ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কারাগারে বসেই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন টিনু

কারাগারে বসেই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন টিনু
×

নুর মোস্তফা টিনু

আবদুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১৬:১৬ | আপডেট: ২৬ অক্টোবর ২০১৯ | ১৬:৩৮

র‌্যাবের হাতে এক মাস আগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চট্টগ্রাম নগরের ত্রাস সন্ত্রাসী নুর মোস্তফা টিনু। কিন্তু বন্ধ হয়নি তার চাঁদাবাজি। কারাগারে বসেই দিব্যি চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন তিনি। প্রায় প্রতিদিন তার অনুসারীরা দেখা করতে যান কারাগারে। নিয়ে আসেন দিকনির্দেশনা। চাঁদাবাজির ভাগের টাকা পৌঁছে দেওয়া হয় তার পরিবারের কাছে। তার শতাধিক অনুসারী থাকলেও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন তার ছয় বিশ্বস্ত সহচর। তারা হলেন নাহিদুল ইসলাম জাবেদ, অভিক দাশগুপ্ত, বিপ্লব দে, আনিস, নুরুন্নবী ও অনিন্দ্য বৈদ্য সানি। নগরের অনেক জায়গা থেকে তারা চাঁদাবাজি করলেও প্রধান খাতগুলো হলো চকবাজার কাঁচাবাজার, পোশাক কারখানা, কোচিং সেন্টার, বেসরকারি  স্কুল-কলেজ, টমটম ও নির্মাণাধীন ভবন। প্রসঙ্গত ২২ সেপ্টেম্বর রাতে নগরের চকবাজার কাপাসগোলা এলাকার বাসা থেকে অস্ত্র ও গুলিসহ নুর মোস্তফা টিনুকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।

র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহাবুবুল আলম সমকালকে বলেন, 'সন্ত্রাসী নুর মোস্তফা টিনুর  নামে চাঁদাবাজি হচ্ছে এ ধরনের অভিযোগ এখনও পাইনি। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। যদি চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ পাই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নুর মোস্তফা টিনুকে গ্রেপ্তারের পর তার অনুসারীদের হাল ধরেছেন তার আরেক ভাই ছাত্রদল নেতা নুরুল আলম শিপু। জামিনে ছাড়িয়ে আনতে সব ধরনের আইনি সহায়তার ব্যবস্থা করছেন তিনি। এর আগে ২০১৭ সালে এক ব্যবসায়ীর  টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিপুকে গ্রেপ্তার করেছিল পাঁচলাইশ থানা  পুলিশ। তাকে ছাড়িয়ে নিতে অনুসারীদের নিয়ে থানা ঘেরাও করেছিলেন টিনু।

টিনুর চাঁদাবাজির সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন তার অনুসারী নাহিদুল ইসলাম জাবেদ, অভিক দাশগুপ্ত, বিপ্লব দে, আনিস, নিজাম উদ্দিন আহাদ, নুরুন্নবী, অনিন্দ্য বৈদ্য সানি, সৌরভ উদ্দিন ওরফে বাপ্পা ও জুলকাস। এদের মধ্যে চকবাজারের ধুনিরপুল থেকে ঘাসিয়াপাড়ার মুখ পর্যন্ত শতাধিক কাঁচা তরকারি, ফল ও মাংসের দোকান থেকে চাঁদা তোলেন জাবেদ, বিপ্লব দে ও অনিন্দ্য বৈদ্য সানি। চকবাজারের ভেতরে কাঁচাবাজার ঘিরে বসা ভ্যান ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তোলেন অভিক দাশগুপ্ত। আধুনিক চক সুপারমার্কেট থেকে ধুনিরপুল পর্যন্ত বিভিন্ন ভ্যানগাড়ি থেকে প্রতিদিন কয়েকশ' টাকা করে চাঁদা নেন আনিস। এ ছাড়া এককালীন ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দেওয়ার কাজটিও করেন তিনি। চকবাজার থেকে কাপাসগোলা পর্যন্ত সড়কের দু'পাশে বসা দোকানগুলো থেকে চাঁদা নেন নাহিদুল ইসলাম জাবেদ। এ ছাড়া ডিসি রোড, গুলজার মোড়, অলি খাঁ মসজিদ মোড়, চট্টেশ্বরী রোড ও লালচান্দ রোড এলাকায় চাঁদাবাজি করেন তার অনুসারী সাদ্দাম হোসেন ইভান, রবিউল ইসলাম রাজু, জুলকাস, সৌরভ উদ্দিন বাপ্পা, শাহাদাত হোসেন রিফাত, লম্বা নাসিরসহ তার অর্ধশত অনুসারী। চকবাজার থেকে রাহাত্তারপুল কেবি আমান আলী সড়কে চলাচলরত টমটমগুলো থেকে চাঁদাবাজি করেন ছামাদ, নিজাম উদ্দিন আহাদ, বাকলিয়ার চারতলার দেলোয়ার, শাহেদ ও জাহেদ। চকবাজার এলাকার পোশাক কারখানাগুলোর ঝুটের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে আছেন  টিনুর আরেক সহচর নুরুন্নবী। কোচিং সেন্টার ও বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলো থেকে চাঁদাবাজি করেন অভিক দাশগুপ্ত।

চকবাজার আধুনিক চক সুপারমার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি খোরশেদ  আলম বলেন, 'নুর মোস্তফা টিনুকে গ্রেপ্তারের পর চকবাজারের ব্যবসায়ীরা সাময়িক স্বস্তি পেয়েছেন। কারণ তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার চাঁদাবাজি বন্ধ হয়নি। তিনি কারাগারে বসে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার অনুসারীরা নিয়মিত দেখা করে এসে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্ত করে দেখলেই তার সত্যতা পাবে।'

এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. কামাল হোসেন বলেন, 'প্রতিদিন প্রায় চার হাজার দর্শনার্থী বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। এর মধ্যে কে, কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আসেন, সেটা তো জানা সম্ভব নয়। যাতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো কার্যক্রম অথবা অবৈধ কোনো কিছু নিয়ে প্রবেশ করতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর থাকে। এ ছাড়া কোনো বন্দির বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা ছাড়া দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ নেই।'

চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিন বলেন, 'ব্যবসায়ীরা একটু সাহসী হয়ে টিনুর নামে কারা চাঁদাবাজি করছেন তা জানালে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'

আরও পড়ুন

×