বিশ্বরেকর্ডের ‘মণিহার’ ভারী ঠেকছে এমবাপ্পের
সঞ্জয় সাহা পিয়াল, নিউইয়র্ক থেকে
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৭
রেকর্ডের সোনার মালা গলায় জড়িয়েই যাঁর জয়যাত্রা শুরু হয়েছিল, ইতিহাসের বুক চিরে রাজমুকুট মাথায় তোলার রাতেও কি সেই মানুষটা এতটা নিঃসঙ্গ হতে পারেন? ১৮ বছর বয়সে পেলের পাশে বসে বিশ্বকাপ ছোঁয়া, বাইশে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করেও ট্র্যাজিক রানার্সআপ আর ছাব্বিশে এসে লিওনেল মেসির সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে ২২ গোলের মহাকাব্যিক চূড়া– কিলিয়ান এমবাপ্পের জীবন তো এক রূপকথা হওয়ার কথা ছিল। অথচ শনিবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে বসার দিনে মায়ামিতে ফরাসি অধিনায়ককে কোনো বিজয়ী সম্রাট মনে হলো না; মনে হলো এক নিঃসঙ্গ ট্র্যাজিক হিরো। ১০ গোলের এই ‘গোল্ডেন বুটের’ হাতছানি তাঁর কাছে এক অপূর্ণ প্রেমের শেষ স্মৃতিলিপি। ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পরম আরাধ্য প্রেমটাই যখন ভাঙা হাটে হারিয়ে গেল, তখন এই সোনার বুট বুকে জড়িয়ে রাখা মানে তো বিরহের আগুনে নিজেকে আরও একটু বেশি পুড়িয়ে মারা!
ফক্স স্পোর্টসের রিপোর্টার ডগ ম্যাকইন্টায়ারের সামনে দাঁড়িয়ে যখন এমবাপ্পে বুকভাঙা গলায় বললেন, ‘বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার চেয়ে আগামীকালের বিশ্বকাপ ফাইনালে খেলতে পারাটাই আমি বেশি পছন্দ করতাম।’ তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, ইতিহাসের শ্রেষ্ঠত্বের অলংকারই আজ তাঁর বুকে সবচেয়ে বড় পাথর। গোল্ডেন বুট হাতের মুঠোয়, অথচ প্যারিসের রাজপুত্রের চোখে শুধুই এক রুপালি মরীচিকার কান্না। যে বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে ফুটবল দুনিয়ার আরও কয়েক যুগ লেগে যাবে, রবিঠাকুরের সুর মিলিয়ে সেই অনন্য ‘মণিহার’ আজ এমবাপ্পের কাছে ‘নাহি সাজে...’। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! ইতিহাসের সবচেয়ে দামি রত্নটা গলায় জড়িয়েও এক অপূর্ণ স্বপ্নের মরণযন্ত্রণায় পুড়ছেন এই ফরাসি জাদুকর!
