ঢাকা বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬

আফ্রিকার মুখ মরক্কো

আফ্রিকার মুখ মরক্কো
×

সেকান্দার আলী

প্রকাশ: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৩৭ | আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ | ০৯:৫২

বিশ্বকাপ ফুটবলে মরক্কোর জাগরণ প্রভাতের সূর্যের মতোই পবিত্র। যে আলোর বাতিঘর হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছে পুরো আফ্রিকার। টানা দুই বিশ্বকাপে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে খেলবে কোয়ার্টার ফাইনালে। এই গৌরবের রেকর্ড আশরাফ হাকিমিদের প্রচেষ্টার ফসল। ইউরোপের কৌশলের সঙ্গে আফ্রিকার আবেগ জুড়ে দেওয়া ফুটবল প্রজন্ম তারা। আফ্রিকার মুখ হয়ে ওঠা মরক্কোর কোয়ার্টার ফাইনাল প্রতিপক্ষ ইউরোপের পরাশক্তি ফ্রান্স। ৯ জুলাই বোস্টনে হবে ম্যাচটি। যেখানে আলোকবর্তিকা হয়ে দ্যুতি ছড়াতে হবে মহাদেশের প্রতিনিধি হয়ে।

ফুটবল ‘ঈশ্বর গেম’ হলেও তার আলো সাত মহাদেশে সমানভাবে বিচ্ছুরিত হয়নি। ইউরোপ আর লাতিন আমেরিকায় থাকেন ঈশ্বর। বিশ্বকাপের ভাগাভাগিও তাই এ দুই মহাদেশে। আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা বা এশিয়া পশ্চাদপদ। সেখান থেকে বৈষম্যের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টায় মরক্কো। বিশ্বমঞ্চে এরই মধ্যে একটা জায়গা করে নিয়েছে তারা। সেমিতে ওঠার লড়াইয়ে শেষপর্যন্ত বাজিমাত না করতে পারলেও আফ্রিকার মুখ হয়ে থাকবে। সুপার ঈগল নাইজেরিয়া ও ক্যামেরুন মারদাঙ্গা ফুটবল খেলার জন্য যেমন পরিচিতি পেয়েছিল বিশ্বে। কাতার বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছিল মরক্কো। সেমিতে খেলা যে ফ্লুক ছিল না, সেটা প্রমাণ করা জরুরি হয়েছিল ইসমাইল সাইবারিদের জন্য। তারা স্টার মার্কস নিয়েই পাস করেছেন সে পরীক্ষা।

ব্রাজিলকে ১-১ গোলে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছিল মরক্কো। গ্রুপের অন্য দুই প্রতিপক্ষ স্কটল্যান্ড ও হাইতিকে হারিয়ে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের মতো শেষ ৩২-এ গেছে ব্রাজিলের পিছে পিছে। ফুটবলের বিশেষজ্ঞরা মরক্কোকে ফেভারিট তকমা না দিলেও আমলে রেখেছেন ঠিকই। যেভাবে একের পর এক বাধা টপকে প্রথম দল হিসেবে কোয়ার্টার ফাইনালে উন্নীত হওয়ার কারণে সম্মানিত হাকিমিরা।

যদিও শেষ ষোলোর ম্যাচে কানাডার বিপক্ষে কাঙ্ক্ষিত ছন্দ দেখা যায়নি দলটিকে। প্রথমার্ধে ৬৭ শতাংশ বলের দখল রেখেও প্রতিপক্ষের গোলে শট নিতে পারেনি একটিও। তবে দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে ভালো খেলছিলেন সুফিয়ান রাহিমিরা। ব্রাহিম দিয়াজের পাস থেকে জোড়া গোল করেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার আজ্জেদিন উনাহি। শেষ গোলটি সুফিয়ান রাহিমির।

মরোক্কান গেম মেকার দিয়াজের মতে, ‘এই ম্যাচে মানসিকতাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে, কারণ প্রথমার্ধ সহজ ছিল না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা খুব ভালো লক্ষণ। সামনে যেটাই আসুক আমরা তার জন্য প্রস্তুত।’

প্রতিটি গোলের পর দিয়াজেকে সঙ্গে নিয়ে উদযাপন করেন উনাহি ও রাহিমি। এই সম্মান পাওয়া সম্পর্কে বলেন, ‘ওরা আমাকে সত্যিই পছন্দ করে। অনেক সম্মানও করে। গোলের পর ওরা আমাকে স্পটলাইটে এনেছে, আমি এতে খুশি।’ একেই বলে টিম স্প্রিরিট। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলা মরক্কোর ২৬ বছর বয়সী এ ফুটবলার জানান কোয়ার্টার ফাইনালে সর্বস্ব উজাড় করে খেলার জন্য তারা প্রস্তুত, ‘সত্যিটা হলো, কাতারের বিশ্বকাপে তারা অসাধারণ কাজ করেছিলেন। যে খেলোয়াড়রা এখন দলে নেই, তারা সবাই তার অংশ ছিল। আমরা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পেরে খুব খুশি। এখন এগিয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের উজাড় করে দেব।’

খেলোয়াড়দের দৃঢ়চেতা মানসিকতা সম্পর্কে মরক্কোর কোচ মোহাম্মদ ওয়াহাবি বলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপ খেলছি, যার মানে কঠিন মুহূর্ত আসবেই। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যখন আমরা সেরা ফর্মে থাকব না, তখন আমাদের দৃঢ় থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা কার জন্য এবং কীসের জন্য খেলছি।’

মরক্কোর সাফল্য রাতারাতি আসেনি। উত্তর আফ্রিকার এই দলটির ভালো খেলার মূলে রয়েছে দেশটির রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের পৃষ্ঠপোষকতা। ৬৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে একটি একাডেমি ও প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স গড়ে তোলেন ২০০৯ ও ২০১৯ সালে। সেখান থেকেই অ্যাটলাস সিংহদের উন্নয়নের পথচলা শুরু বলে জানান কোচ ওয়াহাবি, ‘মরক্কোর ফুটবলে এখন যা কিছু ঘটছে, তার সবকিছুর পেছনে রয়েছে ষষ্ঠ মোহাম্মদের অবদান। তিনি গত কয়েক বছরে প্রচুর বিনিয়োগ করেছেন, বিশেষ করে এই একাডেমিতে।’

১৯৮৬ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত চার বিশ্বকাপের তিনটিতে খেলা মরক্কো ২০ বছর বিশ্বকাপের চৌকাঠ পেরোতে পারেনি। স্পেনে জন্ম নেওয়া হাকিমি, দিয়াজদের হাত ধরে পুনর্জাগরণ ঘটে মরক্কোর। ৩৪ ম্যাচে অপরাজিত মরক্কোর স্বপ্ন এবার শিরোপা ছোঁয়ার।

আরও পড়ুন

×