ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

গোলাপি বলের পূর্বাপর

গোলাপি বলের পূর্বাপর
×

...

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০১৯ | ০০:২০

বাংলাদেশের কাছে ২০১০ সালের লর্ডস টেস্ট মানে তামিম ইকবালের দারুণ সেই সেঞ্চুরির স্মৃতি। অথচ একটু এদিক-ওদিক হলে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের ওই ম্যাচটিই হয়ে উঠতে পারত ঐতিহাসিক গোলাপি বলে প্রথম দিবারাত্রির টেস্ট! প্রাথমিকভাবে তেমনটাই পরিকল্পনা ছিল ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি)। অনেক জল গড়িয়ে তার নয় বছর পর আজ প্রথমবার গোলাপি বলে খেলতে নামছে বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যার যাত্রা শুরু হয়ে গেছে চার বছর আগেই। যে পথ ধরে গোলাপি বল ক্রিকেটের এ পর্যায়ে আসা, তারই এক ঝলক সাজিয়েছেন সিয়াম আনোয়ার

শুরুর ভাবনা

দিবারাত্রির টেস্ট চালুর ভাবনার উদ্ভব এক যুগ আগে। টেস্ট ক্রিকেটে ক্রমশ দর্শক কমতে থাকা আর ওয়ানডে-টি২০ ফরম্যাটে দিবারাত্রির ম্যাচে দর্শকের আগ্রহ বৃদ্ধিই ছিল প্রেক্ষাপট। মানুষ যদি কাজ থেকে ফিরে টিভিতে বা মাঠে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ পায়, তাহলে টেস্টও জমজমাট হবে- এই ছিল মূল ভাবনা।

হলুদ, কমলা ছাপিয়ে গোলাপি

কিন্তু রাতে টেস্ট ম্যাচে খেলা হবে কোন বলে? দিনের আলোয় হয় লাল বলে, কিন্তু ফ্লাডলাইটের আলোয় ওই বল ব্যাটসম্যানদের দেখায় সমস্যা হবে। তবে কি ওয়ানডে-টি২০-র মতো সাদা বলে হবে? সে ক্ষেত্রে টেস্টের সাদা জার্সির সঙ্গে মিলে যাওয়াতেই সমস্যা হবে। সবচেয়ে বড় কথা, সাদা বল দ্রুত রং হারিয়ে ফেলে। ৫০-২০ ওভারি ম্যাচে দৈর্ঘ্যের কারণে সমস্যা খুব একটা হয় না। কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে বল বদলানো হয় ৮০ ওভার পর, ততক্ষণ তো সাদা টিকবে না। এ জায়গাতেই চলে আসে ভিন্ন রং ব্যবহারের চিন্তা। পরীক্ষা চালানো হয় হলুদ, কমলা আর গোলাপি বলে। টিকে যায় গোলাপি।

ঐতিহ্য আর নতুনত্বের দ্বন্দ্ব

ইসিবির পরিকল্পনা ছিল, ২০১০ সালের মে-তে বাংলাদেশ-ইংল্যান্ডের লর্ডস টেস্ট ফ্লাডলাইটের আলোয় আয়োজন করার। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে খেলোয়াড়দের এ বিষয়ে ধাতস্থ করানোর জন্য দুটি কাউন্টি ক্লাবকে চার দিনের দিবারাত্রির ম্যাচ খেলার অনুরোধ করে ইসিবি। কিন্তু অনুরোধ পাওয়া ডারহাম আর উস্টারশায়ার খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ডারহাম কোচ জিওফ কুক তখন বলেন, 'প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে তার নিজস্ব স্বত্তায় রাখা উচিত।'

নারী ক্রিকেট যখন পথপ্রদর্শক

ক্রিকেটে বিশ্বকাপের প্রচলন হয় নারীদের দিয়ে, ১৯৭৩ সালে। তারও দুই বছর পর শুরু হয় এখনকার জমকালো আয়োজনের ছেলেদের বিশ্বকাপ। গোলাপি বলের ক্রিকেটেও মশাল এগিয়ে নেওয়ার কাজটি করেছে নারী ক্রিকেটই। ২০০৯ সালের জুলাইয়ে বাকিংহামশায়ারে প্রথমবারের মতো গোলাপি বলে একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামেন ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার মেয়েরা। এরপর ২০১১ সালের জানুয়ারিতে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে প্রথম শ্রেণির ম্যাচে গোলাপি বলের অভিষেক হয় গায়ানা-ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোর খেলায়। এখান থেকেই শুরু হয় দেশে দেশে সীমিত আকারে প্রচলন। পাকিস্তান ২০১০-১১ সালে প্রথম শ্রেণিতে কমলা রঙের বল ব্যবহার করলেও পরের বছরের কায়েদে আজম ট্রফির ২০১১-১২-এর ফাইনাল আয়োজন করে গোলাপি বলে। আয়োজন হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়ও। বাংলাদেশে গোলাপি বলে প্রথম খেলা হয় ২০১২-১৩ মৌসুমের বিসিএল ফাইনালে। মিরপুরে সেদিন মুখোমুখি হয়েছিল নর্থ জোন-সেন্ট্রাল জোন।

