ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কেন বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে এল ফিফা

কেন বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিকল্পনা থেকে সরে এল ফিফা
×

জিয়ান্নি ইনফান্তিনো

বিবিসি

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:০৫

বিশ্বকাপসহ নিজেদের প্রধান ফুটবল প্রতিযোগিতায় বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে দাঁড়িয়েছে ফিফা। মাত্র কয়েক দিনের তীব্র সমালোচনা, সদস্যদেশগুলোর বিরোধিতা, আইনি পদক্ষেপের হুমকি এবং অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে শনিবার পরিকল্পনাটি বাতিলের ঘোষণা দেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

ফিফার পরিকল্পনা ছিল বিশ্বকাপ, ক্লাব বিশ্বকাপসহ নিজেদের প্রধান প্রতিযোগিতাগুলোর বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠন করা। প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নের এই প্রতিষ্ঠানের ২০ শতাংশ শেয়ার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ছিল। সেই অর্থ সদস্যদেশগুলোর উন্নয়ন তহবিল বাড়াতে ব্যবহার করার কথা জানিয়েছিল সংস্থাটি।

তবে বিষয়টি প্রথম প্রকাশ্যে আসে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে। সেখানে দাবি করা হয়, বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে গোপনে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বড় অঙ্কের চুক্তির চেষ্টা চালাচ্ছে ফিফা। খবরটি প্রকাশের পরই বিশ্ব ফুটবলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।

বিতর্ক শুরু হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনার কথা জানায় ফিফা। ইনফান্তিনো বলেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের কাছে সীমিত শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ এবং এর মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ সদস্যদেশগুলোর উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। পরিকল্পনা অনুমোদিত হলে ২০২৭ সালের শুরুতেই প্রতিটি সদস্যদেশকে এককালীন ২ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এ অর্থ ৪ কোটি ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও জানানো হয়।

কিন্তু ঘোষণার পরই শুরু হয় ব্যাপক বিরোধিতা। উয়েফা অভিযোগ তোলে, ফিফা 'ফুটবলের আত্মা বিক্রি' করতে চাইছে এবং প্রয়োজনে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়। উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনক্যাকাফ, ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনও পরিকল্পনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রীড়াবিষয়ক কমিশনার গ্লেন মিকালিফও ফিফাকে সতর্ক করে বলেন, খেলাটিকে বিনিয়োগের পণ্যে পরিণত করা উচিত নয়।

বিতর্কের মধ্যে ফিফা সদস্যদেশগুলোর কাছে ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিকল্পনাটি অনুমোদনের আহ্বান জানায়। ইনফান্তিনো এটিকে 'একটি সুযোগ, বাধ্যবাধকতা নয়' বলে ব্যাখ্যা দিলেও বিরোধিতা আরও জোরালো হতে থাকে। উয়েফা ও তাদের ৫৫ সদস্যদেশ পরিকল্পনা থেকে না সরে এলে বিশ্বকাপ বয়কটের হুমকি দেয়। আফ্রিকান ফুটবল কনফেডারেশন (সিএএফ) পরিকল্পনাটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়। অন্যদিকে কনক্যাকাফের ৪১ সদস্যদেশ সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে।

চাপ আরও বাড়ে যখন প্রতিবাদ জানিয়ে পদত্যাগ করেন ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ও মার্কিন ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি কার্লোস কর্ডেইরো। গোল্ডম্যান স্যাকসের সাবেক এই ব্যাংকার বলেন, প্রস্তাবটি ফিফা, সদস্যদেশ এবং বিশ্ব ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর। পরে ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা (সিওও) কেভিন লামুরও গণমাধ্যমকে জানান, এটি ফিফার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নয়, বরং একজন ব্যক্তির প্রকল্প ছিল এবং এতে সংস্থার অনেক কর্মকর্তা নিজেদের প্রতারিত মনে করছেন।

বাইরের সমালোচনার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাপ এবং আগামী সভাপতি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সমর্থন হারানোর আশঙ্কার মধ্যেই শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করে ফিফা।

পরিকল্পনা বাতিলের ঘোষণা দিয়ে ইনফান্তিনো বলেন, ‘সবার মতামত সতর্কতার সঙ্গে শোনার পর স্পষ্ট হয়েছে, এই প্রকল্প এমন একটি বিভাজন তৈরি করেছে, যা আমাদের মূল লক্ষ্যের জন্য সহায়ক নয়। তাই এ প্রস্তাব আর এগিয়ে নেওয়া হবে না।’

এর মধ্য দিয়ে কয়েক দিনের বিতর্কের পর বিশ্বকাপে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে এল বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
 

আরও পড়ুন

×