ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

রাবি অধ্যাপক তাহের হত্যা: মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদণ্ড বহাল

রাবি অধ্যাপক তাহের হত্যা: মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদণ্ড বহাল
×

রাবি অধ্যাপক ড. এস তাহের

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২২ | ২১:৩৩ | আপডেট: ০৫ এপ্রিল ২০২২ | ০৫:৫১

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অধ্যাপক ড. এস তাহের হত্যা মামলায় তার সহকর্মী মিয়া মো. মহিউদ্দিন ও বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। 

পাশাপাশি জাহাঙ্গীরের ভাই শিবিরকর্মী আবদুস সালাম এবং জাহাঙ্গীরের স্ত্রীর ভাই নাজমুল আলমের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশও বহাল রাখা হয়েছে।

প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ছয় বিচারপতির বেঞ্চ আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার এই রায় দেন। পদোন্নতির ক্ষেত্রে আপত্তি করায় রাবি শিক্ষক মো. মহিউদ্দিন সুপরিকল্পিতভাবে সহযোগিদের নিয়ে ১৬ বছর আগে অধ্যাপক তাহেরকে হত্যা করেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিশ্বজিৎ দেবনাথ, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অবন্তি নুরুল ও মোহাম্মদ সাইফুল আলম। 

অন্যদিকে আসামি পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এসএম শাহজাহান, ইমরান এ সিদ্দিকী ও শামছুর রহমান। রায় ঘোষণার সময় অধ্যাপক তাহেরের স্ত্রী সুলতানা আহমেদ, ছেলে সানজিদ আলভী (মামলার বাদি) ও মেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেগুফতা তাবাসসুম উপস্থিত ছিলেন। 

আইন অনুযায়ী এই হত্যা মামলার দণ্ডিত আসামিরা আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায় প্রকাশের পর ৩০ দিনের মধ্যে ওই রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করতে পারবেন। আপিল বিভাগ আবেদনটি খারিজ করলে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রানভিক্ষা চেয়ে আবেদনের সুযোগ পাবেন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি। রাষ্ট্রপতি আবেদনটি নাকচ করলে মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করবে কারা কর্তৃপক্ষ।

রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় অধ্যাপক তাহেরের স্ত্রী সুলতানা আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, '১৬ বছর এই রায়ের জন্য অনেক সংগ্রাম করেছি। অনেক দুঃখ-কষ্ট ভোগ করেছি। রায়ে আমরা সন্তষ্ট। আশা করছি এই রায় কার্যকর হবে। এই রায় কার্যকর হলেই আমরা পরিপুর্ণভাবে সন্তুষ্ট হবো।' 

সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন অধ্যাপক তাহেরের ছেলে সানজিদ আলভী ও মেয়ে শেগুফতা তাবাসসুমও। বাবার হত্যাকারীদের চূড়ান্ত বিচারের লক্ষ্যে আইন পেশা বেছে নিয়েছিলেন এই শেগুফতা তাবাসসুম।

অ্যাটর্নি জেনারেলে এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, 'সহকর্মী মিয়া মো. মহিউদ্দিনের পদোন্নতির ক্ষেত্রে আপত্তি করার কারণে জন্য একজন মানুষকে এভাবে হত্যা করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না, খুবই ঘৃণ্য কাজ। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার শেষ হওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদের কাছে বার্তা যাবে এই ধরনের কাজ করলে আদালতে সর্বোচ্চ শাস্তি পেতে হবে।' 

আসামি পক্ষের আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিকী বলেন, 'আসামিরা চাইলে এ রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ (পুনর্বিবেচনার আবেদন) করা হবে।'

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক তাহের ২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন। তার ছেলেমেয়েরা তখন ঢাকার উত্তরায় একটি বাসায় থেকে লেখাপড়া করছিলেন। তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ছিলেন। ৩ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসার বাইরে ম্যানহোলে তাহেরের মরদেহ পাওয়া যায়। 

পরদিন ড. তাহেরের ছেলে সানজিদ আলভী মতিহার থানায় মামলা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের তৎকালীন উপপরিদর্শক আহসানুল কবির ২০০৭ সালের ১৮ মার্চ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। 

এতে তাহেরের বিভাগীয় সহকর্মী মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, রাবি শাখা ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, তাহেরের বাসভবনের তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর, জাহাঙ্গীরের ভাই ও ছাত্রশিবিরের কর্মী আবদুস সালাম, তাদের (জাহাঙ্গীর ও আবদুস সালাম) বাবা আজিমুদ্দীন ও সালামের আত্মীয় নাজমুলকে অভিযুক্ত করা হয়।

সাক্ষ্যপ্রমাণ ও বিচারের বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে আসে বিভাগে পদোন্নতি নিয়ে অসন্তোষ থেকে মিয়া মহিউদ্দিন এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন।খুনিরা ড. তাহেরকে বাসায় হত্যা করে নর্দমায় মরদেহ ঢুকিয়ে রাখেন। 

গ্রেপ্তার হওয়ার পর জাহাঙ্গীর, নাজমুল ও সালাম আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছিলেন, মহিউদ্দিন ও সালেহী তাদের কম্পিউটার, টাকা-পয়সা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে তাহেরকে হত্যা করার কাজে লাগান। তবে মিয়া মহিউদ্দিন আদালতে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন। 

কিন্তু পরে পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, তখনকার সহযোগী অধ্যাপক মিয়া মহিউদ্দিন পদোন্নতি পেতে বিভাগে আবেদন করেছিলেন। পদোন্নতির ওই কমিটিতে ড. তাহেরও ছিলেন। 

তিনি মহিউদ্দিনের কয়েকটি প্রতারণা প্রাথমিকভাবে ধরে ফেলেন। তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পরে এই সব প্রতারণা প্রমাণিত হয়। আর এসব ক্ষোভ থেকেই মহিউদ্দিন হত্যকাণ্ড ঘটান।

নৃশংস এই হত্যা মামলায় ৩৯ জনের সাক্ষ্য জেরা নিয়ে ২০০৮ সালের ২২ মে রায় দেন রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। রায়ে মিয়া মহিউদ্দিন, জাহাঙ্গীর, সালাম ও নাজমুলকে মৃত্যুদণ্ড এবং সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সীকে খালাস দেওয়া হয়। এরপর দণ্ডিতদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য রায়সহ মামলার যাবতীয় নথি পাঠানো হয় হাইকোর্টে, যা ডেথ রেফারেন্স নামে পরিচিত। 

অন্যদিকে খালাস চেয়ে রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন আসামিরা। পরে ২০১৩ সালের ২১ এপ্রিল মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের আপিলের শুনানি নিয়ে রায় দেন হাইকোর্ট। 

রায়ে ড. তাহেরের সহকর্মী ড. মিয়া মো. মহিউদ্দিন এবং ড. তাহেরের বাসার তত্ত্বাবধায়ক মো. জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং আব্দুস সালাম ও নাজমুলের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেওয়া হয়। 

পরে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল ও জেল আপিল করেন আসামিরা। অন্যদিকে হাইকোর্টের রায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের সাজা বাড়াতে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। 

এরই ধারাবাহিকতায় উভয়পক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার রায় দেন আপিল বিভাগ।


আরও পড়ুন

×