বাবার শূন্যতায় প্রেরণা পাচ্ছিলেন না মেসি
বাবা হোর্হে মেসির সঙ্গে লিওনেল মেসি
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১২:১০
তাঁর জন্মটা রোজারিওর এক সাধারণ পরিবারে। মা সেলিয়া কুচ্চিত্তিন খণ্ডকালীন গৃহকর্মী ও একটি ম্যাগনেট কারখানায় কাজ করতেন। বাবা হোর্হে মেসি ছিলেন একটি স্টিল কারখানার সুপারভাইজার। সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা লিওনেল মেসি বিশ্বফুটবলের মহাতারকা হতে পেরেছেন মা-বাবার অক্লান্ত পরিশ্রমে। আকাশি-সাদা জার্সিতে ছেলেকে ধীরে ধীরে মহিরুহ হয়ে উঠতে দেখেছেন তারা। গত মাসে সেলিয়া কুচ্চিত্তিনি হারিয়েছেন তাঁর প্রিয় স্বামী হোর্হে মেসিকে। আর মেসি হারিয়েছেন বাবাকে। স্বামী হারানোর শোকটা কাটিয়ে না উঠতেই প্রিয় সন্তানের আর্জেন্টিনাকে বিদায় জানানোর ঘোষণাটা ব্যথিত করেছে সেলিয়াকে। ছেলের অবসর প্রসঙ্গ উঠতেই চোখ দিয়ে শুধু পানি ঝরেছে সেলিয়ার। প্রিয় বাবার মৃত্যুর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায়– লিওনেল মেসির গল্পটা হয়তো এমনই ছিল।
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপই যে মেসির ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ, তা অনেকটা অনুমেয়ই ছিল। গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের পর মাঠে কেঁদেছিলেন মেসি। অনেকেই ভেবেছিলেন, তখনই বুঝি আকাশি-সাদা জার্সি তুলে রাখার কথা জানাবেন তিনি। তবে মেসি তো কোনো সিদ্ধান্ত এককভাবে নেন না। ঘরে আছে ছোটবেলার বন্ধু থেকে স্ত্রী হওয়া আন্তোনেল্লা রোকুজ্জো আর মা সেলিয়া। পরিবারের সঙ্গে কথা বলেই মেসি অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান তাঁর প্রিয় মা সেলিয়া, ‘আমি এখনও কাঁদছি। আমরা আগে থেকে জানলেও পরিবারের সবাই ভীষণ কষ্ট পেয়েছি। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে যেন ভালো ও সুখী থাকে।’ প্রথমে হারিয়েছেন স্বামীকে। তারপর ছেলে জাতীয় দল থেকে অবসর নিল। যন্ত্রণাটা সেলিয়ার চেয়ে আর কারও বেশি হওয়ার কথা নয়, ‘তার বাবা তাকে সব সময় বলতেন, তুমি খেলা ছেড়ে দিলে আমি কী করব? সবকিছু যেন একসঙ্গেই ঘটে গেল, অবিশ্বাস্য!’
ফুটবল ক্যারিয়ারে অনেক সমালোচনা শুনতে হয়েছিল মেসিকে। দুঃসময়ে ৩৯ বছর বয়সী এ তারকার পাশে বন্ধুর মতো ছিলেন স্ত্রী রোকুজ্জো। ভালোবাসার মানুষের আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলায় এক আবেগঘন চিঠি লিখেছেন রোকুজ্জো। মেসিকে নিয়ে নিজের গর্বের কথা এভাবে তুলে ধরেন রোকুজ্জো, ‘তোমাকে এভাবে এই অধ্যায়ের ইতি টানতে দেখে আমি কতটা গর্বিত, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন, লিও। এতগুলো বছর, এত মুহূর্ত, এত আনন্দ– আবার এত হতাশা ও কঠিন সময়ও।’ মেসির খারাপ সময়ের স্মৃতিচারণা করেন তিনি, ‘আমি তোমাকে কষ্ট পেতে দেখেছি, ভেঙে পড়তে দেখেছি, আবার উঠে দাঁড়াতেও দেখেছি। যখন কিছুই তোমার পক্ষে যাচ্ছিল না, তখনও তোমাকে লড়াই করে যেতে দেখেছি; বারবার চেষ্টা করতে দেখেছি। আর এতগুলো বছর পর, তোমার স্বপ্নগুলো পূরণ হতে দেখা এবং আমাদের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের কিছুদিন তোমার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছে।’
সন্তানদের জন্য মেসি কীভাবে আদর্শবান বাবা হয়ে উঠেছেন, সেটিও চিঠিতে তুলে ধরেন রোকুজ্জো, ‘তবে এই পুরো গল্পের একটি বিষয় আমাকে সবচেয়ে বেশি আবেগাপ্লুত করে– আমাদের সন্তানরা এই সবকিছু খুব কাছ থেকে দেখেই বড় হয়েছে। তারা দেখেছে, তাদের বাবা নিজের চাওয়ার জন্য কীভাবে লড়াই করেছে, কখনও হাল ছাড়েনি এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস ধরে রেখেছে। আর এরপর তারা নিজের চোখে দেখেছে, তুমি সবকিছু অর্জন করেছ এবং বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে তুলেছ।’ মেসির তিন সন্তান থিয়াগো (১৩), চিরো (১০) ও মাতেও (৮)। বাবার অর্জনগুলো ছেলেরা ভবিষ্যতে অনুধাবন করবে বলে জানান রোকুজ্জো, ‘হয়তো একদিন তারা সত্যিই বুঝতে পারবে, তোমার এই গল্পের মাহাত্ম্য কতটা বিশাল। কিন্তু আজ তারা শুধু তাদের বাবাকে নিয়ে গর্বিত। আর আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত। তোমার পথচলা নিয়ে, তুমি যেসব বাধা পেরিয়ে এসেছ সেসব নিয়ে, আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে– প্রতিটি মুহূর্তের পেছনে থাকা মানুষটি তুমি, তাকে নিয়ে।’ সবশেষে ভালোবাসার কথাটা লিখেছেন তিনি, ‘তোমার পাশে থেকে এই পুরো পথচলার সাক্ষী হতে পারা কত বড় সৌভাগ্যের! আমরা তোমাকে অসীম ভালোবাসি।’