আলুর দাম বাড়ায় খালি হচ্ছে উত্তরের হিমাগার
দাম বেড়ে যাওয়ায় আলু উত্তোলন বেড়েছে রংপুরের হিমাগারগুলোয়। মঙ্গলবার জেলার অপু মুনশি হিমাগার থেকে তোলা - সমকাল
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ২২:৩৮ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ২২:৩৮
বাজারে আলুর দাম ঊর্ধ্বমুখী। তাই এবার বেশি দাম পাওয়ায় বীজ আলু সংরক্ষণ না করে বিক্রি করে দিচ্ছেন অধিকাংশ চাষি। অক্টোবর থেকে রোপণ করার কথা আলুর বীজ। অথচ এর আগেই বীজ আলুর দাম ৪০ শতাংশ বেড়েছে। চাষিরা দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত বীজ পাচ্ছেন না। সরকারের বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনও (বিএডিসি) চাহিদা অনুযায়ী বীজ পাওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছে।
চাহিদার কয়েক গুণ আলু উৎপাদিত হয় উত্তরাঞ্চলে। খাবারের চাহিদা ও ক্ষেত থেকে বিক্রি শেষে উদ্বৃত্ত থাকে অনেক আলু। তবে তা সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমের শুরুতে বিক্রি করতে বাধ্য হন কৃষক। যারা সংরক্ষণ করেন, তাদের খরচ অনেক বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে আলুর দামে। মৌসুমের শুরুতে যে আলু ১০ টাকা, বছরের শেষ দিকে তা বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকা কেজি দরে। খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, একশ্রেণির ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। আর ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকদের দাবি, সংরক্ষণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় দামের ওপর প্রভাব পড়ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আলুর আবাদ হয়েছে ৯ লাখ ৭৩ হাজার ২৭ হেক্টর জমিতে। আলু উৎপাদিত হয়েছে ২৬ লাখ ৮৪ হাজার টন। হেক্টরে গড় উৎপাদন ২৭ টনের বেশি। তাতে সারা বছরের খাবারের চাহিদা, বীজ আর বিক্রি করা আলু বাদ দিয়ে ১৬ লাখ ১২ হাজার টন আলু উদ্বৃত্ত থাকার কথা। তবে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লালমনিরহাটে এসব আলু সংরক্ষণের জন্য হিমাগার আছে ৭০টি। যেখানে আলু সংরক্ষণ করা যায় মাত্র ৬ লাখ ৬০ হাজার টন।
এর মধ্যে রংপুরের ৩৯টি হিমাগারে আলুর ধারণক্ষমতা ৩ লাখ ৬১ হাজার ৪৩৮ টন। অন্য বছর মধ্য ডিসেম্বর পর্যন্ত হিমাগারে আলু দেখা যায়। এ বছর সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকেই হিমাগারের মজুত প্রায় শেষের দিকে।
রংপুরের কিষাণ হিমাগার, আরমান কোল্ডস্টোরেজসহ কয়েকটি হিমাগার ঘুরে দেখা যায়, প্রতিদিনই লোকজন বাইসাইকেল, রিকশা-ভ্যানসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের সংরক্ষণ করা আলু তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। নগরীর উত্তম এলাকার আলু ব্যবসায়ী আবু নাসের বলেন, ‘গত বছর হিমাগারে আলু রেখে লোকসান গুনতে হয়েছে। এ বছরও সেই শঙ্কায় আছি। এখন আলুর বাজার ভালো, তাই বিক্রি করে দিচ্ছি।’
প্রতিবছর মাঠ পর্যায়ে আলু কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করেন তারাগঞ্জের মিলন মিয়া। তিনি বলেন, ‘মূলত সংরক্ষণ খরচ বাড়ায় এবার আলুর দাম বেড়েছে। তাছাড়া উৎপাদন খরচ বাড়ায় এবার মাঠেও চাষিদের কাছ থেকে আলু বেশি দামে কিনতে হয়েছে। তবে হিমাগারে জায়গা না থাকায় বেশি আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি।’
