপর্ণা চাকমার অলিম্পিক গোলে।
খেলা যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, তখনই পাদপ্রদীপের আলোয় সুপার সাব মোসাম্মৎ সাগরিকা। অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে তাঁর গোলেই গর্জে ওঠে বাংলাদেশ শিবির। নিশ্চিত হয় টানা তৃতীয়বারের মতো নারী সাফের ফাইনাল। নেপালকে ২-১ গোলে হারিয়ে হ্যাটট্রিক ফাইনালে ওঠা বাংলাদেশ শিরোপা লড়াইয়ে ৬ জুন খেলবে ভারতের বিপক্ষে। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো ফাইনালে উঠল বাংলাদেশ। ছয়বার ফাইনাল খেলেও শিরোপার স্বাদ না পাওয়া নেপালের অপেক্ষা বাড়ল আরও।
গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে ভারতের কাছে হারের পর শিষ্যদের সমালোচনা করেন কোচ পিটার বাটলার। ড্রেসিংরুম আর টিম মিটিংয়ে কোচের উত্তপ্ত বাক্যগুলো মনের মধ্যে জেদের সৃষ্টি করে মেয়েদের। এর মধ্যে বুধবার, সতীর্থ শিউলির মা হারানোর সংবাদটি মিলি আক্তার-শামসুন্নাহারদের হৃদয়ে নাড়া দেয়। এই শোককে শক্তি হিসেবে নিয়ে মাঠে নামা বাংলাদেশ শুরু থেকেই এলোমেলো ফুটবল খেলে। নেপালের আক্রমণগুলো সামলাতে গিয়ে প্রায় তালগোল পাকিয়ে ফেলেন ডিফেন্ডাররা।
সাফের গত দুই আসরে নেপালকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে শিরোপা জেতা বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ম্যাচের প্রথম ৪০ মিনিট পর্যন্ত ছিল বিবর্ণ। মধ্যমাঠে মারিয়ার পাসগুলো ছিল না নিখুঁত। রক্ষণও ছিল না জমাট। গতবারের রানার্সআপ নেপাল আধিপত্য ধরে রেখে এগিয়ে যায় ম্যাচের ২২ মিনিটে। কর্নারের পর মিলি আক্তার দুর্বল ফিস্টে ক্লিয়ার করতে পারেননি পুরোপুরি। বক্সে জটলার ভেতরে বল পেয়ে গীতা রানী চিপ শটে লক্ষ্যভেদ করেন। পরের মিনিটেই পাল্টা আক্রমণে নেপালের রক্ষণে ভীতি ছড়ায় বাংলাদেশ, কিন্তু গোলরক্ষকের পরীক্ষা নিতে পারেনি তারা।
পিছিয়ে পড়ার পরও ছন্নছাড়া বাংলাদেশ। ৩৫ মিনিটে প্রীতি রায়ের শট লাফিয়ে উঠে কোনোমতে বলে হাত লাগান মিলি। বল তাঁর গ্লাভস ছুঁয়ে ক্রসবারে লাগলে এই যাত্রায় বেঁচে যায় লাল-সবুজের দলটি। খেলায় ধার ফেরাতে বাটলার দুটি পরিবর্তন আনেন ৩৮তম মিনিটে। তরুণ উমহেলা ও প্রীতিকে তুলে শামসুন্নাহার জুনিয়র ও তহুরা খাতুনকে নামান। এরপর বাংলাদেশের খেলায় গতি ফেরে। এরই ধারাবাহিকতায় ৪৫ মিনিটে বাংলাদেশকে সমতায় ফেরান সর্বশেষ ফাইনালে গোল করা ঋতুপর্ণা চাকমা। ডান দিক থেকে এই ফরোয়ার্ডের কর্নারে বল বাতাসে ভেসে লাফিয়ে ওঠা গোলকিপার আঞ্জিলা সুব্বাকে ফাঁকি দিয়ে সরাসরি দূরের পোস্ট লেগে জালে জড়ায়।
বিরতির পর মোমিতা খাতুনের জায়গায় মনিকা চাকমাকে নামান বাংলাদেশ কোচ বাটলার। শুরুতে বাংলাদেশের ওপর আক্রমণ প্রয়োগ করে খেলেন হিমালয়-কন্যারা। বাটলারও কৌশলে পরিবর্তন আনেন। ৬৯ মিনিটে আনিকা রানিয়া সিদ্দিকীকে উঠিয়ে সাগরিকাকে নামান তিনি। তাতে বাংলাদেশের খেলায় গতি বাড়ে। ছয় মিনিট যোগ করা সময়েই এই সাগরিকা বাংলাদেশকে এনে দেন জয়সূচক গোলটি। ডান প্রান্ত দিয়ে একক প্রচেষ্টায় বল নিয়ে নেপালের বক্সে ঢুকে পড়া শামসুন্নাহার জুনিয়র ঠান্ডা মাথায় বল বাড়ান গোলমুখে।
জটলার মধ্য থেকে কোনোমতে বল জালে জড়ান সাগরিকা। বুনো উল্লাসে মেতে ওঠেন তিনি। তাঁর সঙ্গে জেগে ওঠে বাংলাদেশের ডাগআউটও। রেফারির শেষ বাঁশি বাজতে জয়ের আনন্দে কাঁদতে থাকেন সাগরিকা। তাঁর এই কান্না ফাইনালে ওঠার।
