ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

সোনালি প্রজন্মের কান্নার বিদায়

সোনালি প্রজন্মের কান্নার বিদায়
×

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ১২:০৮

ফুটবলে রূপকথার মতো বিদায় খুব কমই দেখা যায়। এর বাস্তব উদাহরণ হলো বেলজিয়াম। এক যুগের বেশি সময় ধরে একঝাঁক তারকা ফুটবলার নিয়ে বিশ্ব ফুটবলে যে জাগরণ ঘটিয়েছিল, সম্ভবত তার শেষটাও দেখে ফেলেছেন বেলজিয়ামের সমর্থকরা। উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের কাছে ২-১ গোলের পরাজয়ে রেড ডেভিলদের ‘সোনালি প্রজন্মের’ বাকি থাকা চার সদস্যেরও হয়তো শেষ বিদায়ঘণ্টা বেজেছে।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে থিবু কুর্তোয়া, কেভিন ডি ব্রুইনা ও উইটসেলের মতো তারকারা জাতীয় দলের প্রধান স্তম্ভ হয়ে খেলে আসছিলেন। কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফিটা জেতার তাদের শেষ সুযোগটি শেষ হয়ে গেলে তাদেরই এক উত্তরসূরির ভুলে। লস অ্যাঞ্জেলেসে চোটে পড়া গোলরক্ষক কুর্তোয়াকে দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে তুলে নিয়ে ২৪ বছর বয়সী সেনে ল্যামেন্সকে নামান বেলজিয়াম কোচ। ম্যাচের ৮৮ মিনিটে প্রতিপক্ষের একটি শট ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণে নিতে না পারা ল্যামেন্স হাত থেকে বল ফেলে দেন। দৌড়ে এসে মিকেল মেরিনো রিবাউন্ড থেকে বল জালে জড়ান। সাইড বেঞ্চে বসে উত্তরসূরির এমন ভুল দেখে চোখের পানি ফেলে দেন কুর্তোয়া। তাঁর বুঝতে বাকি রইল না যে এই গোলটিই তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেবে। ম্যাচ শেষে হয়েছেও তাই। এই ভুল নিয়ে বিবিসি রেডিও ফাইভের স্টিফেন ওয়ারনক বলেন, ‘ল্যামেন্স এখানে মোটেও কৃতিত্ব দেখাতে পারেননি। গত বছর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে তিনি কোনো ভুল করেননি, তবে এটি সম্পূর্ণ অন্যরকম এক চাপ। আগামী প্রজন্মের সময় আসবে ঠিকই, তবে পুরোনো খেলোয়াড়দের এভাবে বিদায় নেওয়াটা সত্যিই দুঃখজনক।’

ব্রাজিল বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারানো বেলজিয়াম দলটির দিকে তাকালে মনে হতো, সেটি যেন নিজেদের সেরা ফর্মে থাকা তারকা খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া কোনো ‘অল-স্টার ফ্যান্টাসি টিম’। কুর্তোয়া, ডি ব্রুইনা, উইটসেল ও লুকাকু তো শুরুর একাদশে ছিলেনই; সেই সঙ্গে ছিলেন এডেন হ্যাজার্ড, মুসা দেম্বেলে ও ভিনসেন্ট কোম্পানির মতো তারকা। আর বেঞ্চ থেকে বদলি হিসেবে নেমেছিলেন ড্রিস মের্টেনস ও মারুয়ান ফেল্লাইনি। ২০০২ সালের পর নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপে সেবার গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছায় বেলজিয়াম। এর পরের বার, অর্থাৎ ২০১৮ সালে তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয় এবং তৃতীয় হয়ে শেষ করে। একই খেলোয়াড়দের নিয়ে গড়া দলটি ২০১৬ ও ২০২০ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছিল। তবে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে তাদের বিদায়ে অবাক হয়েছিল সবাই। ১ কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার দেশ বেলজিয়ামকে নিয়ে এবারও স্বপ্ন দেখছিল সবাই। কিন্তু উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে শেষ আট থেকে তাদের বিদায়ে প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক শিরোপা জয় কি আসলেই বাস্তবসম্মত কোনো লক্ষ্য ছিল? স্প্যানিশ ফুটবল সাংবাদিক গিলেম বালাগ বলেন, “একটি প্রজন্মকে ‘সোনালি প্রজন্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে হলে কিছু শিরোপা জিততে হয়, তবেই আপনি তাদের এই নামে ডাকতে পারেন।”

