স্নায়ুযুদ্ধের রূপরেখা
নতুন এআই মডেল
শাহেরীন আরাফাত
প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ | ১০:৩১
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু মানুষের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া বা ছবি আঁকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সাইবার জগতের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। মার্কিন স্টার্টআপ অ্যানথ্রোপিক কিছুদিন আগে তাদের সর্বাধুনিক এআই মডেল ক্লড মিথোস প্রিভিউ জনসমক্ষে আনার ঘোষণা দেয়।
এতে পুরো বিশ্বের নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রক কিছু সংস্থার মধ্যে অভূতপূর্ব আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যার মূল কারণ মিথোসের বিশেষ ক্ষমতা। সফটওয়্যারের জটিল সাইবার নিরাপত্তা ত্রুটি বা দুর্বলতা নিখুঁতভাবে খুঁজে বের করে সেগুলো কাজে লাগানোর দক্ষতা রয়েছে এর। এ ঘটনা শুধু প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের প্রমাণ নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার চলমান প্রযুক্তিগত স্নায়ুযুদ্ধে এটি নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে।
প্রজেক্ট গ্লাসউইং
অ্যানথ্রোপিক তাদের এই অতিক্ষমতাধর মডেলটি প্রজেক্ট গ্লাসউইং নামে বিশেষ উদ্যোগের আওতায় সিসকো, জেপি মরগান চেস ও এনভিডিয়ার মতো মার্কিন প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের হাতে এটি তুলে দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, নিজেদের ক্রিটিক্যাল বা অতীব জরুরি সফটওয়্যার অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি ও অন্য সব সরকারি সংস্থা সাইবার নিরাপত্তার স্বার্থে এ মডেলের ব্যবহার শুরু করেছে। সবার নজর কেড়েছে এ তালিকায় চীনের অনুপস্থিতি।
চীনকে বৈরী রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যা দিয়ে অ্যানথ্রোপিক কোনো চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে এই মডেল ব্যবহারের আমন্ত্রণ জানায়নি। এমনকি হংকং ছাড়াও বৃহত্তর চীনে অ্যানথ্রোপিকের সব ধরনের সেবা এখন নিষিদ্ধ।চীন কোথায় দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এমন রক্ষণশীল আচরণের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই এআই সাইবার সক্ষমতায় চীনের অবস্থান কোথায়? বেইজিংভিত্তিক কনসালট্যান্সি ফার্ম কনকর্ডিয়া এআইর মতে, চীনের এআই মডেলে মূলত ওপেন সোর্স (সবার জন্য উন্মুক্ত) হওয়ায় সেগুলো এখনও মার্কিন ক্লোজড সোর্স মডেলের তুলনায় পিছিয়ে।
গত এক বছরে চীনা মডেলের অপ্রত্যাশিত উন্নতি এটা প্রমাণ করে যে এই ব্যবধান খুব দ্রুত কমে আসছে। সাইবার সক্ষমতা যাচাইয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য বেঞ্চমার্ক হলো সাইবারজিম। এটি পরীক্ষা করে দেখে এআই এজেন্ট কতটা নিখুঁতভাবে রিয়েল ওয়ার্ল্ড ওপেনসোর্স সফটওয়্যারের ত্রুটি ধরতে পারে। এই বেঞ্চমার্কে মিথোসের স্কোর ৮৩.১ শতাংশ।
অন্যদিকে চীন বসে নেই। মিথোস ঘোষণার দিনেই বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ঝিপু এআই তাদের জিএমএল ৫.১ মডেল প্রকাশ করে। যার সাইবারজিম স্কোর ৬৮.৭ শতাংশ। চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, এই স্কোর অ্যানথ্রোপিকের মাত্র দুই মাস আগে (ফেব্রুয়ারিতে) রিলিজ হওয়া ফ্ল্যাগশিপ মডেল ক্লড ওপাস ৪.৬-এর চেয়েও বেশি।
