এত নিপীড়নেও হার মানেনি ইরান
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ১০:২৯
সকালে এসে সন্ধ্যায় চলে যাওয়ার নিয়মে কিঞ্চিৎ শিথিলতা হয়তো এসেছে। কিন্তু ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্রই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার তাগাদা ঠিক ছিল ইরানের। সে সঙ্গে ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতাসহ নানা ক্ষেত্রে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের বিরূপ আচরণ, মাঠের ভেতরে দুয়োধ্বনিও ছিল। এসব রাজনৈতিক চাপের মুখে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে ইরান। যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশটি দুবার পিছিয়ে পড়েও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণেই ইরানের ম্যাচটি নিয়ে বাড়তি আগ্রহ ছিল। আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার কারণে যথাযথ প্রস্তুতি তো দূরের বিষয়, ইরানের বিশ্বকাপই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। তারপরও শত বাধা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে এসে প্রথম ম্যাচে উজ্জীবিত নৈপুণ্য দেখিয়েছে তারা। লস অ্যাঞ্জেলেসে ম্যাচের শুরুতেই ইলিজা জাস্ট এগিয়ে দিয়েছিলেন নিউজল্যান্ডকে। ৩২ মিনিটে সমতা ফেরান রামিন রেজাইয়ান। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আবার কিউইদের এগিয়ে দিয়েছিলেন জাস্ট। এবারও হাল ছাড়েনি ইরান। ১০ মিনিটের মধ্যে দারুণ এক গোল করে সমতা ফেরান মোহাম্মদ মোহেবি। এর মধ্যে প্রথম গোলটি করার পর দর্শকের দিকে ছুটে গিয়ে জার্সি দিয়ে মুখে ঢেকে ফেলেন রেজাইনয়ান। ম্যাচ শেষে এমন উদযাপন নিয়ে ইরানের এ তারকা বলেন, ‘এটি কিছুটা রাজনৈতিক ছিল। এ নিয়ে আমি আর কিছু বলতে চাই না।’ ম্যাচটি চলাকালে সোফাই স্টেডিয়ামের বাইরে কিছু প্রবাসী ইরানি বিক্ষোভ করছিল, যারা দেশটির বর্তমান শাসন কাঠামোর বিরোধী। একটি অংশ খেলা শুরুর আগে জাতীয় সংগীতের সময় দুয়োও দেয়।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের পর আসল ক্ষোভটা প্রকাশ করেছেন ইরানের কোচ আমির গালেনোই। তাঁর মতে, বিশ্বকাপের সবচেয়ে নিপীড়িত দল তারা। এমন কথা বলার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, কিউইদের বিপক্ষে ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্রই লস অ্যাঞ্জেলেস ছেড়ে তড়িঘড়ি করে মেক্সিকোর তিহুয়ানায় অবস্থিত ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়েছে তাদের। তিনটি গ্রুপ ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে হওয়ায় ইরানের বেস ক্যাম্প হওয়ার কথা ছিল অ্যারিজোনায়। আসর শুরুর এক সপ্তাহ আগে সেটি মেক্সিকোর তিহুয়ানায় সরিয়ে নেওয়া হয়। নিয়ম করা হয়, ম্যাচের দিন যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে আবার সেদিনই ফিরতে হবে। কড়া সমালোচনার মুখে ফিফা কিছুটা শিথিল করে বিষয়টা। নতুন নিয়মে ম্যাচের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্র গিয়ে খেলা শেষেই মেক্সিকো ফিরতে হবে ইরান দলকে। এসব নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে আমির গালেনোই বলেন, ‘আমরা যাতায়াতে এত সময় আকাশে কাটিয়েছি যে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগই পাইনি। রিকভারির জন্য আমাদের সময় দেওয়া হচ্ছে না। আজ ম্যাচ শেষ হওয়া মাত্র আমাদের বলা হয়েছে, আপনাদের এখনই চলে যেতে হবে। এটি আমাদের জন্য বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনে হয়, পুরো বিশ্বকাপের মধ্যে আমরা সবচেয়ে নিপীড়িত দল।’ তারা ম্যাচের পরদিন মেক্সিকো ফিরতে চেয়েছিলেন।
তবে কারা এমন নির্দেশ দিয়েছে, সে ব্যাপারে কোচ আমির গালেনোই স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। অধিনায়ক মেহেদি তারেমি অবশ্য বলেছেন, ম্যাচের পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো তাদের ড্রেসিংরুমে এসে দেখা করে গেছেন। তারেমি বলেন, ‘নিশ্চয়ই তিনি আমাদের সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বিষয়টি আরও অনেক কিছুর সঙ্গে জড়িত। সবাই জানে ব্যাপারটা কী! এ নিয়ে আমার আলাদা করে বলার কিছু নেই। কারণ, আপনারা সবাই জানেন, আমরা কোন পরিস্থিতির মধ্যে আছি। আমাদের জন্য সবকিছুই এক ধরনের বিপর্যয়।’ ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ ও কয়েকজন সাপোর্ট স্টাফ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা না পাওয়ায় কোচ ও অধিনায়ক দুজনেই হতাশা প্রকাশ করেন।
ইরান ম্যাচটি খেলেছে এমন এক ভেন্যুতে, যেখানে প্রচুর ইরানি জনগোষ্ঠীর বসবাস। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর অনেক ইরানি লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিবাসী হিসেবে পাড়ি জমিয়েছিল। ফলে ম্যাচটি ঘিরে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। স্টেডিয়ামে ইরানের জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় উল্লাস যেমন শোনা গেছে, দুয়োধ্বনিও ছিল। অনেকে বিপ্লব-পূর্ব ইরানের ‘সিংহ ও সূর্য’ পতাকা নিয়েও মাঠে গিয়েছিলেন। তবে খেলা শুরুর পর গ্যালারির ৭০ হাজার দর্শকের অধিকাংশই ইরানকে সমর্থন দিয়েছেন।
- বিষয় :
- ইরান
- যুক্তরাষ্ট্র
- বিশ্বকাপ ফুটবল
