ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পোশাকের ভাঁজে অনাবিল সুখ

গ্রামের ঈদ প্রস্তুতি

পোশাকের ভাঁজে অনাবিল সুখ
×

ঈদে স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি। যশোরের মনিরামপুরের সরসকাটি গ্রামে সমকাল

 তৌহিদুর রহমান, যশোর

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:৩০ | আপডেট: ০৭ এপ্রিল ২০২৪ | ০০:৩০

সুবিশাল বাঁশবাগান। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে মেঠোপথ। পথের ধারে সদ্য নির্মিত পাকা বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন সাগের আলী। অন্য সময় ভরদুপুরে বাড়িতে সুনসান নীরবতা থাকলেও গতকাল শনিবার ছিল ব্যতিক্রম। বাড়ির শিশু থেকে নানা বয়সী নারী-পুরুষের চোখে-মুখে ঠিকরে ঝরছিল আনন্দ। কারণ, ঈদুল ফিতর উদযাপনে গতকাল বাড়ি এসেছেন বড় ছেলে আল আমিন হোসেন ও তাঁর স্ত্রী নুসরাত জাহান তন্বী। সবাই গোল হয়ে বসে খুলছেন নিজেদের জন্য আনা উপহারের প্যাকেট। সেগুলো হাতে নিয়ে মেতে উঠছেন অনাবিল আনন্দে। বিশেষ করে নতুন কাপড় পেয়ে আত্মহারা শিশুরা।

যশোর শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে মনিরামপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম সরসকাটি পূর্বপাড়ায় দেখা গেছে এমন দৃশ্য। পেশায় কৃষক সাগের আলীর দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে প্রকৌশলী আল আমিন ঢাকায় বেসরকারি একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। আর ছোট ছেলে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজে সহযোগিতা করেন।

গতকাল দুপুরে বাড়িতে দেখা যায়, বারান্দার পাকা মেঝেতে বসে আছেন গোটা দশেক মানুষ। পরিবারের সদস্য ছাড়াও ভিড় করেছেন কয়েকজন প্রতিবেশী। বোঝা গেল, আড্ডার মধ্যমণি সাগেরের পুত্রবধূ নুসরাত জাহান তন্বী। তাঁকে একনজর দেখার পাশাপাশি ঢাকা থেকে আনা ঈদ উপহার ঘিরেও আগ্রহ সবার। নুসরাত ব্যাগ থেকে বের করে বাড়ির সবচেয়ে প্রবীণ দাদি শাশুড়ির হাতে তুলে দিলেন শাড়ি। হাতে নিয়ে একগাল হেসে দিলেন তিনি। এর পর একে একে বাড়ির সবার হাতে ঈদ উপহার তুলে দিলেন আল আমিন ও নুসরাত। উপহার পেয়ে নুসরাতের শাশুড়ি আয়েশা বেগম লাজুক স্বরে বললেন, ‘এসবের কী দরকার ছিল বউমা। তোমরা ঈদ করতে এসেছ, এতেই আমরা খুব খুশি।’

আলাপচারিতায় আল আমিন হোসেন বলেন, ‘ব্যস্ততার কারণে মন চাইলেও বাড়ি আসতে পারি না। অপেক্ষায় থাকি কবে ঈদ আসবে, গ্রামে যাব। নাড়ির টানে বাড়ি ফিরতে পথের দুর্ভোগ-ক্লান্তি কিছুই গায়ে মাখি না।’ তিনি বলেন, ‘বাড়ি আসার ১৫ দিন আগেই মা-বাবা ছাড়াও স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য পোশাক কেনা শুরু করেছি। প্রিয়জনের হাতে তুলে দেওয়ার পর যে তৃপ্তি দেখি, মনে হয় এর চেয়ে সুখ পৃথিবীর আর কিছুতেই নেই।’

নুসরাত জাহান তন্বী বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে দীর্ঘদিন ঢাকায় থাকলেও গ্রামকেই বেশি আপন মনে হয়। গ্রামের পরিবেশও অন্য রকম। একসঙ্গে সবাই ইফতার করব, ঈদের দিন আনন্দ করব। যারা এভাবে ঈদ করে, তারাই একমাত্র বুঝে গ্রামের ঈদে কত মজা।’ বাড়িটির গৃহিণী আয়েশা বেগম বলেন, ‘ছেলে-বউ বাড়িতে এলে সবাই প্রাণ ফিরে পাই। যে ক’দিন তারা থাকবে, হৈ-হুল্লোড় করে আনন্দে কাটবে সময়।’

একই মহল্লার সালাম গাজীর বাড়িতে দেখা যায়, তাদেরও চলছে ঈদ প্রস্তুতি। সালাম গাজীর দুই ছেলে থাকেন বাইরে, আসতে আসতে চাঁদরাত হয়ে যাবে। কিন্তু তাদের আগমন ঘিরে এখন থেকেই চলছে প্রস্তুতি। সালাম গাজী বললেন, বাড়ির কারও ঈদের কেনাকাটা করা হয়নি। বড় ছেলে শহিদুল ইসলাম গাজী ফোন করে কিনতে নিষেধ করেছে। সে-ই এবার সবার জন্য ঢাকা থেকে কেনাকাটা সেরেছে।

সালাম গাজীর স্ত্রী সখিনা বিবি বললেন, ‘ছেলেরা যেসব খাবার ও পিঠা পছন্দ করে, সেগুলো তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করছি।’ সালাম গাজীর বাকি দুই ছেলে রঈসুল ও সাজিদুল স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বাড়িতেই থাকেন। রঈসুলের শিশুপুত্র রাজু বাড়িতে ঘুরছে ফিরছে আর জানতে চাইছে, বড় চাচ্চু কখন আসবে?
যশোর শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হাসান বুলু বলেন, মধ্যবিত্তের জন্য নগরজীবন খুবই কঠিন। তারা শুধু ঈদ উৎসব ঘিরেই পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পান। এ জন্য নাড়ির টানে শত ঝক্কি সয়েও ফেরেন শেকড়ের কাছে।

 

আরও পড়ুন

×