চাপাচাপি করে মালটানা ট্রলিতেও ঢাকা অভিমুখে ছুটছে মানুষ!
মালটানা ট্রলিতে করে এভাবে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয় মানুষ- সমকাল
আরিফ আহমেদ মুন্না, বাবুগঞ্জ (বরিশাল)
প্রকাশ: ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ০৭:২২ | আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২০ | ০৭:২৮
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের রহমতপুর ব্রিজ থেকে রাজধানী ঢাকা অভিমুখে ছুটছেন হাজার হাজার মানুষ। কেউ ট্রাকে, কেউ পিকআপে, এমনকি শ্যালো ইঞ্জিনচালিত মালটানা ট্রলিতেই উঠে বসেন সবাই। তাদের সবারই গন্তব্য ঢাকার উদ্দেশে। দুর্ঘটনার আশঙ্কা কিংবা করোনাভীতি উপেক্ষা করেই শনিবার তারা একজনের গায়ের সঙ্গে আরেকজন চাপাচাপি-গাদাগাদি করে রওনা হন নিজ গন্তব্যে। তারা মানছেন না কোনো নিয়মনীতি। করোনার মৃত্যুভীতির চেয়েও তাদের চোখেমুখে বেশি আতঙ্ক কর্মস্থলে ফেরার।
কথা বলে জানা গেছে, তাদের অধিকাংশই গার্মেন্টস কর্মী। রোববার থেকে তাদের পোশাক কারখানা চালু হচ্ছে। তাই যেতে না পারলে চাকরি থাকবে না, এমন শঙ্কায় উন্মাদের মতো ছুটছেন তারা।
বাবুগঞ্জের রহমতপুর ব্রিজে প্রায় শতাধিক পুরুষের সঙ্গে গাদাগাদি করে পিকআপে ওঠা পোশাক শিল্পের কর্মী রহিমা খাতুন জানান, ‘রোববার সকাল ৮টার মধ্যে কারখানায় উপস্থিত হতে না পারলে চাকরি থাকবে না বলে ফোনে জানিয়েছেন তার গার্মেন্টেসের সুপারভাইজার। লঞ্চ-বাস বন্ধ থাকায় তাই নিরুপায় হয়ে শনিবার পিকআপে রওনা হয়েছেন তিনি।’
প্রতিটি ৫ টনের ট্রাকে ২০০ থেকে ৩০০ লোক দাঁড়িয়ে এবং দেড় টনের পিকআপেও শতাধিক মানুষ দাঁড়িয়ে চাপাচাপি করে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রহমতপুর ব্রিজ থেকে শনিবার সকালে রাজধানী ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন। এমনকি শ্যালো ইঞ্জিনচালিত মালটানা ট্রলিতেও অর্ধশতাধিক মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে ভয়াবহ ঝুঁকি নিয়ে যাত্রা করেন গন্তব্যের উদ্দেশে।

ঝুঁকি প্রসঙ্গে ট্রলিতে ওঠা যাত্রী উপজেলার ভূতেরদিয়া গ্রামের গার্মেন্টসকর্মী মনির হোসেন বলেন, ‘কী করবো ভাই, চাকরি বাঁচাতে হলে প্রয়োজনে হেঁটে গেলেও ঢাকা যেতে হবে। কিছু চলছে না রাস্তায়। তাই যা পেয়েছি তাতেই চড়েছি।’
শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলি কীভাবে ঢাকা যাবে- চালককে এমন প্রশ্ন করতে ট্রলিচালক হানিফ সরদার বলেন, ‘যদি ঢাকা পর্যন্ত যেতে নাও পারি তবে মাওয়া পর্যন্ত যাওয়ার টার্গেট। মাওয়াঘাটে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে পারলে তারা নদী পার হয়ে সহজেই ঢাকা পৌঁছাতে পারবে।’
কিন্তু মাওয়াঘাট পর্যন্তই প্রায় দেড়শ' কিলোমিটার দীর্ঘ মহাসড়ক এই অবৈধ শ্যালো ইঞ্জিনযুক্ত মালটানা গাড়ি চালিয়ে এতগুলো মানুষ নিয়ে কীভাবে যাবেন? পুলিশ ধরবে না?- এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রলিচালক হানিফ সিকদার আবার হেসে বলেন, ‘পুলিশ ধরলে সাথে সাথে তাদের দু’চারশো টাকা ধরিয়ে দিলেই ছেড়ে দেবে। সমস্যা নাই ভাই। দেখা যাক, কতদূর যাওয়া যায়।’
একাধিক যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এভাবে দাঁড়িয়ে চাপাচাপি করে দুর্ঘটনার আশঙ্কা এবং করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বরিশাল থেকে মাওয়াঘাট পর্যন্ত যেতেই তাদের গুনতে হচ্ছে গড়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। এছাড়াও ট্রাক বা পিকআপে আদায় করা হচ্ছে এক থেকে দেড় হাজার টাকা। এই টাকার ভাগ স্থানীয় পরিবহন শ্রমিক নেতা এবং পুলিশের পকেটে যাচ্চে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ প্রসঙ্গে এয়ারপোর্ট থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এস.এম জাহিদ বিন আলম বলেন, ‘জাতির এই সংকটকালীন সময়ে কারা কমিশনবাণিজ্য করছে জানি না, তবে আমরা খবর পেলেই সঙ্গে সঙ্গে সেখানে অ্যাকশানে যাচ্ছি। সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো- আমরা তাড়িয়ে দিয়ে আসার পরপরই তারা আবার তা শুরু করে। সব জায়গায় সবসময় দাঁড়িয়ে থাকার মতো জনবল পুলিশের নেই। এটাই বাস্তবতা। রহমতপুর ব্রিজ থেকে এভাবে অবৈধভাবে যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যাওয়া গাড়িগুলো আটকের জন্য গৌরনদী হাইওয়ে পুলিশকে বলা হয়েছে।’
এদিকে রাস্তার এমন পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বাবুগঞ্জের সন্তান জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম-মহাসচিব ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, ‘করোনা সংক্রমণের সবচেয়ে বিপদজনক এই সময়টাতে পোশাক শিল্প কারখানা খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত মালিক এবং সরকারের জন্য চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়েছে। সরকারি ছুটি বহাল রেখে গার্মেন্টস খুলে দেওয়ার এই ভুল সিদ্ধান্তের মাশুল আওয়ামী লীগ সরকার এবং দেশের জনগণকে চরমভাবে দিতে হতে পারে।’
