নির্বাচনের পর চাঙ্গা শেয়ারবাজার
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১১:১২
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বেশ চাঙ্গা দেশের শেয়ারবাজার। গতকাল রোববার নির্বাচনের পর প্রথম লেনদেনের দিনে ৯১ শতাংশের বেশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে। এর প্রতিফলনও ছিল মূল্য সূচকে। প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স প্রায় পৌনে ৪ শতাংশ বেড়ে ৫৬০০ পয়েন্ট ছাড়িয়েছে। একই চিত্র ছিল অপর শেয়ারবাজার সিএসইতেও।
শুধু শেয়ারদর বা সূচক নয়, লেনদেনেও বড় অগ্রগতি আছে। নির্বাচনের আগের দিনের তুলনায় মোট শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ ৪৮৫ কোটি টাকা বেড়ে পৌনে ১৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আগের চারটি নির্বাচনের পর শেয়ারদর, সূচক ও লেনদেনে এমন উত্থান আর দেখা যায়নি।
২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনের পরদিন সূচক বেড়েছিল প্রায় আড়াই শতাংশ। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর দেড় শতাংশ সূচক বেড়েছিল। বাকি দুই নির্বাচনের মধ্যে ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর সূচক শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ বাড়লেও ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরদিন সূচক উল্টো শূন্য দশমিক ৪১ শতাংশ হারিয়েছিল।
এ অবস্থা প্রত্যাশিত মন্তব্য করেছেন শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি সমকালকে বলেন, আগের তিনটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ওই নির্বাচনগুলোর আগে আগে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কেটে যাবে– এমনটা কেউ ভাবেনি। ফলে বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা ছিল।
এবারের নির্বাচন তার বিপরীত মন্তব্য করে ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমে প্রায় সব মানুষ স্বস্তি বোধ করছেন। মানুষ প্রত্যাশা করছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। দেশে ফের ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রাণ ফিরবে, নতুন করে বিনিয়োগ বাড়বে।
প্রায় একই রকম মত দিয়েছেন অন্যতম ব্রোকারেজ হাউস প্রাইম ব্যাংক সিকিউরিটিজ ও ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি সমকালকে বলেন, বিনিয়োগকারীরা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নির্বাচনের মাধ্যমে আরেকটি রাজনৈতিক উত্তরণের পথ চেয়ে বসেছিলেন। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রত্যাশার প্রাথমিক ধাপ পূরণ হয়েছে। নিরঙ্কুশ বিজয় পাওয়ায় বিএনপি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা পেয়েছে। তা ছাড়া ক্রমাগত দর পতনে শেয়ারদর যে নিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছিল, সেখানে বিনিয়োগ করা লাভজনক হবে বলে মনে করেছেন তারা, যা শেয়ারবাজারের উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে এ দর বৃদ্ধি স্রেফ ভালো কিছুর প্রত্যাশায় হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী। তিনি বলেন, আগামী ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে পরিষ্কার হবে নতুন সরকার অর্থনীতিতে কতটা গতি সঞ্চার করতে পারবে। তার ওপর নির্ভর করবে শেয়ারবাজার সামনে কতটা এগোবে।
উত্থান পর্বটির শুরু কেমন ছিল
গতকালের লেনদেন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সকাল ১০টায় দিনের লেনদেনের শুরু হয় তিন শতাধিক কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধি দিয়ে। ‘প্রি-মার্কেট’ লেনদেনে ভর করে ডিএসইএক্স সূচক লেনদেন শুরুর মুহূর্তেই ৮৪ পয়েন্ট বা দেড় শতাংশের বেশি বেড়ে ৫৫২৭ পয়েন্ট ছাড়ায়। দ্রুতই ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর উল্লেখযোগ্য দর বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্য সব খাতের ভালো-মন্দ সব শেয়ারের দর বৃদ্ধি পায়। ফলে লেনদেন শুরুর মাত্র চার মিনিট পর সূচকটি ১৭০ পয়েন্ট বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ৫৫৬৯ পয়েন্ট ছাড়িয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সূচকের বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে ব্যাংক এবং ওষুধ খাত। এ দুই খাতই যোগ করেছে প্রায় ১০০ পয়েন্ট।
একীভূত হওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংক ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানি এখন ৩৫৫টি। এর মধ্যে শুরুতেই ৮৫ কোম্পানির শেয়ার সার্কিট ব্রেকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ দরে কেনাবেচা হয়। শেষ পর্যন্ত এমন দরে স্থির ছিল ৬০টি। কমপক্ষে ৫ শতাংশ দর বেড়েছে ১৩৭ কোম্পানির শেয়ার।
খাতওয়ারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এদিন ব্যাংক-বীমা এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের শেয়ারদর বেড়েছে তুলনামূলক বেশি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২৩ কোম্পানির মধ্যে একটি ছাড়া বাকি সবকটির বাজারদর বেড়েছে এবং গড়ে শেয়ারদর বেড়েছে পৌনে ৬ শতাংশ। এ ছাড়া ব্যাংক খাতের গড়ে সাড়ে ৩ শতাংশ এবং বীমা খাতের সোয়া ৩ শতাংশ হারে দর বেড়েছে। তবে সিরামিক এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতের ৯ কোম্পানির গড়ে সোয়া ৫ শতাংশ দর বৃদ্ধি ছিল সর্বোচ্চ। অন্য সব খাতের ২-৩ শতাংশ হারে দর বেড়েছে। চাহিদার দিক থেকে শীর্ষে ছিল সিটি ব্যাংকের শেয়ার। সাড়ে ৮ শতাংশ দর বৃদ্ধির সঙ্গে প্রায় ৮১ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ডিএসইতে ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় প্রায় ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর লেনদেন সাড়ে ৪৮ শতাংশ বেড়ে ৪৩১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছিল।
- বিষয় :
- শেয়ারবাজার
