ঢাকা বুধবার, ১৭ জুন ২০২৬

রোনালদো : এক নক্ষত্রের গোধূলি প্রহর

রোনালদো : এক নক্ষত্রের গোধূলি প্রহর
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ১০:৩২ | আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬ | ১১:০৬

আবেগের মেসি, কান্নার নেইমার আর এক নিখুঁত ব্র্যান্ড– গেল দুই দশকে বিশ্বফুটবলের এই তো ত্র্যহস্পর্শ। যা নিয়ে বুঁদ হয়ে ছিল একটি বেড়ে ওঠা প্রজন্মের পুরো একটা সময়। সেখানে মেসি-নেইমারের সঙ্গে সব সময়ই জড়িয়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের গণসমর্থনের বাড়তি প্রশ্রয়। আত্মিক, কিছুটা নাড়ির টানের মতোই। কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো? একান্তই এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নক্ষত্র। জাতীয় আবেগের সীমানায় আটকে থাকা চরিত্র তিনি একেবারেই নন। রোনালদো হলেন বিশ্বফুটবলের এক একক মহাজাগতিক শক্তি, এক নিখুঁত করপোরেট ব্র্যান্ড, এক অতিমানবীয় প্রতিষ্ঠান! রোনালদো– নামটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ইস্পাতকঠিন জেদ, সুউচ্চ অহংকার আর বিশ্বজয়ের এক আদিম ক্ষুধা। রোনালদো তাঁর নামের জোরেই একা একটা ফুটবলীয় সাম্রাজ্য শাসন করেন। ভক্তরা তাঁকে ভালোবেসে বুকে আগলে রাখার চেয়ে তাঁর অবিশ্বাস্য ফিটনেস, বিলিয়ন ডলারের ব্র্যান্ড ভ্যালু আর গোল করার খুনে মানসিকতাকে দেখে। আজ সেই নক্ষত্রেরই গোধূলি প্রহর। বছর একচল্লিশের এক তরুণ নামছেন তাঁর ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে।

সেই যে ২০০৬ জার্মানিতে অ্যাঙ্গোলার বিপক্ষে বছর একুশের এক তরুণ তাঁর বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছিলেন; আজ দুই দশক পরও সময়ের ঘড়ির কাঁটাটা যেন আটকে আছে সেখানেই। আজও তিনি সেই তরুণই রয়ে গেছেন– শুধু মনের দিক থেকে নয়, ফিটনেসের বিচারেও। জার্মানি থেকে ২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল-রাশিয়া হয়ে কাতার। প্রতি বিশ্বকাপেই তিনি ছিলেন পর্তুগালের পোস্টার বয় হয়েই। কিন্তু কোনোবারই পূর্ণতা পায়নি তাঁর ইচ্ছাগুলো। জার্মানি বিশ্বকাপে একবার সেমিফাইনালের স্বাদ পেয়েছিলেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় অধিনায়ক হয়ে দল নিয়ে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছিলেন। ব্রাজিলে গিয়ে তো গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে গিয়েছিলেন। রাশিয়া থেকে ফিরেছিলেন অবশ্য স্পেনের বিপক্ষে একটা হ্যাটট্রিকের সুখস্মৃতি নিয়ে। কাতারেও গোল পেয়ে একটি রেকর্ড গড়েছিলেন, যা কিনা প্রথম ফুটবলার হিসেবে পাঁচটি বিশ্বকাপেই গোল পেয়েছেন। বিশ্বকাপে ৮ গোল নিয়ে আজ নামছেন তিনি। আর দুটি গোল হলেই পর্তুগালের কিংবদন্তি ইউসেবিওকে ছাপিয়ে দেশের হয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে যাবেন। কিন্তু এসবই তো ব্যক্তি রোনালদোর উজ্জ্বল প্রোফাইল, পর্তুগাল দলের হয়ে একটা বিশাল শূন্যতা রয়েই গেছে তাঁর সঙ্গে।

এক ইউরো ছাড়া দেশের হয়ে বড় কোনো ট্রফি স্পর্শ করতে পারেননি তিনি। এবার যদি পর্তুগাল সেই ট্রফি জিততে পারে, তাহলে একটি রেকর্ডেও নাম উঠে যাবে তাঁর। সবচেয়ে বয়স্ক বিশ্বকাপজয়ী খেলোয়াড় হবেন তিনি। বর্তমানে যা আছে ইতালির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ডিনো জফের (১৯৮২ বিশ্বকাপে ৪০ বছর বয়সে যা জিতেছিলেন)। তবে এসব বয়স নিয়ে কথাবার্তা একেবারেই পছন্দ নয় তাঁর। এবারই তো যুক্তরাষ্ট্রে আসার আগে তাঁর দেশের এক সাংবাদিক বয়স আর ফিটনেস নিয়ে কী যেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন। রেগে গিয়ে জবাব দিয়েছিলেন রোনালদো, ‘শারীরিকভাবে আমি একদম ঠিক আছি। তোমরা কি আমার ম্যাচগুলো দেখনি?’ সত্যি বলতে কি, ইউরোপ ছেড়ে সৌদি আরব চলে যাওয়ার পর তাঁর ম্যাচগুলো অনেকেরই আর দেখা হয় না।

আসলে বিশ্বকাপের গা গরমের প্রস্তুতি ম্যাচগুলোতে একেবারেই মলিন দেখা গেছে তাঁকে। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে চারটি শট নিয়ে কোনো গোল করতে পারেননি, দুটি সহজ সুযোগ মিস করেছেন। তারপরই ইউরোপিয়ান মিডিয়াগুলোর মুখ ঢেকে ফিসফাস– এই বুড়ো মানুষটা ব্রুনো আর লিয়াওয়ের মতো তরুণ সৃষ্টিশীলদের সঙ্গে ঠিক মানিয়ে উঠতে পারছেন না। আমেরিকায় পা রাখার পরও সেই কানাঘুষা থামছে না। এখানকার মিডিয়াতে খবর বেরিয়েছে, শুধু নামের কারণে তাঁকে ছাড় দিয়েছে ফিফা। বিশ্বকাপের আগে আইসল্যান্ডের বিপক্ষে একটি ম্যাচে কার্ড পেয়েছিলেন; নিষেধাজ্ঞা ছিল তিন ম্যাচের। কিন্তু ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি শেষ দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য পিছিয়ে দিয়েছে।

আসলে রোনালদো নামের ব্র্যান্ড ভেল্যু ফিফার কাছে অনেক। তবে বিতর্ক-সমালোচনা তো তাঁর কাছে নতুন কিছু নয়। এসব দেখেই তো চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। এখন আর গায়ে মাখান না কিছু; বরং ফ্লোরিডার সমুদ্রসৈকতে সিক্স প্যাক দেখিয়ে তিনি সবাইকে বুঝিয়ে দিয়েছেন– বয়স তাঁর কাছে সংখ্যা মাত্র। তিনিই ‘সিআরসেভেন’, যাঁকে নিয়ে কোনো অনুমান করার অধিকার কারও নেই। মেসি-নেইমারকে জিজ্ঞাসা না করেও কেউ বলে দিতে পারবেন– এটাই তাদের শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু রোনালদোকে নিয়ে সেটি বলা রীতিমতো ঝুঁকির। কেননা তিনি শরীরকে ধরে রেখেছেন ঘড়ির কাঁটা থামিয়ে।

আরও পড়ুন

×