গোলাপি বলে প্রথম টেস্ট

বছরের পর বছর বিভিন্ন দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর আলোচনার পর অবশেষে গোলাপি বলের প্রথম দিবারাত্রির টেস্ট অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের নভেম্বরে। অ্যাডিলেডের ওভালের ম্যাচটিতে নিউজিল্যান্ডকে ৩ উইকেটে হারায় অস্ট্রেলিয়া, খেলা শেষ হয় তৃতীয় দিনে।

সবার শেষে বাংলাদেশ-ভারত

দিবারাত্রির টেস্ট চালুর পর ইতোমধ্যে খেলার অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে আইসিসির প্রথম দশটি পূর্ণাঙ্গ সদস্যরাষ্ট্রের আটটিরই। বাকি কেবল বাংলাদেশ আর ভারত। সর্বশেষ মৌসুমেও এ দুই দলের সামনে গোলাপি বল ক্রিকেটের প্রস্তাব ছিল। বাংলাদেশকে বলেছিল নিউজিল্যান্ড, ভারতকে অস্ট্রেলিয়া। কোনো দেশই তখন খেলতে রাজি হয়নি। আজ কলকাতায় শুরু হতে যাওয়া দুই দলের প্রথম গোলাপি বলের ম্যাচটি আবার উপমহাদেশের প্রথম। এ পর্যন্ত হওয়া ১১টির মধ্যে পাঁচটি হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায়, দুটি সংযুক্ত আরব আমিরাতে আর একটি করে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, নিউজিল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজে।

এ যাবৎ যা অভিজ্ঞতা

হয়ে যাওয়া ১১টি গোলাপি বল টেস্টের সবক'টিতে ফল হয়েছে, একটিও ড্র হয়নি। চারবার দল জিতেছে ইনিংস ব্যবধানে, তিনবার রান তাড়া করে। পঞ্চম দিনে গেছে পাঁচটি টেস্ট, চতুর্থ দিনে দুটি, তৃতীয় দিনে তিনটি আর দক্ষিণ আফ্রিকা-জিম্বাবুয়ের চার দিনের টেস্ট শেষ হয়েছে দু'দিনে। গোলাপি বলের প্রভাব দেখা গেছে সুইংয়ে, তুলনামূলক বেশি করে। স্পিনারদের ৯৫ উইকেটের তুলনায় পেসারদের শিকার অনেক বেশি (২৫৭); অবশ্য আমিরাত বাদে বাকি সব ভেন্যুই ছিল পেসনির্ভর। পেস বোলারদের বাড়তি সুবিধা পেতে দেখা গেছে গোধূলি বেলায়। তবে ব্যাটসম্যানরা খুব খারাপও করেননি। দুবাই, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের ম্যাচগুলোয় দুলগুলোকে ৪০০+ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। লো-স্কোরিং হয়েছে বেশি অস্ট্রেলিয়ার ম্যাচগুলোয়। এখন পর্যন্ত ১১ টেস্টে ১৬টি সেঞ্চুরি করেছেন ব্যাটসম্যানরা, যার মধ্যে আছে আজহার আলীর ট্রিপল আর অ্যালিস্টার কুকের ডাবল সেঞ্চুরিও।

ভবিষ্যৎ কেমন

গোলাপি বলে দিরারাত্রির টেস্টের মূল উদ্দেশ্য দর্শক বাড়ানো। এদিক থেকে অস্ট্রেলিয়ায় এটি সফল। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়ার ক্যালেন্ডারেও ঢুকে গেছে দিবারাত্রির ম্যাচ। তবে আসল সফলতা বোঝা যাবে ভারতে এক বা একাধিক ম্যাচ হওয়ার পর। ভারতে সাধারণত টেস্ট ম্যাচেও দর্শক আগ্রহ থাকে। তার পরও বাণিজ্যিকভাবে দিবারাত্রির ম্যাচে বাড়তি আয় হলে এর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। কারণ ভারত দিবারাত্রির ম্যাচ খেলতে চাইলে অন্য দেশগুলোও এদিকে ঝুঁকবে। ভারতে এসে ভালো খেলার জন্য নিজেদের দেশেও গোলাপি বলে ক্রিকেট চালু করে দেবে তারা।

আরও পড়ুন

×