আর্জেন্টিনার পর ইংল্যান্ডের কাছেও হারল তাঁর দল– এমন দিনে আর যাই হোক, ব্যক্তিগত রেকর্ড নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখানোর মতো নির্লজ্জ তিনি নন। বরং ফাইনালের আগের দিন তিনি মনে করিয়ে দিলেন, বিশ্বকাপ এখনও শেষ হয়নি। ফাইনালে মেসি ঠিকই গোল করবেন। ‘লিও সব সময়ই গোল করে। আগামীকালও (ফাইনালে) সে নিশ্চিতভাবেই গোল করবে। আমি শুধু প্রতিবার আমার দলকে গোল করতে সাহায্য করার চেষ্টা করি। এটা নিশ্চিত যে, আপনি যখন বিশ্বকাপে এত গোল করবেন, তখন তা আপনাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাবে, এটাই বাস্তব। আমি ফাইনালটি খেলতে পারিনি।’ মেসির ওপর শ্রদ্ধা রেখেই হতাশাটা চাপা দিয়ে রাখলেন এমবাপ্পে। মনে করিয়ে দিলেন মেসির গোল সংখ্যা তখন ৮ আর অ্যাসিস্ট ৪। আর বিশ্বকাপে মোট ২১ গোল, যা কিনা ফাইনালে বেড়ে যেতেই পারে।
খেলার দুনিয়ায় একটা কথা খুব চালু আছে– রেকর্ড নাকি গড়া হয় ভেঙে ফেলার জন্যই। কিন্তু ২৮ বছরের একটা ছেলে মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলে ফুটবল ইতিহাসের তাবড় তাবড় সব মহিরুহকে এভাবে পায়ের তলায় পিষে ফেলবে, তা কে ভেবেছিল? এবারের বিশ্বকাপে তিনি একাই করেছেন ১০টি গোল, চারটি অ্যাসিস্ট! ফুটবল রোমান্টিকরা রোমন্থন করছেন ৫৬ বছর আগে জার্মানির গার্ড মুলারের সেই আদিম গোলক্ষুধার গল্প, যা ছাব্বিশের এমবাপ্পে ফিরিয়ে আনলেন স্রেফ তুড়ি মেরে। রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে ২৫ গোল করে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার ‘পিচিচি ট্রফি’ পকেটে তাঁর এবং ইউরোপের সব লিগ মিলিয়ে ৩১ গোল করে ‘ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু’ জয়– এই ক্লাব মৌসুমেই তো তাঁর পায়ের জাদুতে সব একাকার হয়ে গেছে। আর বিশ্বকাপের মঞ্চ? সেখানে তো তিনি একাই এক ইতিহাস। ২০১৮ সালের সেই কিশোর বয়সে টুর্নামেন্টের সেরা উদীয়মান ফুটবলারের ‘ফিফা ইয়াং প্লেয়ার অ্যাওয়ার্ড’, ২০২২-এর কাতারে আট গোল করে প্রথম ‘গোল্ডেন বুট’ ও রানার্সআপের ‘সিলভার বল’– সবই তো তাঁর শোকেসে সাজানো। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস! রেকর্ডের এত সব সোনালি ‘মণিহার’ বুকে নিয়েও এ বছর ট্রফিহীন এক বিষণ্ন সম্রাট প্যারিসের এই রাজপুত্র!
একটা চাপা ক্ষোভ যেন তাঁর বিদায়ী কোচ দিদিয়ের দেশমের ওপর। তাঁর অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল আর প্রথম হাফের দিশাহীন ফুটবল নিয়ে এমবাপ্পে যে ভেতরে ভেতরে কতটা অসন্তুষ্ট ছিলেন, তা তাঁর ম্যাচ-পরবর্তী শরীরী ভাষা আর ক্ষোভেই স্পষ্ট। ‘কোচকে জয় দিয়ে সুন্দর বিদায় দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমরা খেলোয়াড়রা ব্যর্থ হয়েছি’– এমবাপ্পের এই ব্যাকুল উক্তির আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অলিখিত ক্ষোভ, যা টুর্নামেন্টজুড়েই ফরাসি অধিনায়ককে একাকী করে রেখেছিল। তবে ফুটবলের চিরাচরিত নিয়ম মেনে এক সাম্রাজ্যের পতনেই ঘটে অন্য এক নতুন সূর্যোদয়। দেশমের বিদায়ের পর ফরাসি ফুটবলের তখতে এবার বসতে চলেছেন জিনেদিন জিদান। যার ফুটবলশৈলী দেখে প্যারিসের অলিগলিতে এমবাপ্পেদের বড় হওয়া, সেই জিজুর মগজাস্ত্রের সঙ্গে এবার হয়তো মিলবে এমবাপ্পের বুটের প্রলয়ংকরী গতি! দেশমের রক্ষণাত্মক ছক থেকে মুক্ত হয়ে জিদানের স্বাধীন, আক্রমণাত্মক ফুটবলের ডানায় ভর করে এমবাপ্পে কি পারবেন ২০৩০-এর আসরে (স্পেন, পর্তুগাল, মরক্কো আর উরুগুয়ে বিশ্বকাপে) আরেকটি রূপকথা লিখতে? অপেক্ষা আরও চার বছরের।
- বিষয় :
- কিলিয়ান এমবাপ্পে
- বিশ্বকাপ ফুটবল