সাইপ্রাসে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীকে হত্যা, লাশ লুকিয়ে চাওয়া হয় মুক্তিপণ
নিহত শাহরিয়ার আহমেদ ইমন
নরসিংদী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬ | ১৫:৪২
সাইপ্রাসে এক বাংলাদেশি যুবককে অপহরণের পর হত্যা করে তার লাশ জঙ্গলে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহত শাহরিয়ার আহমেদ ইমন (২২) নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার উত্তর বাখরনগর ইউনিয়নের লোচনপুর গ্রামের গ্রিসপ্রবাসী নাসির মিয়ার ছেলে।
হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে সাইপ্রাস পুলিশ গত রোববার শাহীন বাবু (২২) নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় একটি জঙ্গল থেকে ইমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের বরাতে জানা গেছে, প্রায় তিন মাস আগে স্টুডেন্ট ভিসায় সাইপ্রাসে যান ইমন। বিদেশে যাওয়ার আগেই তিনি সেখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইনে ভর্তি হন। সাইপ্রাসের লারনাকার ওরোক্লিনি এলাকায় বসবাস করতেন তিনি। তার পরিবারের সদস্যরা মাসিক খরচ বাবদ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা পাঠাতেন। পরিবারের ওপর চাপ কমাতে তিনি কাজের সন্ধান করছিলেন এবং এক পর্যায়ে একটি কাজও পান।
গত ১১ জুন বিকেলে মায়ের সঙ্গে ইমনের সর্বশেষ কথা হয়। তিনি মাকে জানান, কাজের ব্যবস্থা হয়েছে এবং সেদিন রাত থেকেই ডিউটি শুরু করবেন। বিষয়টি তিনি তার প্রবাসী বাবা ও রুমমেট রায়হান মিয়াকেও জানান। রায়হান তাকে কাজের স্থানে পৌঁছে লোকেশন পাঠাতে বলেছিলেন, যাতে প্রয়োজনে সহজে যোগাযোগ করা যায়। স্থানীয় সময় রাত ৯টার দিকে কাজের স্থানে পৌঁছে হোয়াটসঅ্যাপে রায়হানের কাছে নিজের অবস্থানের লোকেশন পাঠান ইমন। কিছুক্ষণ পর রায়হান ‘ওকে’ লিখে জবাব দিলেও সেই বার্তাটি আর দেখেননি ইমন।
এর কিছুক্ষণ পর রাত ১০টার দিকে ইমনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকেই তার বাবা নাসির মিয়ার কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘আপনার ছেলেকে কিডন্যাপ করেছি। ছেলেকে ফিরে পেতে চাইলে ৩৫ হাজার ইউরো দিতে হবে। যদি দেন ছেলেকে ফিরে পাবেন, না দিলে তার চোখ ও কিডনি খুলে বিক্রি করে দেব।’ বার্তাটি পেয়ে নাসির মিয়া পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানান। তবে প্রথমে তারা ধারণা করেছিলেন, ইমনের হোয়াটসঅ্যাপ আইডি হয়তো হ্যাকড হয়েছে।
পরদিন ১২ জুন সকালে কাজ শেষে আর বাসায় ফেরেননি ইমন। এরপর রুমমেট রায়হান স্থানীয় থানায় গিয়ে নিখোঁজের অভিযোগ করেন। পরে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ইমনের পাঠানো লোকেশনেও খোঁজ করা হয়, কিন্তু তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে ইমনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ২৪ ঘণ্টাই সচল ছিল এবং প্রতিদিনই পরিবারের কাছে মুক্তিপণের টাকা দাবি করছিল অপহরণকারীরা।
নিহতের ভাই নয়ন আহমেদ জানান, ইমনের কোনো খোঁজ না পেয়ে এক পর্যায়ে পরিবার মুক্তিপণের টাকা দিতে রাজি হয়। দর-কষাকষির মাধ্যমে বাংলাদেশি টাকায় পাঁচ লাখ টাকায় সমঝোতা হয় অপহরণকারীদের সঙ্গে।
তিনি বলেন, রোববার দুপুরে চুক্তি অনুযায়ী টাকা পাঠাতে ব্যাংকে যাই। সেখানে গিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়ার পর টাকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিই। এজন্য অপহরণকারীদের কাছে থাকা ভাইয়ের মোবাইল ফোন দিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে চাই। কিন্তু অপহরণকারীদের কথাবার্তা ও আচরণে সন্দেহ হলে টাকা না দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি।
নয়ন আরও জানান, একপর্যায়ে ইমনের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর অফলাইনে চলে যায়। পরে ওই রাতেই তারা জানতে পারেন, সাইপ্রাস পুলিশ শাহীন বাবু নামে এক বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করেছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি জঙ্গল থেকে পাতা দিয়ে ঢেকে রাখা অবস্থায় ইমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে গ্রেপ্তার হওয়া শাহীন বাবুর বাড়ি বাংলাদেশের কোন এলাকায়, সে বিষয়ে সাইপ্রাস পুলিশ এখনো কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, সাইপ্রাসে এক শিক্ষার্থী অপহরণের পর হত্যার শিকার হয়েছেন। এ ঘটনায় এক বাংলাদেশিকে সেখানকার পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে শুনেছি। তবে বিষয়টি সাইপ্রাসের দূতাবাস থেকে এখন পর্যন্ত আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
তিনি বলেন, নিহত তরুণের পরিবারের পক্ষ থেকেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। তারা সহযোগিতা চাইলে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
