ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

‘বাংলাদেশ’ নামটাই জাদুর মতো কাজ করল

‘বাংলাদেশ’ নামটাই জাদুর মতো কাজ করল
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৬

ম্যাচ শেষ হয়েছে কিছুক্ষণ মাত্র। লকার রুমে তখন জয়ের হিল্লোল। একটু পরেই সেখান থেকে ক্লান্তি ধুয়ে, সুগন্ধি মেখে একে একে বেরিয়ে আসছেন আর্জেন্টাইন ফুটবলাররা। গন্তব্য– বাইরে অপেক্ষমাণ টিম বাস। লকার রুম থেকে বাসস্ট্যান্ডের এই এক টুকরো সংযোগকারী রাস্তাই হলো বুক কাঁপানো ‘মিক্সড জোন’। স্রেফ একটা সরু করিডোর, যেমনটা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামগুলোর চেনা ব্যাকস্টেজ। সেই করিডোরের ব্যারিকেডের এপারে ক্যামেরা-বুমের তীব্র যুদ্ধ নিয়ে আমরা, আর ওপারে প্রটোকলের রাজকীয় বর্ম গায়ে তারা।

সেই সামান্য জায়গাটুকুই আচমকা রূপ নিল এক অপার্থিব স্বর্গে! চোখের সামনে দিয়ে রাজকীয় ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছেন লিওনেল মেসি, জুলিয়ান আলভারেজরা। দূরত্ব বলতে সাকল্যে হাতছোঁয়া। অথচ নিয়মের কঠিন বেড়াজালে সেই ছোঁয়াটুকু বারণ! কিন্তু নিয়মের সাধ্য কী রুখে দেয় ভালোবাসার সেই তীব্র চোরাস্রোতকে? যেখানে আলতো স্পর্শের চেয়েও বহু গুণ বেশি কথা বলে চোখের ভাষা, হৃদয়ের আকুলতা। সম্মোহনী সেই মুহূর্তে বুকের ভেতরটা যে কেমন করে, তা কোনো ফিফা প্রটোকল দিয়ে মাপা অসম্ভব। তাই এক ঘোরলাগা মুহূর্তে করিডোরে দেখা মিলল এমিলিয়ানো মার্টিনেজের। একের পর এক আন্তর্জাতিক মিডিয়ার ক্যামেরা আর বুম এড়িয়ে দ্রুত পায়ে এগোচ্ছিলেন আলবিসেলেস্তেদের আসল ‘ওয়াল’। 

কিন্তু যেই মুহূর্তে জাদুর কাঠির মতো ছুড়ে দেওয়া হলো একটা শব্দ– ‘বাংলাদেশ’, অমনি ম্যাজিক! ঝটকা মেরে ঘুরে দাঁড়ালেন দিব্যি ছয় ফুট চার ইঞ্চির ওই চেহারার মানুষটা। মুখে সেই চেনা হাসি। কোনো তাড়া নেই, কোনো আড়ষ্টতা নেই; যেন ডালাসের ওই ঘিঞ্জি করিডোরে দাঁড়িয়ে ঢাকার কোনো কফি হাউসে প্রিয়জনের সঙ্গে আড্ডায় বসেছেন! দূর দেশের কোটি ভক্তের সেই চেনা উন্মাদনার গল্প পাড়লেন নিজের মুখে। অবলীলায় বললেন, ‘আমি ওখানকার সমর্থকদের ভালোবাসি। আমি তো নিজে বাংলাদেশে গিয়েছি এবং সত্যিই দেশটিকে খুব ভালোবাসি। হ্যাঁ, আমি জানি তারা আমাদের জন্য কতটা পাগল...।’ বাংলাদেশ নিয়ে কিছু একটা জানতে চাওয়া হয়েছিল, কিন্তু মার্টিনেজ যেন তার চেয়েও অনেক কিছু বলতে চেয়েছিলেন। পাশে থাকা দলের মিডিয়া ম্যানেজার বারবার তাড়া দিচ্ছিলেন বলে কিছুটা যেন বিরক্তও হচ্ছিলেন মার্টিনেজ। আসলে এই যে বাংলাদেশ, শুধু এই নামটি শুনেই ঘুরে দাঁড়ানো– এটি নিখাদ ভালোবাসা ছাড়া সম্ভব নয়। 

তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, এবারও বাংলাদেশে আর্জেন্টাইন সমর্থকরা আপনাদের হাতে বিশ্বকাপ দেখতে চান। প্রতিক্রিয়ায় সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বুঝিয়ে দেন তিনিও তা জানেন। ‘তাদের (বাংলাদেশি সমর্থক) আমি দারুণ পছন্দ করি। তারা যেভাবে নিজেদের প্রকাশ করে, তা অনেকটা আমাদের আর্জেন্টাইনদের মতোই। বাংলাদেশের জন্য আমার পূর্ণ ভালোবাসা।’