দেশের মানুষের প্রত্যাশাকে অনেক উঁচুতে নিয়ে গিয়েছিল এই বেলজিয়াম। বড় বড় নামি তারকার পাশাপাশি লিয়েনড্রো ট্রোসার্ড (৩১), ব্র্যান্ডন মেচেল (৩৩), টিমোথি কাস্তানিয়া (৩৩), হান্স ভানাকেন (৩৩) ও থমাস মুনিয়ের (৩৪) সম্ভবত সবাই-ই বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন। ম্যাচ শেষে দলটির ম্যানেজার বা হেড কোচ রুডি গার্সিয়া হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘যে খেলোয়াড়রা হয়তো আর জাতীয় দলে ফিরবেন না, তাদের জন্য আমি ব্যথিত। আমি এমন একটি দল নিয়েছিলাম, যাদের যতটা সম্ভব দূরে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। আমার অভিজ্ঞ খেলোয়াড়রা, যারা হয়তো বিদায়ের পথে, তাদের শেষবারের মতো একটা দারুণ কিছু করার সুযোগ হতে পারত। এটি সত্যিই আফসোসের বিষয়। কারণ আমি মনে করি, এই বিশ্বকাপে সবারই বহুদূর যাওয়ার যোগ্যতা ছিল।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে কেভিন ডি ব্রুইনা ও রোমেলু লুকাকুর মতো অভিজ্ঞ সতীর্থদের বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের সূর্য যখন অস্তমিত হচ্ছিল, তখন চোটের কারণে কুর্তোয়াকে সাইড বেঞ্চে বসেই তা দেখতে হয়েছে। স্পেনের বিপক্ষে হারটি বেলজিয়ামের জন্য একটি চেনা ট্র্যাজেডিরই পুনরাবৃত্তি। ‘সোনালি প্রজন্ম’ কোনো কিছু জিততে না পারলেও এই দল নিয়ে গর্বিত গোলরক্ষক কুর্তোয়া, “বড় টুর্নামেন্টগুলোতে আমরা প্রায় সব সময়ই ভালো খেলেছি। এ পর্যন্ত আমরা যা কিছু করেছি, তা নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত। স্পষ্টতই, আমরা অনেক সমালোচনার মুখোমুখি হই যে ‘সোনালি প্রজন্ম কিছুই জিততে পারেনি’ ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমরা বেলজিয়াম; আমরা ইংল্যান্ড নই, আমরা স্পেন নই, আমরা ফ্রান্সও নই। আমরা ১২ মিলিয়নেরও (১ কোটি ২০ লাখ) কম মানুষের একটি ছোট দেশ, যারা বড় টুর্নামেন্টগুলোতে নিয়মিত অসাধারণ কিছু করে দেখাচ্ছে। আমার মনে হয়, ২০১৮ বিশ্বকাপে আমরাই সবচেয়ে সেরা ফুটবল খেলেছিলাম। তাই গর্ব করার মতো অনেক কিছুই আছে। সমালোচনা করা এবং বলা খুব সহজ যে ‘হ্যাঁ, তোমরা তো কিছুই জেতোনি।’ কিন্তু ফুটবলের বড় নামগুলোর দিকে তাকান; সবাই বড় টুর্নামেন্ট জিততে পারেনি, তবে আমরা সব সময় চেষ্টা করেছি। আমি মনে করি, আমাদের গর্বিত হওয়া উচিত।”

আরও পড়ুন

×