সংঘবদ্ধ সাইবার আক্রমণের শিকার বিএনপির নেতাকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টরা
প্রতীকী ছবি
হাসনাইন ইমতিয়াজ
প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৫ | ১৯:১৪ | আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১৪:০০
বিএনপির নেতাকর্মী এবং বিএনপিপন্থি অ্যাক্টিভিস্টরা সংঘবদ্ধ সাইবার আক্রমণের মুখে পড়েছেন। গত কয়েক মাস ধরে ঘোষণা দিয়ে তাদের ফেসবুক আইডি ও পেজ নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে একটি চক্র। এ ধরনের একাধিক পেজ শনাক্ত করেছে সমকাল।
আক্রমণের শিকার ফেসবুক আইডিগুলোর মধ্যে রয়েছে বিএনপিপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট, লেখক এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জামাতা ফাহাম আব্দুস সালামের ৪ লাখ ৭১ হাজার ফলোয়ার সমৃদ্ধ আইডি, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সদস্যসচিব রবিউল ইসলাম নয়ন, সিনিয়র সাংবাদিক মুজতবা খন্দকার, ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি প্রার্থী মো. আবিদুল ইসলাম খান, ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক সারোয়ার হোসেন ও মানসুরা আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যারয়ের ছাত্রদলের ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক চেমন ফারিয়া ইসলাম মেঘলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবু জর গিফরী ইফাত, অ্যাক্টিভিস্ট লিও, ফাতিমা বিভা প্রমুখ। তাদের অধিকাংশ আইডি ও পেজ উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
অনলাইন ভেরিফিকেশন ও মিডিয়া গবেষণা প্লাটফর্ম ডিসমিসল্যাবের প্রতিষ্ঠাতা মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিএনপির নেতাকর্মী ও অ্যাক্টিভিস্টদের ওপর সংঙ্গবদ্ধ সাইবার আক্রমণের বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন। তারা ইতোমধ্যে ৮টি এমন ঘটনা শনাক্ত করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইবার আক্রমণের শিকার সাংবাদিক মুজতবা খন্দকার শনিবার সমকালকে বলেন, গতকাল শুক্রবার ৬ ঘণ্টার জন্য তার আইডিটি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। এরপর বিদেশ অবস্থানরত এক বন্ধুর সহযোগিতায় তা উদ্ধার করতে সক্ষম হোন। কারা এই আক্রমণ চালিয়েছে জানতে চাইলে তিনি জানান, এ বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, একটি সংবদ্ধ চক্র সাইবার হামলা চালিয়ে বিএনপি নেতাকর্মী এবং অ্যাক্টিভিস্টদের পেজ নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে। দলের তথ্যপ্রযুক্তি সেলের সহেযাগিতায় আক্রান্ত আইডি ও পেজ ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। ইতোমধ্যে অনেকেই তাদের আইডি ও পেজ ফেরত পেয়েছন।
আক্রমণের পেছনে কারা
রেড জুলাই সাইবার ফোর্স নামের একটি পেজে দাবি করা হয়েছে, ‘‘তারা এই পেজগুলো নিষ্ক্রিয় করেছে। কারণ হিসেবে পেজটির একটি স্টাটাসে বলা হয়েছে–‘অনেকে ইনবক্সে জিজ্ঞেস করেছেন আমরা কারা। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, আমরা জুলাইয়ের সেই শক্তি যারা চব্বিশের জুলাইতে আওয়ামী আইডি এবং পেজ ডিজেবল করার মাধ্যমে স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করেছি। সময়ের প্রয়োজনে আমরা আমাদের কাজ থেকে দীর্ঘদিন বিরতি নিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি জুলাইয়ের সহযোদ্ধা বিএনপি ফ্যাসিস্ট হাসিনার মত হয়ে উঠতে চাচ্ছে। হাজার শহীদের রক্তে অর্জিত স্বাধীনতাকে তারা ক্ষমতায় যাওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। আমরা কোনো রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতায় আহরণের জন্য জুলাই বিপ্লব করিনি। বিএনপি এখন জুলাই সনদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে জুলাইয়ের সঙ্গে প্রতারণা করছে....। আমরা স্পষ্ট করে সকল রাজনৈতিক দলকে জানাতে চাই, যারাই জুলাই সনদের পথে বাধা হবে তারাই আমাদের শত্রু। যেভাবে ফ্যাসিস্টদের মতো যারা জুলাই সনদের বিপক্ষে দাঁড়াবে, তাদেরও দেশ থেকে পালাতে বাধ্য করব। বিএনপির অ্যাক্টিভিস্টদের হাতে এখনও সময় আছে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য রাজি হওয়ার। নাহলে তাদের পরিণতিও ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো হবে।’