বিশ্বকাপের এত চাপ, এত ক্যামেরার ফ্ল্যাশ– সবকিছু এক লহমায় তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল ওই একটা শব্দ। কাতার বিশ্বকাপের সেই নীল-সাদা আবেগের স্রোত যে ডালাসের করিডোরে এসে এভাবে আছড়ে পড়বে, তা হয়তো খোদ মার্টিনেজও ভাবেননি। প্রতিবেদক তো নয়ই, সেখানে সমকালের ক্যামেরা আর বুম ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের দুটি জাতীয় দৈনিক আর একটি স্পোর্টস চ্যানেলের প্রতিনিধি। বাংলাদেশের নাম, সমর্থকদের প্রত্যাশা– আর্জেন্টিনা দলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটা পেশাদারিত্বের তৃপ্তি ছিল এই চার সাংবাদিকের মধ্যেই।

এমিলিয়ানো মার্টিনেজ আসার আগেই ওই করিডোরের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা আর্জেন্টিনা দলের ফিটনেস কোচ লুইস মার্টিনের। তাঁকে যখন জানাই বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তখনই প্রটোকলের বেড়া ডিঙিয়ে হাত বাড়িয়ে দেন লুইস। নিজে থেকেই বলতে থাকেন, ‘বাংলাদেশ, আমরা অনেক ভালোবাসি। আমরা জানি, তোমরাও আমাদের কতটা ভালোবাসো।’ একটু প্রশ্রয় পেয়েই জানতে চাওয়া তাঁর কাছে– আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমেও কি কখনও বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়? মেসি কি জানেন, সেখানে তাঁর কত ভক্ত? মিষ্টি হাসিতে উত্তর, ‘হুম, লিও জানে তা। আসলে আমরা তোমাদের ওখানকার অনেক ভিডিও দেখেছি। লিও জানে, সেখানে তাঁকে নিয়ে কতটা উন্মাদনা!’ 

করিডোরে পাশেই ছিল এক আর্জেন্টাইন সাংবাদিক আর টোকিও থেকে আসা দুই জাপানি সাংবাদিক। দেখে মনে হচ্ছিল, কিছুটা ঈর্ষাই করছিলেন তারা। কেননা শুধু বাংলাদেশ নামটি শুনেই যেভাবে নিয়মের বাইরে গিয়ে ও ফিটনেস কোচ এতটা সময় কথা বললেন, তা ভাবতে পারেননি কেউ। তবে সেই ফিটনেস কোচ একটা পরামর্শও দিয়ে রাখেন। এমনিতে এই মিক্সড জোনে চেনা মুখের সাংবাদিক ছাড়া কোনো ফুটবলার কথা বলেন না। যাওয়ার পথে চেনা মানুষ দেখলে যেমন কেউ দাঁড়িয়ে যান, তেমনই দাঁড়িয়ে যান তারা। বাংলাদেশ নামটি যে আর্জেন্টাইনদের কানে মধুর এক শ্রুতি, তা গেলবার কাতার বিশ্বকাপ থেকেই জানা। এবার যুক্তরাষ্ট্রে এসেও সেই একই অভিজ্ঞতা। তারা বাংলাদেশিদের আত্মীয় মনে করে।

তবে বিশ্বকাপ ফুটবলের এই বন্ধনে বাংলাদেশকে ব্রাজিলিয়ানরাও ভীষণ আপন ভাবে। তারাও ‘বাংলাদেশ’ নামটি শুনলেই বন্ধুর মতো হাত বাড়িয়ে দেয়। নিউ জার্সিতে যেমন সংবাদ সম্মেলন শেষে এই প্রতিবেদক ‘বাংলাদেশের ভালোবাসা’ জানালে হাত নাড়িয়ে তার জবাব দিয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। থামস আব দেখিয়ে হাসিতে উত্তর দিয়েছিলেন। ভাবছিলাম তা। ততক্ষণে ডালাসের সরু করিডোর দিয়ে মার্টিনেজ হেঁটে চলে গেছেন টিম বাসের দিকে। মিক্সড জোনের হট্টগোল, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ, আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের চিৎকার– সবকিছুই আবার আগের ছন্দে ফিরে এসেছে। কিন্তু বাতাসে যেন এখনও ভাসছে সেই দুটো শব্দ– ‘আই লাভ...।’ আসলে ফুটবল শুধু গোলপোস্ট আগলানো বা ট্রফি জেতার গল্প নয়; ফুটবল হলো দূর মানচিত্রের দুটি ভিন্ন প্রান্তের মানুষকে এক সুতায় বেঁধে ফেলার এক অলৌকিক জাদু।

আরও পড়ুন

×