ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

দখলগ্রাসে কীর্তনখোলা নির্বিকার প্রশাসন

দখলগ্রাসে কীর্তনখোলা নির্বিকার প্রশাসন
×

পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল

প্রকাশ: ১৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৪

সরকারি বিধি অনুযায়ী নদীর দুই তীরের যে অংশ শুস্ক মৌসুমে চর পড়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ডুবে যায়, তা ফোরশোর নামে অভিহিত। ওই ফোরশোর এলাকায় কারও অধিকার থাকে না। কেউ এই জমি দখল করলে তিনি দখলদার হিসেবে চিহ্নিত হবেন। তবে সরকারি এ বিধি ভঙ্গ করে বরিশাল নগরের পূর্ব রূপাতলী এলাকার খলিফাবাড়ি পয়েন্ট থেকে উত্তরে কাটাদিয়া খাল পর্যন্ত কীর্তনখোলার পশ্চিম তীরে প্রায় দেড় কিলোমিটার ফোরশোর দখল করা হচ্ছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ওই এলাকার প্রভাবশালী রাইভিউল কবির স্বপন প্রকাশ্যে কীর্তনখোলার তীর দখল করলেও প্রশাসন দখল বন্ধে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।

সরেজমিন নগরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের রূপাতলী মৌজার অধীন কীর্তনখোলার ওই অংশে গিয়ে দেখা গেছে, নদীতীরের খলিফাবাড়ি পয়েন্ট থেকে মেহগনি গাছ দিয়ে পাইলিং করে বালু ও মাটি ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নদী। দখল কবলে পড়া নদীর এ অংশের দুই স্থানে পাকা গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়েছে ভাঙন প্রতিরোধের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ফেলানো কংক্রিটের ব্লক দিয়ে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পূর্ব রূপাতলী এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানান, রাইভিউল কবির স্বপন একসময় নগরের মধ্যেই কীর্তনখোলার তীরে ইটভাটা চালিয়েছেন। প্রশাসনিক চাপে ওই ইটভাটা বন্ধ করলেও এখন কীর্তনখোলার তীরজুড়ে ইট, বালু, পাথরের ডিপো এবং ডকইয়ার্ড গড়ে তুলেছেন। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেছে, 'স্বপন মিয়ার ডক' নামে পরিচিত ইয়ার্ডটিতে সদ্য দুর্ঘটনাকবলিত কীর্তনখোলা-১০ লঞ্চটি মেরামত করা হচ্ছে। ডকইয়ার্ডটির মধ্যে চোখে পড়ে শত শত কংক্রিটের ব্লক, যা পাউবো তৈরি করেছিল ভাঙন প্রতিরোধ কাজে ব্যবহারের জন্য। আশপাশের লোকজনের অভিযোগ, রাইভিউল কবির স্ব্বপন পাউবোর ওই ব্লকগুলো ডকইয়ার্ডের প্রয়োজনে যথেচ্ছ ব্যবহার করছেন। এ অভিযোগের প্রমাণও মিলেছে। ব্লক দিয়ে ডকইয়ার্ডের মধ্যে একাধিক দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে।

পূর্ব রূপাতলী এলাকার প্রবীণদের মতে, রাইভিউল কবির স্বপন নানা কৌশলে কাগজপত্র তৈরি করে কীর্তনখোলা তীরের বিশাল অংশের মালিক হয়েছেন। এখন নদীর অংশ দখল করে সেই জমির প্রশস্ততা বাড়াচ্ছেন।

কীর্তনখোলার তীর ভরাট প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাইভিউল কবির স্বপন বলেন, খলিফাবাড়ি থেকে কাটাদিয়া খাল পর্যন্ত কীর্তনখোলা তীরে তার ১৭ একর রেকর্ডীয় জমি আছে। যেখানে পাইলিং দেওয়া হচ্ছে সেখানের একটি দাগে ৫৯ শতাংশ জমি ছিল। এখন আছে ২৫ শতাংশ। বাকিটা নদীতে ভেঙে গেছে। ভাঙন ঠেকাতেই পাইলিং দিয়ে মাটি ফেলা হচ্ছে। এ জন্য জেলা প্রশাসনের অনুমতি নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে স্বপন বলেন, 'আমার সম্পত্তি রক্ষার জন্য প্রোটেকশন দিচ্ছি, কারও অনুমতি নিইনি। কারণ, জমি আমার।' গাইড ওয়াল নির্মাণে এবং ডকইয়ার্ডের কাজে কংক্রিটের ব্লক ব্যবহারের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

বরিশাল বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বরিশাল নৌবন্দরের উত্তরে আমানতগঞ্জ খাল থেকে দক্ষিণের রূপাতলী সিএসডি গোডাউনের খালের দক্ষিণ পাশ পর্যন্ত ৩ দশমিক ৫৭০ কিলোমিটার কীর্তনখোলার তীর বিআইডব্লিউটিএর। বাকি অংশ জেলা প্রশাসনের। তবে বন্দর-সংলগ্ন নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীরে উচ্চ জলরেখা থেকে তীরের দিকে ৫০ গজ পর্যন্ত উভয় তীরে ৩৬ দশমিক ৩০ কিলোমিটার ফোরশোর রয়েছে, যার অর্ধেকই বেদখলে চলে গেছে।

বরিশাল নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, কীর্তনখোলা নদীর প্রশস্ততা ছিল এক কিলোমিটার। দখলে তা সংকুচিত হয়েছে। কীর্তনখোলা দখল প্রতিরোধ করা না হলে নগরী বিপন্ন হবে। নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ জীবন্ত সত্তা রক্ষায় প্রশাসনিক উদ্যোগ প্রয়োজন। আমরা কীর্তনখোলার সব দখলদারের উচ্ছেদ চাই। এর জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা আমরা করব।

জানতে চাইলে বরিশালের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. শহিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিআইডব্লিউটিএকে সঙ্গে নিয়ে দখলদারদের হালনাগাদ তালিকা করা হচ্ছে। ওই তালিকা চূড়ান্ত হলেই উচ্ছেদ কার্যক্রম শুরু করা হবে। তবে উচ্ছেদের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট এখনও পাওয়া যায়নি। পূর্ব রূপাতলী পয়েন্টে কীর্তনখোলা দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নদী দখল করা বেআইনি। ওই দখলদারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×