মেসির অসম্পূর্ণ এক বৃত্ত
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ১১:১২
আটলান্টা থেকে ওড়ার সময় আকাশ ভেঙে নেমেছিল তুমুল ঝড়বৃষ্টি। বজ্রপাতের কারণে ফ্লাইটও পিছিয়ে গিয়েছিল তাদের। সেই বৈরী আবহাওয়া আর প্রকৃতির ভ্রুকুটি মাথায় নিয়েই শুক্রবার রাতে নিউ জার্সির হিলটন শর্ট হিলস হোটেলে এসে পা রাখে আর্জেন্টিনা দল। নিউ জার্সি, এটা সেই শহর, যেখানে বছর দশেক আগে এক অভিমানী রাজপুত্রের কান্নায় ভারী হয়ে গিয়েছিল হাডসন। বিশ্বফুটবল স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল একজনের হঠাৎ অবসরে। এদিন এই শহরের মাটি ছোঁয়া মাত্রই কি মেসির স্মৃতির সরণি বেয়ে ফিরে আসেনি ঠিক ১০ বছর আগের সেই অভিশপ্ত রাতটা? ২০১৬ সালের ১৭ জুন এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই চিলির কাছে টাইব্রেক মিস করেছিলেন তিনি, হেরে গিয়েছিল তাঁর দল। একবুক হাহাকার নিয়ে সেদিনের সেই আকস্মিক ঘোষণা– ‘এটিই হয়তো আমার আর্জেন্টিনার হয়ে শেষ ম্যাচ ছিল।’ এর পর অবশ্য হাডসনের বুক বেয়ে অনেক স্রোত চলে গেছে। কোপা থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ– অমূল্য সব হিরে মাথায় করে সেই রাজপুত্র এখন রাজা। বিশ্বফুটবলে আর্জেন্টাইন সাম্রাজ্যের অধিপতি তিনি। তার পরেও সেই নিউ জার্সিতেই এসেছেন তাঁর এক অসম্পূর্ণ বৃত্ত পূরণ করতে। রোববার শিরোপার মঞ্চে ট্রফি তুলে দাঁড়াতে।
যদিও এর পর চিলির বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের কোপায় এই মেটলাইফেই ১-০ গোলের এক জাদুকরি প্রতিশোধের বৃত্ত সম্পূর্ণ করে গিয়েছিলেন এলএম টেন। ওই রাতে পুরোনো ক্ষতের সেই অভিশপ্ত ভূত হয়তো কিছুটা তাড়ানো গিয়েছিল; কিন্তু রোববারের ফাইনাল তো অন্য ধাতুতে গড়া। এবার আর স্রেফ একটা সাধারণ ম্যাচ জেতার লড়াই নয়, এবার সুদীর্ঘ এক দশক পর সেই একই মাঠে বিশ্বজয়ের মুকুট বা শিরোপা হাতছাড়া করার এক অলিখিত, তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জও ওত পেতে রয়েছে মেসির সামনে। তবে আমেরিকা তো আসলে স্বপ্ন ভাঙার দেশ নয়, এ দেশ স্বপ্নকে জোড়া দেওয়ার এক অলৌকিক কারখানা। হলিউডের ক্ল্যাসিক সিনেমাগুলোতে যেমন দেখা যায়– সব হাহাকার আর পরাজয়ের গ্লানি পেরিয়ে দীর্ঘ সময় পর নায়ক কীভাবে ফিরে আসে তার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে, মেসির গল্পটাও যেন আজ সেই সেলুলয়েডের রূপকথাকে হার মানাচ্ছে।
তবে মেসির এবারের এই লড়াইয়ের মধ্যে বারুদ নেই, বরং একটা পারস্পরিক শ্রদ্বাবোধ আছে। স্পেনের সঙ্গে মেসির সম্পর্কটা আত্মীয়ের মতোই। স্পেনের বার্সেলোনাতেই তাঁর জীবনের সেরা সময়গুলো কাটিয়েছেন। সেখানকার একাডেমিতে বেড়ে উঠেছেন, সেখানকার ক্লাবের হয়ে বিখ্যাত হয়েছেন, সেই বার্সেলোনাতেই বিয়ের পর প্রথম সংসারও পেতেছেন। সেই স্পেনকে কখনোই শত্রুভাবাপন্ন ভাবতে পারবেন না মেসি। এখনও খুব বেশি মনে পড়লে মায়ামি থেকে চার্টার্ড ফ্লাইটে চড়ে বার্সার ন্যু ক্যাম্পে চলে যান চুপি চুপি। মেসির এই স্পর্শকাতরতা বোঝেন তাদের কোচ লিওনেল স্কালোনিও। ‘মেসি স্পেনের মানুষকে অনেক আনন্দ দিয়েছে। আমি জানি, তারা মেসিকে ভালোবাসে। আমি নিজেও স্পেনে থাকি, আমার পরিবার সেখানে থাকে। তবে রোববারের ফাইনালে দুঃখিত, আমরা তাদের হারানোর জন্য আমাদের সবকিছু বিলিয়ে দেব।’ স্বদেশি মিডিয়াকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় এভাবেই মেসির ভাবাবেগকে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন স্কালোনি। তিনি জানেন, ফাইনালের আগে মেসিকে তাঁর মতো করে রাখাটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে মঙ্গল।
বিশ্বকাপের এই ফাইনাল আসলে মেসির আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের সেই পরম ‘লাস্ট ড্যান্স’। এবার সামনে কোনো চেনা লাতিন প্রতিপক্ষ নেই। এবার ইতিহাসের বৃত্ত সম্পূর্ণ করার পথে মেসির মুখোমুখি স্প্যানিশ আর্মাডার সেই নতুন সূর্য ইয়ামালদের স্পেন। বার্সেলোনার আঙিনায় যার শৈশব-কৈশোর কেটেছে, সেই স্পেনের ফুটবলীয় আভিজাত্যকে চূর্ণ করেই কি তবে এক দশক আগের মেটলাইফের সব ঋণ শোধ করে আমেরিকার মাটিতে ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন হয়ে উঠবেন মেসি, নাকি স্প্যানিশ রক্তিম ছটায় ঢাকা পড়ে যাবে নীল রাজপুত্রের শেষ জাদুকরি নর্তন– অপেক্ষা সবার। সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক-নিউ জার্সি এখন এক চরম মনস্তাত্ত্বিক ক্যানভাস। রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজাবেন, তখন হয়তো এই মাঠেরই লকার রুমের পুরোনো কান্না চিরতরে ধুয়ে-মুছে যাবে এক আনন্দের বন্যায়, কিংবা এক দশক আগের সেই অশ্রুনদী পেরিয়ে মেসিকে বরণ করে নেওয়া হবে ইতিহাসের অবিনশ্বর ফুটবল সম্রাট হিসেবে। টাইমস স্কয়ারের নিয়ন আলো আর হাডসনতীরের বাতাস এখন প্রহর গুনছে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের; যেখানে লেখা হবে মেসির শেষ, পরম আখ্যান।