ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতাল

গরিবের হাসপাতালে চিকিৎসা দেবে কে

গরিবের হাসপাতালে চিকিৎসা দেবে কে
×

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:২০ | আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:৪৬

চট্টগ্রামের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র সরকারি জেনারেল হাসপাতাল। নগরের আন্দরকিল্লায় অবস্থিত হাসপাতালটি এই অঞ্চলের কয়েক লাখ গরিব ও অসহায় মানুষের কাছে ভরসার হাসপাতাল হিসেবে পরিচিত। নিম্ন ও মধ্যবিত্তরাই কম টাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার আশায় এই হাসপাতালে ছুটে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক সংকটে একেবারে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে ১১৯ বছরের পুরোনো এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম। এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ চক্ষু এবং চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগ। চরম চিকিৎসক সংকট আছে হাসপাতালের শিশু, গাইনি, মেডিসিনসহ আরও কয়েকটি বিভাগে। চিকিৎসক না থাকায় প্রতিদিন এক থেকে দেড় হাজার রোগীকে চিকিৎসা না নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।

২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে শুধু বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে তেরোশ'-চৌদ্দশ' রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কেবল চিকিৎসক সংকট নয়, গরিবের এই হাসপাতালে আছে কর্মচারী সংকটও। সমস্যার কথা জানিয়ে একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হলেও মিলছে না কোনো প্রতিকার। ফলে হতাশ হয়ে পড়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষও। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ৩ ডিসেম্বর একসঙ্গে হাসপাতালের ১১ জন সিনিয়র কনসালট্যান্ট সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে চলে যান অন্যত্র। এর পর থেকে চিকিৎসক সংকটে ভেঙে পড়ে পুরো হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম। বর্তমানে চিকিৎসকের ৯টি পদ শূন্য আছে। হাসপাতালের গাইনি বিভাগে কনসালট্যান্ট ছিলেন চারজন। পদোন্নতি পেয়ে দু'জন চলে গেছেন নতুন কর্মস্থলে। শিশু বিভাগে চারজন চিকিৎসক কর্মরত থাকলেও একসঙ্গে তিনজন পদোন্নতি পেয়ে চলে গেছেন অন্য হাসপাতালে। চক্ষু বিভাগে চিকিৎসক ছিলেন একজন। পদোন্নতি পেয়ে তিনিও ছাড়েন জেনারেল হাসপাতাল। সবচেয়ে নাজেহাল অবস্থা চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগে। প্রায় ছয় মাস ধরে এ বিভাগটিতে কোনো চিকিৎসক নেই। তাই বন্ধ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগটিও। বিভাগটিতে কর্মরত থাকা একমাত্র চিকিৎসক গত বছরের ১০ জুলাই পিআরএলএ চলে যান। এর পর থেকে চিকিৎসকশূন্য হয়ে যায় বিভাগটি। পরবর্তী সময়ে চিকিৎসক চেয়ে  পরিচালক (স্বাস্থ্য) বরাবর গত বছর কয়েক দফায় চিঠি দেওয়া হয়; কিন্তু পাওয়া যায়নি কোনো আশার আলো। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহেও কয়েকবার চিঠি পাঠানো হয়। সমস্যার সমাধানে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর মেলেনি। হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগটিও ধুঁকছে চিকিৎসক সংকটে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই বিভাগে দু'জন চিকিৎসক থাকলেও একজন অন্যত্র বদলি হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে আছেন মাত্র একজন। প্রতিদিন গড়ে বহির্বিভাগে আসা কয়েকশ' রোগীকে এই একজন চিকিৎসককেই দেখতে হয়। একসঙ্গে এত রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা।

বৃদ্ধ মাকে চিকিৎসা করাতে আসা রিকশাচালক মো. ইদ্রিস সমকালকে বলেন, রিকশা চালিয়ে প্রতিদিনের সামান্য টাকা দিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। কম টাকায় চিকিৎসা করাতে আমরা এই হাসপাতালে আসি। দুই সপ্তাহ ধরে মায়ের চোখ দেখাতে হাসপাতালে এলেও চিকিৎসক না থাকায় দেখাতে পারিনি। এখন এই গরিবের মায়ের চিকিৎসা করাবে কে?

মেয়ের চর্ম রোগের চিকিৎসা করাতে আসা গার্মেন্টকর্মী রোকসানা বলেন, বেশ কিছুদিন ধরে মেয়ের পুরো শরীরে ছোট ছোট লালচে চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এখানে চিকিৎসা করাতে এসে দেখি চিকিৎসকই নেই; বন্ধ পুরো বিভাগ। প্রাইভেট হাসপাতাল বা চেম্বারে নিয়ে মেয়েকে যে চিকিৎসক দেখাব, সেই টাকা পাব কই।

এই দু'জনের মতো অনেকেরই অভিযোগ, চিকিৎসক না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগীরা সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথ সমকালকে বলেন, অতীতের চেয়ে জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। হাসপাতালটি গরিব ও অসহায় রোগীদের কাছে আস্থার জায়গা; কিন্তু যারা চিকিৎসা দেবেন, সেই চিকিৎসকই নেই হাসপাতালে। জোড়াতালি দিয়ে কি আর চিকিৎসা দেওয়া যায়?

তিনি বলেন, চিকিৎসক সংকটের কথা জানিয়ে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষকে একের পর এক চিঠি দিচ্ছি। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না। চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনরা নানা ভোগান্তি এবং কষ্টের কথা আমাদের জানাচ্ছেন। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈঠকেও সংকটের বিষয়গুলো অবহিত করে তথ্য-উপাত্তসহ জানানো হয়েছে। তবে এখনও কোনো আশার বার্তা পাইনি।

১৯০১ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালটি শুরুতে ৫০ শয্যার ছিল। পরে ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। চিকিৎসাসেবা নিতে আসা এই অঞ্চলের গরিব ও অসহায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ২০১২ সালে এটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে বাড়ানো হয়নি হাসপাতালের জনবল। হাসপাতালে ৪০ শয্যার মেডিসিন ওয়ার্ড, ১০ শয্যার কার্ডিওলজি, ৫০ শয্যার সার্জারি, ১২ শয্যার অর্থোপেডিক, ৫০ শয্যার শিশু, ২৪ শয্যার নাক-কান-গলা, দুই শয্যার চক্ষু, ১০ শয্যার কেবিন এবং ১৫ শয্যার পেয়িং বেড আছে। চিকিৎসা দেওয়ার মতো সব সুবিধাই আছে, শুধু নেই চিকিৎসক।

আরও পড়ুন

×