রথখোলা মাঠ কি হারিয়ে যাবে
সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২০
নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পদচিহ্ন
বিজড়িত কিশোরগঞ্জ শহরের রথখোলা মাঠ। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের উদাসীনতা আর
একশ্রেণির মানুষের অবৈধ দখলে ঐতিহাসিক এই মাঠটি এখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে এটি সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছে সচেতন মহল। অন্যথায় কঠোর
আন্দোলনের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, '৬৯-এর
গণআন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ- প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন-সংগ্রামের
সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই রথখোলা মাঠ। নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, মওলানা আবদুল
হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মণি সিংহ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক
মোজাফ্ফর আহমদ, জিল্লুর রহমান, সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ আজকের রাষ্ট্রপতি মো.
আবদুল হামিদ ও অন্যান্য জাতীয় নেতা বিভিন্ন সময় এখানে দাঁড়িয়ে বজ্রকণ্ঠে
বক্তব্য দিয়েছেন। উদ্দীপনামূলক বক্তব্য দিয়ে তারা সাধারণ মানুষকে
আত্ম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনুপ্রাণিত করেছেন। তবে বর্তমান প্রজন্মের
নেতাকর্মী এমনকি প্রশাসনের কর্মকর্তারাও ঐতিহাসিক এই মাঠ সম্পর্কে কোনো
খোঁজ রাখেন না।
জেলা শহরের মধ্যস্থানে সবচেয়ে দামি এলাকা হিসেবে পরিচিত রথখোলা। নরসুন্দা
নদীবিধৌত এই মাঠকে কেন্দ্র করেই এলাকার নাম হয় রথখোলা। সরেজমিন দেখা যায়,
মাঠটির পূর্ব পাশে মানসী সিনেমা হল সংলগ্ন এলাকার প্রায় ২০ শতক জায়গা দখল
করে প্রভাবশালীরা দোকান নির্মাণ করেছে। উত্তর ও পশ্চিম দিকের প্রায় ১০
শতাংশ ভূমিও বেহাল। পশ্চিম-দক্ষিণ কোণে কমিউনিটি পুলিশের কার্যালয় নির্মাণ
করে একটি ঘর তৈরি করা হয়েছে। চারপাশের প্রায় এক একর ভূমি এরই মধ্যে দখল হয়ে
গেছে। মাঠের পাশে ময়লা-আবর্জনা ফেলে রাখা হয়েছে। ভেতরে প্রাইভেটকার রেখে
মাঠকে অস্থায়ী গ্যারেজে পরিণত করা হয়েছে।
এলাকার অনেকেই জানান, দখলদারদের কবলে পড়ে মাঠটি দিন দিন ছোট হয়ে আসছে।
ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। প্রশাসন ও রাজনীতিবিদরা নীরব
দর্শকের ভূমিকায় আছেন। তারা আরও জানান, এই মাঠে '৭০-এর নির্বাচনের পর
আওয়ামী লীগের ডাকে একাধিক বিশাল সমাবেশ হয়। বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ
১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ছাত্র-জনতার বিশাল সমাবেশে পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে
স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এই মাঠে অসংখ্যবার বক্তব্য দিয়েছেন। এ ছাড়া বাম
রাজনীতির ধারক-বাহক থেকে শুরু করে সবাই এই মাঠে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ তারা
কেউ মাঠটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিচ্ছেন না।
পরিবেশ রক্ষা মঞ্চ (পরম) সভাপতি অধ্যক্ষ শরীফ আহমেদ সাদী বলেন, রথখোলা মাঠ এ
জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি প্রধানতম অংশ। এই মাঠে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে
নেতাজী সুভাষ বসু সভা করেছেন। পরে মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, বঙ্গবন্ধুসহ জাতীয় নেতারা বক্তব্য
দিয়েছেন। স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তি সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন ও গণতন্ত্রের
সংগ্রামে এই রথখোলা বিশাল অবদান রেখেছে। এই মাঠটি আজ বেদখল হয়ে যাচ্ছে। তবে
এর ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রাখতে জেলাবাসী বদ্ধপরিকর। এ ব্যাপারে তিনি জেলা
প্রশাসনসহ সব মহলের দ্রুত হস্তক্ষেপ চান। অন্যথায় পরমের পক্ষ থেকে তারা বড়
কর্মসূচি দেবেন।
কিশোরগঞ্জ ছড়াকার সংসদের সভাপতি ও আশির দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা, মুক্তিযুদ্ধ
গবেষক জাহাঙ্গীর আলম জাহান বলেন, ঐতিহাসিক রথখোলা মাঠটি সবসময়ই
সভা-সমাবেশের জন্য ব্যবহার হয়েছে। হঠাৎ কার প্ররোচনায় কিংবা প্রভাবে এই
মাঠে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে ইতিহাস-ঐতিহ্য বিনষ্ট করা হচ্ছে- তা
অবশ্যই খতিয়ে দেখার দাবি রাখে। এ কাজটি যাদের করার এখতিয়ার তাদের নীরবতাও
জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ সম্মিলিত নাগরিক ফোরামের সভাপতি এনায়েত করিম অমি বলেন, মুজিববর্ষ
উপলক্ষে এ বছরই ঐতিহাসিক এই মাঠে স্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে সবার জন্য এটি
ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা
করা হবে।
পৌর মেয়র মাহমুদ পারভেজ জানান, যদি মাঠটি উদ্ধার করে দেওয়া হয়, তাহলে
পৌরসভার পক্ষ থেকে এ মাঠে একটি স্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে দেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র
সূত্রধর বলেন, রথখোলা মাঠের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি সামান্য অবহিত আছেন। এই
মাঠের সঙ্গে যেহেতু মুক্তি সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের সম্পর্ক রয়েছে, সেহেতু
মুজিববর্ষ উপলক্ষে বিষয়টির দিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব
দেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসক আসার পর তার সঙ্গে আলোচনা করে
সরেজমিন পরিদর্শনের পর করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ বিষয়ে জেলা
প্রশাসনের রাজস্ব শাখার মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে ত্বরিত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস
দেন তিনি।
- বিষয় :
- মাঠ