অন্যদিকে মুনশট এআই গেল জানুয়ারিতে তাদের কিমি কে২.৫ মডেল উন্মুক্ত করেছিল, যার স্কোর ছিল ৪১.৩ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের গবেষকরা সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলেছেন, মডেলটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাইবার আক্রমণ চালানোর মতো একেবারে অত্যাধুনিক ক্ষমতা এখনও তৈরি হয়নি। তবে আধা স্বয়ংক্রিয় সাইবার আক্রমণের ক্ষেত্রে এটি এতটাই দক্ষ যে, ভবিষ্যতের সংস্করণের দিকে কড়া নজর রাখতে হবে। ইতোমধ্যে মুনশট তাদের নতুন মডেল কিমি কে২.৬ প্রকাশ করেছে। একে থার্ড পার্টি বেঞ্চমার্কিং প্রতিষ্ঠান আর্টিফিশিয়াল অ্যানালাইসিস বিশ্বের সর্বাধুনিক ওপেনসোর্স মডেল হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
কিউয়েন সাইবার এজেন্ট
এআই সাইবার সক্ষমতা মূলত দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য, অর্থাৎ যে প্রযুক্তি দিয়ে সিস্টেম হ্যাক করা যায়, সেই একই প্রযুক্তি দিয়ে সিস্টেমের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা সম্ভব। চীন এখন এই প্রতিরক্ষামূলক
কৌশলে বিপুল বিনিয়োগ করছে।
আলিবাবা গ্রুপের গবেষকরা ডেভেলপার ও কোম্পানিকে সাইবার হামলা থেকে বাঁচাতে কিউয়েন সাইবার এজেন্ট নামে টুল তৈরি করছেন। এই প্রজেক্টের সহ-নেতৃত্বে রয়েছেন হংকং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির এআই গবেষক ইউচং শি, যিনি এর আগে মুনশটের কিমি কে২.৫-এর সাইবার নিরাপত্তা মূল্যায়নের দায়িত্বে ছিলেন। যদিও এই টুল কবে নাগাদ আলোর মুখ দেখবে বা এটি সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হবে কিনা, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সমীকরণ কী বলছে
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট মনে করেন, চীনের সঙ্গে এআই প্রতিযোগিতায় মিথোস যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্রেকথ্রু বা যুগান্তকারী সাফল্য। এদিকে ওপেনএআই ইঙ্গিত দিয়েছে, দ্রুতই তারা সমকক্ষ ক্ষমতার মডেল উন্মোচন করবে।
বিশ্বের অতি জরুরি সফটওয়্যার অবকাঠামোর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মিথোসের প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা কি চীনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া উচিত?
এই বিতর্কে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন এআই চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াং।
তিনি মনে করেন, মিথোসের মতো অপ্রতিরোধ্য প্রযুক্তির আবির্ভাবের পর যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চীনের ওপর থেকে প্রযুক্তিগত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা (বিশেষ করে অ্যাডভান্সড চিপের ক্ষেত্রে) পুনর্বিবেচনা করা। চীনকে কোণঠাসা করা কোনো সমাধান নয়। কারণ, চীন খুব সহজেই নিজেদের মিথোস তৈরি করে নিতে পারে।
হুয়াং বলেন, আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ী হোক। কিন্তু আমি মনে করি, পারস্পরিক সংলাপ ও গবেষণামূলক আলোচনা করাই সর্বোত্তম পথ।
সাইবার নিরাপত্তার চরম সতর্কতা
অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা নতুন এই এআই পরিচালিত সাইবার হুমকি সামাল দিতে শিল্প খাতের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। তারই ধারাবাহিকতায় হংকং মনিটরি অথরিটি (এইচকেএমএ) প্রধান ব্যাংককে সঙ্গে নিয়ে সাইবার হুমকি মোকাবিলায় বিশেষ পাবলিক-প্রাইভেট টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। অ্যানথ্রোপিকের মিথোস চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।
যুক্তরাষ্ট্র আপাতত নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে চাইলেও চীনের ওপেন সোর্স কমিউনিটির দ্রুত উত্থান প্রমাণ করে, এই প্রযুক্তিগত দেয়াল দুর্ভেদ্য নয়।
- বিষয় :
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
