ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিয়ন্ত্রণ করার অপকৌশল

ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন

নিয়ন্ত্রণ করার অপকৌশল
×

সাড়াজাগানো অনলাইন গেম শুধু বিনোদন নয়; এসব কোটি কোটি ডলারের শিল্প।

সাব্বিন হাসান

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৩:১৫ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ২০:৫৪

সাড়াজাগানো অনলাইন গেম শুধু বিনোদন নয়; এসব কোটি কোটি ডলারের শিল্প। সবকটি বড় গেমের পেছনে কাজ করছেন মনোবিজ্ঞানী, ডেটা বিশ্লেষক
আচরণ বিজ্ঞানী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ। এর লক্ষ্য– খেলোয়াড়কে যতটা সম্ভব গেমের ভেতরে নিমগ্ন করা

ঘড়ির কাঁটায় রাত ৩টা। ঘরের আলো নিভে গেছে অনেক আগেই। দরজার ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ছে শুধু স্মার্টফোনের নীলাভ আলো। হেডফোন কানে দিয়ে একমনে কিশোর তাকিয়ে আছে পর্দার দিকে। বাড়ির লোকজন ভাবছেন, ছেলে হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছে বা কোনো ভিডিও দেখছে।

বাস্তবে সে হয়তো অনলাইন গেমের শেষ মিশনে পৌঁছানোর লড়াই করছে। অথবা এমন কোনো গোপন অনলাইন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, যার সবকটি ধাপ তাকে একটু একটু করে পরিবার, বন্ধু, বাস্তব জীবন ও নিজের মানসিক ভারসাম্য থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। প্রযুক্তির ইতিহাসে সব ধরনের নতুন আবিষ্কার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন বিপদ। অতীতে ডাকযোগে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এখন তা চলে টেলিফোনে। আজ সেই প্রতারণার বড় মঞ্চ স্মার্টফোনের পর্দা। আর সেই পর্দার আড়ালেই তৈরি হয়েছে নতুন আরেক অন্ধকার জগৎ– সাইবার চ্যালেঞ্জ, অনলাইন গেমিং ও ডিজিটাল জালিয়াতির ধূম্রজাল। 

সারাবিশ্বে ২০১৭ সালে হইচই ফেলে দেয় একটি শব্দ– ব্লু হোয়েল চ্যালেঞ্জ। সংবাদমাধ্যম, টেলিভিশন, সোশ্যাল মিডিয়া– সব জায়গায় আতঙ্ক ছড়িয়েছে এই শব্দ। দাবি করা হয়, রহস্যময় অনলাইন গেম কিশোর-কিশোরীকে ৫০টি ধাপে নানা বিপজ্জনক কাজ করার নির্দশনা দেয়। আর শেষমেশ প্ররোচিত করে আত্মহত্যায়।

বিশ্বের অনেক দেশে কয়েক ডজন মৃত্যুর পেছনের কারণ হিসেবে এই সর্বনাশা গেমের নাম সামনে আসে। তদন্ত কিছুটা এগোতেই সামনে আসে আরেক ঘটনা। বহু ঘটনায় ব্লু হোয়েলের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার তেমন কোনো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ জানায়, এই গেম ঘিরে যে বহু মৃত্যুর দাবি করা হয়েছিল, তার অধিকাংশের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু গল্প এখানেই শেষ নয়। কারণ, একটি নাম হয়তো অতিরঞ্জিত ছিল। যে বিপদের দিকে সেটি আঙুল তুলেছিল, তা ছিল আর এখনও রয়েছে। অঘোষিত সেই বিপদের নাম ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন; মানুষের মনকে প্রযুক্তির সহায়তায় নিয়ন্ত্রণ করার অপকৌশল।

