ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

হৃদয়ভাঙা গল্প হ্যারি কেইনদের

হৃদয়ভাঙা গল্প হ্যারি কেইনদের
×

সাখাওয়াত হোসেন জয়

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১২:৩৫

ফাইনালের ওঠার প্রতীক্ষা শেষ করা থেকে মাত্র পাঁচ মিনিট দূরত্বে ছিল ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালে ওয়েম্বলিতে জুলে রিমে ট্রফি জয়ের পর এই ফাইনালের জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে তারা। ৫৫ মিনিটে অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর ইংলিশ ফুটবলার এবং কোচ থমাস টুখেলের হাতের মুঠোয় ছিল অমরত্ব পাওয়ার সুযোগ। কিন্তু কোচের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেই সুযোগ হাতছাড়া হতে শুরু করে। লিওনেল মেসির হাত ধরে আর্জেন্টিনার একের পর এক আক্রমণের ঢেউ আছড়ে পড়তে থাকে ইংল্যান্ডের রক্ষণে। তখন একটি গোল হওয়া যেন সময়ের ব্যাপার ছিল। ৮৫ মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের পা থেকে সেই গোলটি চলেও আসে। এরপর ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই লাউতারো মার্তিনেজের হেডারে একেবারে কুপোকাত হয়ে পড়ল থ্রি লায়ন্স। ইংল্যান্ড আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি। ফলে আরেকটি হতাশার পরাজয়ের ধাক্কা নিয়ে ঘুম থেকে জেগেছে এক স্তব্ধ ফুটবল জাতি, যারা বারবার জয়ের খুব কাছে গিয়েও ট্রফি ছুঁয়ে দেখতে পারছে না।

ইংল্যান্ডের দীর্ঘ শিরোপাখরা এখন ৬০ বছর ছাড়িয়ে যাবে। তবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে একদম শেষ মুহূর্তের এই বিপর্যয় হয়তো তাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ক্ষত হয়ে থাকবে। আটলান্টার চোখ ধাঁধানো স্টেডিয়ামে হ্যারি কেইন-জুড বেলিংহামদের দেখে মনে হয়েছে পুরো বিধ্বস্ত। লিড নিয়েও ২-১ গোলের হারটি তাদের যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৮ বিশ্বকাপেও সেমিফাইনালের বাধা টপকাতে পারেনি ইংলিশরা। এগিয়ে গিয়েও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরেছিল তারা। বিশ্বমঞ্চের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপেও একই ব্যর্থতা থ্রি লায়ন্সদের। ২০২০ ইউরোর ফাইনালে টাইব্রেকারে ইতালির কাছে হারের পর ২০২৪ সালের আসরে স্পেনের বিপক্ষে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় পুড়তে হয়েছে দলটিকে।

ফুটবলপাগল জাতির জন্য শেষ দিকে এসে খেই হারিয়ে ফেলাটা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে! ম্যাচ শেষে স্বপ্ন ভাঙার হতাশা আড়াল করতে পারেননি ইংলিশ অধিনায়ক, ‘এই টুর্নামেন্টে আমাদের অনেক ভালো মুহূর্ত ছিল, অনেক ভালো ম্যাচ ছিল এবং আবারও সেমিফাইনাল খেললাম। (সাফল্যের) দুয়ারে কড়া নাড়ার কথা বলি আমরা, বলি, খুব কাছেই আছি; কিন্তু টুর্নামেন্টের শেষ দিকে এসে চক্র মেলাতে যে জিনিসটি লাগবে, স্রেফ সেটাই খুঁজে পাওয়া দরকার। এই টুর্নামেন্টগুলোতে এত বেশি চেষ্টা করতে হয়, চাপ ও মানসিক ধকল থাকে, যা আপনাকে ক্লান্ত করে দেবে। যে শেষ ছয় বা সাত সপ্তাহ ধরে আমরা একসঙ্গে আছি, আমরা একতা দেখিয়েছি, কিন্তু স্রেফ শেষ টুকরোটির কমতি ছিল।’

টুর্নামেন্টজুড়ে সবটুকু নিংড়ে দেওয়া সতীর্থদের জন্য খারাপ লাগছে কেইনের। ড্রেসিংরুমের পরিবেশের বর্ণনা করতে গিয়ে বিবিসিকে এ ইংলিশ তারকা বলেন, ‘ছেলেরা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত, দলের সবাই, স্টাফ এবং সমর্থকরাও হতবাক। আমরা ম্যাচের সিংহভাগ সময় বেশ ভালো খেলেছি। কিন্তু ১-০ গোলে এগিয়ে যাওয়ার পর আমরা কেবল লিড ধরে রাখার চেষ্টা করছিলাম, যা এই স্তরের ফুটবলে যথেষ্ট নয়। সবাই খুব ভেঙে পড়েছে, কারণ এখানে পৌঁছানোর জন্য আমরা কঠোর পরিশ্রম করেছি। ছেলেরা তাদের শেষ রক্তবিন্দু, ঘাম এবং চোখের জল দিয়ে চেষ্টা করেছে।’

বিশ্বকাপের এবারের আসরে ৬ গোল করা বায়ার্ন মিউনিখের এ ফরোয়ার্ড জানান তারা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন, ‘গোলের পর তারা আরও বেশি খেলোয়াড় আক্রমণে পাঠাচ্ছিল, আর আমরা তাদের ম্যান-টু-ম্যান মার্কিং করতে পারছিলাম না। একের পর এক আক্রমণের ঢেউ আসছিল। ছেলেরা ব্লক করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা যথেষ্ট ছিল না।’

এগিয়ে যাওয়ার পরও ইংল্যান্ডের রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। তবে গর্ডনের গোলের পর দলের রক্ষণাত্মক কৌশলে খেলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না বলে জানান কেইন, ‘আমরা যখন এগিয়ে গেলাম, তখন আমাদের বার্তা ছিল আক্রমণ চালিয়ে আরেকটি গোল তুলে নেওয়া। কিন্তু তারা দুটি গোল করার পর আমরা ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করলেও সেই মোমেন্টাম আর ফিরে পাইনি।’

চলতি মাসের শেষের দিকে ৩৩ বছরে পা দেবেন কেইন। ২০৩০ বিশ্বকাপে তিনি দলের অংশ থাকবেন কিনা– এমন প্রশ্নের সরাসরি কোনো উত্তর দিতে রাজি হননি। তবে ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির পারফরম্যান্স তাঁর জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। এই বিশ্বকাপে ইতোমধ্যে আট গোল করেছেন আর্জেন্টাইন জাদুকর। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরেকটু সময় নিতে চান কেইন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি বিষয়গুলোকে বছর ধরে বিবেচনা করি এবং দেখি আমার কেমন অনুভূতি হচ্ছে। ইংল্যান্ড জাতীয় দল আমার গর্ব ও আনন্দের জায়গা। অন্য যে কোনো কিছুর চেয়ে আমি এটি বেশি ভালোবাসি। অবশ্যই চার বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এই গ্রীষ্মে আমার বয়স ৩৩ হবে, তবে মেসির দিকে তাকালে দেখা যায় সে এখনও সর্বোচ্চ স্তরে পারফর্ম করে যাচ্ছে। আমি কখনও এসব বিষয়ে কোনো সীমাবদ্ধতা টেনে দিতে চাই না। তবে আপাতত দলের সঙ্গে আরেকটি কঠিন পরাজয় মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছি।’

আরও পড়ুন

×