আরেকটি স্টাটাসে পেজের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে– ‘‘আমরা ‘হ্যাঁ’ (জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট সংক্রান্ত) এর পক্ষে। কারণ, হ্যাঁ মানে স্বাধীন, স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ...। হ্যাঁ মানে মসজিদে হামলা বন্ধ, হ্যাঁ মানে পাথর, ইট নিয়ে মানুষ হত্যা বন্ধ, হ্যাঁ মানে আলেম-ওলামা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সম্মান রক্ষা, হ্যাঁ মানে সৎ নেতৃত্বের জয়, হ্যাঁ মানে ইসলাম, দেশ ও মানবতার সুরক্ষা, হ্যাঁ মানে শান্তি, প্রগতি ও স্বাধীনতার পথে অগ্রগতি ইত্যাদি। যারা যারা এসব বিষয়ে বিরোধী, তারাই ‘না’ ভোটের পক্ষে। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি নতুন, স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক দেশ গঠনে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিচ্ছি — কারণ এটিই দেশের কল্যাণে কাজ করার একমাত্র সুযোগ। দল মত নির্বিশেষে ন্যায় ও ইনসাফ ফিরিয়ে এনে দেশকে স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত করতে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিন।’’
তথ্য যাচাই করে দেখা গেছে, চলতি বছরের গত ৩ মে রেড জুলাই সাইবার ফোর্স পেজটি তৈরি করা হয়। ক্রিয়েটর হিসেবে নাম রয়েছে কামরুল হাসান অনির। পেজের প্রোফাইলে শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকার ছবি দেওয়া হয়েছে। একাধিক ব্যক্তি পেজটি নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রথমে পেজটির নাম ছিল বিজয় ৭১। গত ৩১ অক্টোবর নাম বদলিয়ে রাখা হয় রেড জুলাই সাইবার ফোর্স। পেজটি দেশের বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে জানা গেছে। পেজের তথ্যে ঠিকানা দেওয়া রয়েছে ভারত। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কাজ করত বলা রয়েছে। আওয়ামী লীগেও ছিল এমনটি বলা হয়েছে। পড়াশোনার বিষয়ে বলা হয়েছে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ফলোয়ার তালিকায় কামরুল হাসান অনি নামের একটি আইডি পাওয়া গেছে। যার প্রোফাইলে লেখা রয়েছে ছাত্রলীগের কর্মী। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের মিছিল, সমন্বয়কদের ফেক ভিডিও, ছবি প্রচার করতে দেখা গেছে অনির আইডি থেকে। তবে রেড জুলাই সাইবার ফোর্স পেজে আওয়ামী লীগের প্রবাসী অ্যাক্টিভিস্ট অমি রহমান পিয়াল, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানীসহ আওয়ামী পন্থী অ্যাক্টিভিস্টদের আইডি নিষ্ক্রিয়ের তথ্যও দেওয়া পেজে।
গত মে মাসে রেড জুলাই সাইবার ফোর্স পেজ তৈরির পর প্রথম ৪ মে মানসুরা আলমের আইডি নিষ্ক্রিয় করার সংবাদ জানায়। এসসময় পেজটির পক্ষ থেকে বলা হয়– ‘‘যারা জুলাইকে কটাক্ষ সকরছে তাদের আইডি ডাউন করা হচ্ছে। এরপর পেজটিতে রবিউল ইসলাম নয়ন, ফাতিমা বিভা, আবিদুল ইসলাম, ফাহাম আব্দুস সালামসহ কয়েকজনের আইডি ও পেজ নিষ্ক্রিয় করার তথ্য জানানো হয়েছে। ২০ মের পর থেকে ২৮ সেপ্টম্বর পর্যন্ত পেজে কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। ২৯ সেপ্টেম্বর ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে নিয়ে একটা অনলাইন ভোটের আয়োজন করা হয়। এরপর ৩১ অক্টোবর পেজে একটা স্টাটাস দেওয়া হয়– যাতে লেখা হয়–‘আমরা লক্ষ্য করছি বিএনপিপন্থী কিছু অ্যাক্টিভিস্ট এখনও আমাদের দেশবিরোধী শক্তি হিসেবে কটূক্তি করে যাচ্ছে। মানে যাদের হাত ধরে বিএনপি ১৭ বছরের স্বৈরাচার থেকে মুক্তি পেয়েছে তারাই এখন বিএনপির কাছে দেশবিরোধী শক্তি। আমরা বিএনপিকে আহ্বান করবো তারা যেন তাদের ছাপড়ি অ্যাক্টিভিস্টদের সংযত হতে বলে। নাহলে আমরা আজকে রাতেই সেকেন্ড ধাপে সাইবার হামলা চালাবো। যাতে বিএনপির কোনো ছাপড়ি অ্যাক্টিভিস্টই অনলাইনে থাকতে না পারে।’’ এরপরই গতকাল থেকে আবার বিভিন্ন আইডি ও পেজ আক্রমণের তথ্য দেওয়া হয়। এদিকে রেড জুলাইন সাইবার ফোর্স নামে আরেকটি পেজের সন্ধান পাওয়া যায়, যেটি তৈরি হয় গত ৩১ অক্টোবর। এই পেজটি হলো আগের পেজের কপিপেস্ট।
কীভাবে আক্রমণ চালানো হয়
আইডি বা পেজ কিভাবে নিষ্ক্রিয় করা হয় ও এ থেকে রক্ষার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, অনলাইনে অনেক সংঘবদ্ধ দল রয়েছে যাদের স্প্যামার বলা হয়। এরা বিভিন্ন উদ্দেশ্যে, সেটা হোক রাজনৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয় দলগতভাবে রিপোর্ট করে টার্গেটকৃত পেজ বা আইডি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। তারা প্রথমে ওই পেজের কোনো দুর্বলতা–যেমন হিংসাত্মক, ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক, কপিরাইট ভঙ্গসহ ফেসবুক কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে বিরোধ রয়েছে এমন কন্টেন্ট খুঁজে বের করে। এরপর একযোগে ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে তা নিয়ে প্রতিবাদ জানায়। বার বার রিপোর্ট হলে বিষয়টি ফেসবুক কর্তৃপক্ষ আমলে নেয়। তারপর নীতিমালা অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মহিউদ্দিন বলেন, ‘এই আক্রমণ থেকে পুরোপুরি রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয়। তবে তৃতীয় পক্ষের কন্টেন্ট শেয়ার করার সময় সতর্ক থাকতে হবে। স্ট্যাটাস বা শেয়ারের ক্ষেত্রে ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ন্ড ভঙ্গ হচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।’
- বিষয় :
- সাইবার হামলা
- বিএনপি
- হ্যাকার গ্রুপ