সবকটি বড় গেমের পেছনে কাজ করছেন মনোবিজ্ঞানী, ডেটা বিশ্লেষক, আচরণ বিজ্ঞানী ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ। এর লক্ষ্য– খেলোয়াড়কে যতটা সম্ভব এর ভেতরে নিমগ্ন করে রাখা। এই আটকে রাখা কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং পরিকল্পিত ছক। লগইন করা মাত্রই পুরস্কার, নতুন স্কিন, নতুন অস্ত্র, নতুন চরিত্র, সীমিত সময়ের ইভেন্ট, বন্ধুর সঙ্গে প্রতিযোগিতা, বিশ্ব র‌্যাঙ্কিং– সব মিলিয়ে তৈরি হয় অদৃশ্য মায়ার মানসিক এক জগৎ। প্রতিবার ছোট্ট সাফল্যের সঙ্গে মস্তিষ্কে নিঃসৃত হয় ডোপামিন। সেই আনন্দ আরেকবার অস্বাদে ফিরে পেতে খেলোয়াড় আরও একবার খেলতে চায়। তারপর আরও একবার। তারপর আরও। ক্রমে এই গেমের নেশা শুধু সময় কাটানোর ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকে না; হয়ে ওঠে মানসিক প্রয়োজন। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৯ সালে গেমিং ডিজঅর্ডারকে বৈশ্বিক রোগ শ্রেণিবিভাগে অন্তর্ভুক্ত করে। সংস্থাটি বলছে, যখন কোনো ব্যক্তি নিজের গেম খেলার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান; ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত বা পেশাগত ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও খেলায় বুঁদ হয়ে পড়েন; এ অবস্থা চলে দীর্ঘদিন– তখন সেটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় দৃশ্যমান প্রভাব ফেলে। বিশ্বের প্রতিটি দেশেই এ প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। 

ইউনিসেফ পরিচালিক সমীক্ষা বলছে, স্মার্টফোন ও অতিমাত্রায় ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে বয়স দ্রুত কমছে। অনেক শিশু ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ার গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষার্থীর স্কুলের পড়া, খেলাধুলা, পারিবারিক যোগাযোগ– সবকিছুর জায়গা ক্রমে ও নীরবে জায়গা করে নিয়েছে ভার্চুয়াল জগৎ।

তবে জানার বিষয় হলো, পাবজি (বর্তমানে বিজিএমআই), ফ্রি ফায়ার, রবলক্স, ফর্টনাইট বা ভেলোরেন্ট– এসব গেম আত্মহত্যাকে প্ররোচিত করে না। লক্ষাধিক গেমপাগল মানুষ প্রতিদিন এসব গেম খেলেন। অধিকাংশের ক্ষেত্রে তেমন সমস্যা হয় না। অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অতিরিক্ত আসক্তি, অনলাইন বুলিং, অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ ও অর্থ ব্যয়ের প্রলোভন– এসব কারণে অনেকের জন্য গেমগুলো বিপজ্জনক হতে পারে। এখানেই শুরু হয় অপচক্রের খেলা।

সাইবার অপচক্র সব সময়ই গেমিং প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করছে নতুন টার্গেটের খোঁজে। কখনও তারা নিজেকে সহ-খেলোয়াড় বলে পরিচয় দেয়, কখনও বিনামূল্যে ডায়মন্ড, ইউসি বা গেমিং কারেন্সি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কখনও আবার ফেক টুর্নামেন্টের লিঙ্ক পাঠিয়ে টার্গেট করে ব্যক্তিগত ও ব্যাংকিং তথ্য বা ওটিপি। 

অনেক দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, অনলাইন গেমিং এখন শুধু বিনোদন মাধ্যম নয়; এটি সাইবার প্রতারণা, পরিচয় চুরি, শিশুর অনলাইন গ্রুমিং বা আর্থিক জালিয়াতির বড় ক্ষেত্র। উদ্বেগের কারণ হলো, এই অপচক্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে মানুষের একাকিত্বকে। একজন কিশোর যখন বাস্তব জীবনে নিজেকে অবহেলিত মনে করে, তখন ভার্চুয়াল জগতে একটি দল, একটি ক্ল্যান, একটি অনলাইন পরিবার তাকে সহজেই কাছে টেনে নেয়। এমন বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই শুরু হয় মানসিক টানাপোড়েন। 

প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর গোপনীয়তা, সর্বশেষ নির্ভরতা– শেষমেশ যার পরিণতি হয় ব্ল্যাকমেইলের শিকার। ব্লু হোয়েলের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই। বিপদ শুধু গেমের ছকে বাধা নেই; বিপদ সেই অদৃশ্য মানুষটির মধ্যে, যে পর্দার ওপাশ থেকে একজনের মনকে নিজের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই শঙ্কা শুধু প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়; বরং এই টানাপোড়েন প্রযুক্তির অপচর্চার বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন

×