ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস
ছবি- ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১০ | আপডেট: ১৬ আগস্ট ২০২৬ | ১২:৪২
টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া ও বাংলাদেশের পার্থক্যটা বিশাল। র্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ যেখানে নবম, অস্ট্রেলিয়া সেখানে প্রথম। বড় দল হওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে তেমন একটা টেস্ট খেলতে চায় না অস্ট্রেলিয়া। তার ওপর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশকে টেস্ট খেলতে আমন্ত্রণ জানাতেও আগ্রহী নয় তারা। ২০০৩ সালে প্রথমবার অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ। এরপর কেটে গেছে প্রায় ২৩ বছর। বদলেছে প্রজন্ম, বদলেছে দুই দলের ক্রিকেটের বাস্তবতা। অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলার সুযোগ পায় বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর সেই সুযোগ পেয়েই ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ।

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্বাগতিকদের ৯ উইকেটে হারিয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিং, তানজিদ হাসান তামিমের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরি এবং মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড নৈপুণ্যে ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে চার দিনেই হারিয়েছে বাংলাদেশ। ম্যাচসেরা হয়েছেন ৯ উইকেট নেওয়া হাসান মাহমুদ।
Dominant. Commanding. Controlling.
— 7Cricket (@7Cricket) August 16, 2026
These are all words to describe a proud moment in Bangladesh history, because they have THUMPED Australia in Australia to win a Test by nine wickets! pic.twitter.com/MGUXtIySP9
জয়ের জন্য মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য পেয়েছিল বাংলাদেশ। শুরুতেই জশ হ্যাজেলউডের বলে শূন্য রানে তানজিদ হাসান ফিরে গেলেও বাকি কাজটা অনায়াসেই সেরে ফেলেন মুমিনুল হক ও সাদমান ইসলাম। দ্বিতীয় উইকেটে অবিচ্ছিন্ন ৫৩ রানের জুটিতে জয় নিশ্চিত করেন দুজন। মুমিনুল অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে, সাদমান ২৫ রানে। ১৪.২ ওভারেই ১ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।
_1786862308.jpg)
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের এটাই প্রথম টেস্ট জয়। একই সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসে বাংলাদেশের দ্বিতীয় জয়। এর আগে একমাত্র জয়টি এসেছিল ২০১৭ সালে মিরপুরে।
_1786862295.jpg)
এই জয়ের ভিত অবশ্য তৈরি হয়েছিল প্রথম দিনেই। টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা অস্ট্রেলিয়াকে শুরু থেকেই চাপে রাখেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদের ক্যারিয়ারসেরা বোলিংয়ে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে যায় স্বাগতিকদের প্রথম ইনিংস। ১৭ ওভারে ৫৫ রান দিয়ে ৬ উইকেট নেন হাসান। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে বাংলাদেশের কোনো বোলারের এটাই সেরা বোলিং।
_1786858314.jpg)
তাসকিন আহমেদ ও এবাদত হোসেনও দারুণ সঙ্গ দেন তাকে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসের ১০ উইকেটই নেন বাংলাদেশের পেসাররা। নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন দাপুটে শুরু থেকেই যেন ম্যাচের গতিপথের ইঙ্গিত মিলেছিল।
এরপর বাংলাদেশের ব্যাটাররা সেই সুযোগ কাজে লাগান। মাত্র দ্বিতীয় টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন তানজিদ হাসান তামিম। অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী পেস আক্রমণের সামনে শুরুতে দেখেশুনে খেললেও ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে থাকেন বাঁহাতি এই ওপেনার। শেষ পর্যন্ত ১৯৭ বলে ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন তানজিদ। আটটি চার ও একটি ছক্কায় সাজানো সেই ইনিংস শুধু তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি নয়, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো বাংলাদেশি ব্যাটারের প্রথম টেস্ট শতকও।
_1786858336.jpg)
তানজিদের সঙ্গে বড় জুটি গড়েন মুমিনুল হক। ১০২ রানের সেই জুটি বাংলাদেশকে শক্ত ভিত এনে দেয়। এরপর নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানের ইনিংসে আরও বড় হয় বাংলাদেশের লিড। শেষ পর্যন্ত ৪২৬ রানে অলআউট হয় বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের লিড পায় তারা।
২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে অস্ট্রেলিয়া শুরুতেই আবারও হাসান মাহমুদের সামনে পড়ে যায়। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও জেক ওয়েদারাল্ড ও ট্রাভিস হেডকে ফিরিয়ে দেন এই পেসার। তবে এবার প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করে অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার। মার্নাস লাবুশেন ৩১ ও স্টিভেন স্মিথ ৪৪ রান করেন। এরপর ক্যামেরন গ্রিন একাই লড়াই চালিয়ে যান।
_1786858430.jpg)
গ্রিন ১৯২ বলে ১০৪ রানের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি করেন। তাঁর ব্যাটেই কিছুটা স্বস্তির জায়গায় পৌঁছায় স্বাগতিকরা। কিন্তু বাংলাদেশের বোলাররা হাল ছাড়েননি।
মিরাজের ঘূর্ণিতে একে একে ফিরে যান অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটাররা। প্যাট কামিন্স, অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার ও নাথান লায়নকে শিকার করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৬৬ রানে ৫ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসও গুটিয়ে দেন এই অলরাউন্ডার। হাসান মাহমুদ নেন ৩ উইকেট। তাসকিন আহমেদ ও তাইজুল ইসলাম নেন একটি করে। অস্ট্রেলিয়া থামে ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
This match summary will go down in the history books! Bangladesh smash Australia by 9 wickets away from home in the World Test Championship 🇧🇩❤️ #AUSvBAN #tapmad pic.twitter.com/LAWHkJcZrV
— Farid Khan (@_FaridKhan) August 16, 2026
ছোট লক্ষ্য হলেও শুরুতেই তানজিদকে হারিয়ে কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছিল। হ্যাজেলউডের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে শূন্য রানে বোল্ড হয়ে ফেরেন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সেঞ্চুরিয়ান। কিন্তু সেই ধাক্কা আর বড় হতে দেননি মুমিনুল ও সাদমান। দুজন মিলে শান্ত মাথায় এগিয়ে নেন বাংলাদেশকে। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের আর কোনো সুযোগ না দিয়ে ১৪.২ ওভারেই জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ। বাংলাদেশ জয় পায় ৯ উইকেটে।
ডারউইনের আকাশে তখন শুধু বাংলাদেশের পতাকা। ২৩ বছর আগে যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে গিয়ে দুই টেস্টেই বড় ব্যবধানে হেরেছিল বাংলাদেশ, সেই অস্ট্রেলিয়াতেই ফিরে এবার তাদের হারিয়ে দিল তারা। এই জয় শুধু একটি টেস্ট জয় নয়। এটি ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান এবং অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের নতুন গল্পের শুরু। সব মিলিয়ে ডারউইনে বাংলাদেশ লিখল এমন এক ইতিহাস, যার অপেক্ষায় ছিল দেশের ক্রিকেট বহু বছর।