‘কিং কেইনে’ ইংল্যান্ডের মুক্তি
ছবি- এএফপি
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, মায়ামি থেকে
প্রকাশ: ০২ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৬
কঙ্গোর আফ্রিকান ড্রামের তালে থ্রি-লায়ন্সের ফুটবলীয় অহংকার তখন একটু একটু করে খাদের কিনারায়, গিলোটিনের নিচে ছটফট করছে। ১-০ গোলে এগিয়ে কঙ্গো, ম্যাচ বাঁচাতে ইংলিশদের হাতে সময় মাত্র ১৬ মিনিট! ঠিক তখনই মাঠের বুক চিরে জেগে উঠলেন থ্রি-লায়ন্সের আসল রাজা হ্যারি কেইন। তাঁর ওই একটি গোলেই যেন ফুসফুসে শেষ অক্সিজেনটুকু ফিরে পায় ইংল্যান্ড। আর তার ৮৬ মিনিটের টর্নেডো গতির গোলটিতে ইংল্যান্ড পায় মুক্তি। শেষ পর্যন্ত অধিনায়কের জোড়া গোলে ভর দিয়েই কঙ্গোকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোয় পৌঁছে গেছে ইংল্যান্ড।
আফ্রিকান জুজুর ভয় থেকে তিনি যেভাবে দলকে টেনে বের করলেন, তা কেবল কোনো ম্যাচ জেতানো গোল নয়; ওটা ছিল এক অপরাজেয় সম্রাটের রাজকীয় দণ্ডপ্রয়োগ। কঙ্গোর সাজানো ফাঁদ ছিঁড়ে তিনি যেন আটলান্টার সবুজ গালিচায় নিজের রাজদণ্ডটা পুঁতে দিলেন, আর ফুটবল বিশ্বকে মনে করিয়ে দিলেন– মুকুট ছাড়াই কীভাবে সাম্রাজ্য শাসন করতে হয়! কঙ্গোর বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এর ম্যাচে জোড়া গোল করে হ্যারি কেইন বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের সর্বমোট ১২টি গোলের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন এবং তাঁকে ছাড়িয়ে গেছেন। তাঁর গোল সংখ্যা এখন ১৩টি।
এই মাইলফলক ছুঁয়ে তিনি একই সঙ্গে ফ্রান্সের কিংবদন্তি জুস্ত ফন্তেইনের ১৩ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। পেলের গোলগুলোর পেছনে জড়িয়ে ছিল রিওর সাম্বা, জোঁকার সেই ঈশ্বরপ্রদত্ত শৈল্পিক অহংকার। আর কেন? তাঁর প্রতিটি গোলের পেছনে লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর ট্রফি না পাওয়ার এক নিঃসঙ্গ হাহাকার, ব্রিটিশ মিডিয়ার ধারালো চাবুক আর এক অসমাপ্ত ট্র্যাজেডির গল্প। কঙ্গোর জালে বলটা জড়িয়ে কেইন যখন পেলের সেই অমর সিংহাসনটা কেড়ে নিলেন, তখন মনে হচ্ছিল–ফুটবল দেবতা আসলে এক লড়াকু রাজপুত্রকে তাঁর পাওনা মুকুটটা ফিরিয়ে দিলেন।
প্রথমার্ধে যখন হ্যারি কেইনকে বক্সে ফাউল করার পরও ভিএআর পেনাল্টি বাতিল করল, তখন মনে হচ্ছিল নিয়তি বোধহয় আজ কঙ্গোর আফ্রিকান ড্রামের তালে নাচতেই আটলান্টায় এসেছে। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৭ মিনিট। থ্রি-লায়ন্স রক্ষণভাগের সীমাহীন উদাসীনতাকে চাবুকের মতো কেটে বক্সে ঢুকে পড়লেন কঙ্গোর আনমার্কড উইঙ্গার ব্রায়ান সিপেঙ্গা। পিকফোর্ড ডানদিকের কোণ সামলাবেন নাকি বাঁ-দিকের– সেই ভাবনার অবকাশটুকুও না দিয়ে সিপেঙ্গা ডান পায়ের বুট থেকে এক নিখুঁত মাটি কামড়ানো বুলেট শটে বল জড়িয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের জালে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে যায় কেইনের পায়ে দ্বিতীয় গোলের জাদুতে। বক্সের ভেতর যখন বলটি পেলেন, কেইনের পিঠ তখন নেটের দিকে। কঙ্গোর ডিফেন্ডাররা ভাবতেও পারেনি পরের কয়েক সেকেন্ডে কী অবিশ্বাস্য মহানাটক ঘটতে চলেছে। জাদুকরি এক ড্রিবলিংয়ে শরীরটাকে ডানদিকে মোচড় দিলেন কেন, যেন স্প্রিংয়ের মতো ছিটকে উঠলেন। কোনো দ্বিধা নেই, ডান পায়ে বুটের সবটুকু হিংস্রতা ঢেলে দিয়ে নিলেন এক টুঁটিচেপা, বুলেট গতির শট! মার্সিডিজ-বেঞ্জের বাতাস চিরে হ্যারি কেইনের সেই ‘রকেট’ যখন কঙ্গোর গোলরক্ষক এমপাসিকে বোকা বানিয়ে ডানদিকের টপ কর্নারে আছড়ে পড়ল, তখন মনে হচ্ছিল ওটা কেবল ফুটবল নয়, ওটা আসলে পুরো ইংল্যান্ডের বুক চিরে বেরিয়ে আসা এক সিংহ-গর্জন!
- বিষয় :
- হ্যারি কেন
- ইংল্যান্ড
- ডিআর কঙ্গো
- বিশ্বকাপ ফুটবল