ঢাকা রোববার, ০৫ জুলাই ২০২৬

মাদকের পার্টনার বন্ধুকে গুলি করে হত্যা

মাদকের পার্টনার বন্ধুকে গুলি করে হত্যা
×

ইজাজ আহ্‌মেদ মিলন, গাজীপুর ও এম তুষারী, কালিয়াকৈর

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৩:৪৪ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ১৪:১৩

এলাকায় এসে বেপরোয়াভাবে চলতেন পুলিশের এএসআই কিশোর কুমার সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর গানম্যান হওয়ার পর থেকে তিনি তদবির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। শুধু তাই নয়, পুরো এলাকায় মাদকের ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনি। শহীদুল ইসলাম নামে মাদক কারবারির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে তার। পরে কিশোরের সরাসরি সহযোগিতায় শহীদ তার মাদক ব্যবসা আরও প্রসারিত করে। মাদক বিক্রি টাকার একটি বড় অংশ চলে যেত কিশোরের কাছে। কিন্তু হঠাৎ করেই টাকার বাটোয়ারা নিয়ে শহীদের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এরই জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার কুতুবদিয়া গ্রামে বন্ধু শহীদকে গুলি করে হত্যা করেন কিশোর। এ সময় মহিম উদ্দিন নামে আরেক যুবককেও গুলি করেন তিনি। গুলিবিদ্ধ মহিমকে সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এদিকে গাজীপুর জেলা পুলিশ শুক্রবার দুপুরে আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকার এক বন্ধুর বাড়ি থেকে কিশোরকে গ্রেপ্তার করে।

এ ব্যাপারে গতকাল এক বিবৃতিতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, এ হত্যাকাণ্ড গানম্যান কিশোরের ব্যক্তিগত দায়। কিশোর গত তিন দিন ধরে ডিউটিতে ছিলেন না জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, সরকারি অস্ত্র জমা না দিয়ে অপরাধ করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কৃত অপরাধের শাস্তি তাকে অবশ্যই পেতে হবে। সে গ্রেপ্তার হওয়ায় পুলিশ ও স্থানীয়দের ধন্যবাদ জানান তিনি। এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে মন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানান। একই সঙ্গে নিহত শহীদের আত্মার শান্তি কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

জানা যায়, কুতুবদিয়া গ্রামের নারায়ণ চন্দ্র সরকারের ছেলে কিশোর দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের গানম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। স্থানীয়রা জানান, এলাকায় এলে তার চলাচল ও জীবনযাপন অনেকটা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পার্শ্ববর্তী মির্জাপুর উপজেলার আজগানা গ্রামের আবদুস সবুর মিয়ার ছেলে মাদক কারবারি শহীদুল ইসলামের সঙ্গে কিশোরের মাদক ব্যবসা ছিল। কয়েক মাস আগে শহীদের মাধ্যমে একই গ্রামের মালেক সরকারের ছেলে মহিম উদ্দিন একটি সিসা কারখানার লাইসেন্স করার জন্য তিন দফায় কয়েক লাখ টাকা দেন কিশোরকে। কিন্তু লাইসেন্স করে দিতে পারেননি তিনি। দীর্ঘদিন পর মহিম তার কাছে টাকা ফেরত চান। নানা টালবাহানা করতে থাকেন কিশোর। সম্প্রতি ছুটিতে বাড়ি আসেন কিশোর। বৃহস্পতিবার রাতে টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে শহীদের মাধ্যমে মহিমকে ডেকে নিয়ে আসেন কুতুবদিয়া গ্রামের নির্জন স্থানে।

রাত সাড়ে ৯টার দিকে শহীদ ও মহিম একসঙ্গে কুতুবদিয়া ত্রিমোড় নামক এলাকায় এসে কিশোরের সঙ্গে দেখা করে। কিশোর নেশা করার কথা বলে আজগানা গ্রামের দিকে যাওয়ার পথে একটি নির্জন খোলা জায়গায় ঘাসের ওপর বসে তিনজন মিলে ইয়াবা সেবন করেন। পরে মহিম তার পাওনা টাকা চাইলে কিশোর মাদক ব্যবসায়ী শহীদকে দিয়ে দেওয়ার জন্য বলেন। শহীদ দিতে অস্বীকৃতি জানালে কিশোর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। একপর্যায়ে কিশোরের সঙ্গে দু'জনের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে কিশোর উত্তেজিত হয়ে সঙ্গে থাকা সরকারি পিস্তল বের করে প্রথমে মহিমকে পেটে একটি গুলি করেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে মহিম উদ্দিন দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পেছন থেকে আরও একটি গুলি করেন। এ সময় বাধা দিলে শহীদের বুকের ডান পাশে গুলি করলে সে মাটিতে পড়ে যায়। রক্তাক্ত অবস্থায় মহিম মোবাইল ফোনে পরিবারের সদস্যদের ঘটনাটি জানায়। পরে আজগানা গ্রামবাসী দ্রুত তাকে প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে যায়। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে সাভার এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপতালে নিয়ে ভর্তি করে। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে শহীদের লাশ উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। এরই ফাঁকে কিশোর পালিয়ে আশুলিয়ার শিমুলিয়া এলাকায় এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেন।

গতকাল নিহত শহীদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শত শত মানুষের ভিড়। নিহতের বৃদ্ধ মা মাজেদা বেগম কান্নায় বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন। শহীদ তিন ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিল। তার বাবা একজন কৃষক। তবে শহীদ মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়ায় এলাকার লোকজন তাদের পরিবারের সঙ্গে তেমন মেলামেশা করতেন না। গুলিবিদ্ধ মহিমের বাবা আব্দুল মালেক সরকার জানান, পাওনা টাকা ফেরত আনার জন্য কিশোরের কাছে যায় মহিম। নিহতের স্ত্রী মনোয়ার আক্তার বলেন, আমার স্বামীকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার শামসুন্নাহার সমকালকে বলেন, ঘটনার পর থেকেই জেলা পুলিশের একাধিক টিম কিশোরকে গ্রেপ্তারে মাঠে নামে। গতকাল বন্ধুর বাড়ি থেকে সেই পিস্তল ও ছয় রাউন্ড গুলিসহ তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি বলেন, কিশোর মাদক সেবন করতেন সেটা প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া গেছে। মাদক সংক্রান্ত ঘটনায় শহীদকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে নাকি নারী সংক্রান্ত কোনো ঘটনা আছে, সেটি পুলিশ তদন্ত করছে। তিনি আরও বলেন, শহীদের সঙ্গে কিশোরের নারী সংক্রান্ত একটি বিষয় নিয়ে আক্রোশ ছিল বলেও প্রাথমিকভাবে জানা যায়।

সহকারী পুলিশ সুপার (শ্রীপুর-কালিয়াকৈর সার্কেল) আল মামুন জানান, এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রী মনোয়ারা আক্তার কিশোর কুমারের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। এ ছাড়া পুলিশ বাদী হয়ে অস্ত্র আইনে আরেকটি মামলা করেছে।

আরও পড়ুন

×