গঙ্গাচড়ার নবনীদাস গ্রামের চাষি আহাম্মদ আলী বলেন, ‘আগে ৯০ কেজির বস্তা হিমাগারে রাখতে খরচ পড়ত ২৫০ টাকা। এখন ৫০ কেজির আলুর বস্তা হিমাগারে রাখতে ৩৫০ টাকা লাগে। ৫০ টাকার খালি বস্তা এখন ৮০ টাকাসহ পরিবহন খরচ ও লেবার খরচও দ্বিগুণ। এজন্য জমিতেই আলু বিক্রি করি। এবারে ১০ টাকায় যে আলু ক্ষেত থেকে তুলে বিক্রি করেছি, সেই আলু ৫০ টাকায় কিনে খাচ্ছি।’
রংপুর হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি মোছাদ্দেক হোসেন বাবলু বলেন, অন্য বছরগুলোতে এ সময়ে হিমাগারে সংরক্ষিত ২০ থেকে ২৫ হাজার বস্তা আলু বের হতো। এবার অন্তত ১০০ হাজার বস্তা আলু বের হয়ে গেছে। যে হারে আলুর চাহিদা দেখা যাচ্ছে, তাতে অক্টোবরের পর আলুর আরও সংকট দেখা দিতে পারে।
এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অক্টোবর থেকে শুরু হবে আগাম আলু রোপণ। তবে বীজ সংকট দেখা দিচ্ছে এখনই। গত বছর যে সাদা আলু (গ্র্যানুলা) ও লাল (কার্ডিনাল) আলু বীজ ৪৮ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, এ বছর কিনতে হচ্ছে ৭০ টাকার ওপরে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চলে আগাম চাষ হওয়া দেশি ছোট গোল আলু (পাকড়ি) বীজের দাম উঠেছে ৮০ টাকায়। তবু চাহিদা অনুযায়ী ভালো মানের বীজ পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা। বিএডিসির অনুমোদিত ডিলারের কাছে ধরনা দিচ্ছেন অধিকাংশ চাষি। ঘুরছেন বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির ডিলারদের কাছেও। বীজ সংকটে এবার আলু চাষ ব্যাহত হওয়ার শঙ্কাও করছেন তারা।
রংপুরের পীরগাছার তালুক উপাসু গ্রামের কৃষক হোসেন আলী বলেন, ‘অন্য বছর নিজেরাই হিমাগারে বীজ সংরক্ষণ করতাম। এবার টাকার প্রয়োজনসহ বাজারে ভালো দাম থাকায় আলু রাখা সম্ভব হয়নি। এখন ছোটাছুটি করেও বীজ মিলছে না। ডিলারের কাছেও বীজের কোনো খোঁজ নেই। বেসরকারি কোম্পানির আলুর বীজের চড়া দাম। তবু ডিলাররা বলছেন, দাম আরও বাড়বে। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।’
আরমান কোল্ডস্টোরেজে বীজের খোঁজ করতে এসেছিলেন সিও বাজার এলাকার আলু চাষি নমির উদ্দিন। তিনি জানান, মানসম্পন্ন বীজ কোথাও মিলছে না। হিমাগারের বীজের দামও এক লাফে অনেক বেড়েছে। এতে বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ বাড়লে লোকসানের শঙ্কাও বাড়বে।
বিএডিসি রংপুরের উপপরিচালক (বীজ বিপণন) মাসুদ সুলতান বলেন, এবার বীজের সংকট রয়েছে। বাজারে দাম ভালো থাকায় আলু বিক্রি করে দিয়েছেন অধিকাংশ চাষি। এখন বীজের জন্য বিএডিসি বা বেসরকারি কোম্পানির আশায় রয়েছেন তারা। সারাদেশে বিএডিসি ৩৬ হাজার টন আলু বীজ সরবরাহ করবে, যা চাহিদার ৫ থেকে ৭ শতাংশ। সে ক্ষেত্রে রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টন আলু বীজ সরবরাহ করা হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, রংপুরে আলু উৎপাদনের চেয়ে হিমাগার অপ্রতুল। হিমাগারের সংখ্যা যত বেশি বাড়ানো যাবে, আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ তত বাড়বে। পর্যাপ্ত সংরক্ষণাগারের অভাবে আলুর একটি বড় অংশ নষ্ট হয়। এ কারণে বছর শেষে আলুর দাম বেড়ে যায়।
