শর্ত লঙ্ঘনেও চুপ সিডিএ
অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে জমি বরাদ্দ নিয়ে সুপারশপ!
শতকোটি টাকার ৬৮ কাঠা জমি বরাদ্দ নিয়েছে ‘হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেড’
চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকায় বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণের জন্য ৬৮ কাঠা জমি বরাদ্দ দিয়েছিল সিডিএ। সেখানে গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক স্থাপনা -সমকাল
আব্দুল্লাহ আল মামুন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৪ | ০০:৩৬ | আপডেট: ১১ নভেম্বর ২০২৪ | ০৯:৫২
নগরবাসীর আবাসন সংকট নিরসনে একাধিক বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানকে ৬৮ কাঠা জমি বরাদ্দ দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। শর্ত ছিল দুই বছরের মধ্যে সেখানে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণ করবে প্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া অন্য কাজে এই জমি ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু দুই দশকেও সেখানে হয়নি কোনো অ্যাপার্টমেন্ট! উল্টো বরাদ্দের শর্ত লঙ্ঘন করে জমিটি ব্যবহার করা হচ্ছে বাণিজ্যিক কাজে। সেখানে চালু করা হয়েছে সুপারশপ, জুসবার, খাবারের দোকান ও কারওয়াশ সেন্টার।
শর্ত লঙ্ঘন করলেও আবাসন প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সিডিএ। এ ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ীরা। তারা চুক্তি বাতিল করে প্রকৃত আবাসন প্রতিষ্ঠানকে জমিটি বরাদ্দ দেওয়ার দাবি জানান। সিডিএর কাছ থেকে বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে প্রায় শতকোটি টাকার ওই জমি বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি হলো ‘হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেড’।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১৯৬৪-৬৫ সালে ‘আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকা’ গড়ে তোলে। ১৯৯৯ সালে ২৩ নভেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে ওই আবাসিক এলাকার এক দশমিক ৭০ একর জমি বহুতল ‘অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক’ নির্মাণে নিলামের মাধ্যমে বিক্রির অনুমোদন চান তৎকালীন সিডিএ চেয়ারম্যান কর্নেল এমএমকেজেড জালালাবাদী। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘চট্টগ্রামের জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। শহরের অভ্যন্তরে আবাসিক ভূমি প্রাপ্তি অপ্রতুলতার কারণে আবাসিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। এই পরিস্থিতিতে ঢাকার মতো চট্টগ্রামেও বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক নির্মাণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবনগুলোতে একসঙ্গে অধিকসংখ্যক লোকের গৃহায়নের ব্যবস্থা হয়।’
মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর ২০০৪ সালের ১২ জুন স্থানীয় দৈনিক আজাদীতে অ্যাপার্টমেন্ট নির্মাণে নিলামের মাধ্যমে জমি বিক্রির বিজ্ঞপ্তি দেয় সিডিএ। সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হয় হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেড। ওই বছরের ২৪ আগস্ট সিডিএর তৎকালীন সচিব গাজী মোহাম্মদ নুরুল কবীর স্বাক্ষরিত এক বরাদ্দপত্রে সাতটি শর্তে ৬৭ দশমিক ৬১ কাঠার দুটি প্লট প্রতিষ্ঠানটিকে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দেওয়া হয়। বরাদ্দপত্রের ৭ নম্বর শর্তে উল্লেখ রয়েছে, ‘ইজারাগ্রহীতা প্লটটি শুধু বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ব্লক নির্মাণের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারবেন। বরাদ্দ দেওয়ার দুই বছরের মধ্যে ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী ইমারত নির্মাণ করতে হবে। সিডিএর অনুমোদন ছাড়া ইজারাগ্রহীতা জমিতে কোনো নির্মাণকাজ করতে পারবেন না।’
এর আগে একই বছরের ১৫ জুলাই সিডিএতে অঙ্গীকারনামা জমা দেন হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ হাসান। তাতে তিনি অঙ্গীকার করেন, ‘সিডিএর অনুমোদন ব্যতীত তিনি কোনো নির্মাণকাজ করবেন না এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করবেন।’ দুটি প্লটের মধ্যে ৩৪ দশমিক ২৫ কাঠার একটি প্লট বন্ধক রেখে জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য ২০২০ সালের ২৬ আগস্ট সিডিএর কাছ থেকে ছাড়পত্র নেন আবদুল্লাহ হাসান।
সম্প্রতি আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক এলাকার ১ নম্বর ও ১৫ নম্বর সড়কের পাশে বহুতল অ্যাপার্টমেন্টের জন্য নির্ধারিত প্লটে গিয়ে দেখা যায়, এর একাংশে রয়েছে টিনের একটি শেড, অন্যপাশে
একটি সুপারশপ, একটি কারওয়াশ, একটি জুসবার, একটি খাবার দোকান ও একটি কৃত্রিম ঘাসের (টার্ফ) ফুটবল মাঠ। বাকি জায়গা খালি পড়ে আছে। একটি সাইনবোর্ডে লেখা রয়েছে ‘খরিদাসূত্রে এই জায়গার মালিক হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেড।’ ঠিকানা– ‘রামজয় মহাজন লেন, আছাদগঞ্জ, চট্টগ্রাম’।
গত ১ নভেম্বর নগরের আছাদগঞ্জের রামজয় মহাজন লেন ঘুরে এই প্রতিষ্ঠানটির খোঁজ মেলেনি। এলাকার কোনো ব্যবসায়ীও আবাসন প্রতিষ্ঠানটির খোঁজ দিতে পারেননি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ হাসানের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। প্লটে প্রতিষ্ঠানটির সাইনবোর্ডে রয়েছে তিনটি মোবাইল ফোন নম্বর। কিন্তু একাধিকবার কল করে তিনটিই বন্ধ পাওয়া যায়।
এদিকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৯ সালের ২ আগস্ট জারি করা পরিপত্র অনুযায়ী, সব আবাসন প্রতিষ্ঠানের রিহ্যাবে সদস্যপদ নেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ‘হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রতিষ্ঠান রিহ্যাবের কোনো সদস্য নেই বলে জানা যায়।
এমন একটি প্রতিষ্ঠানকে শতকোটি টাকার প্লট বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চট্টগ্রামের আবাসন ব্যবসায়ীরা। রিহ্যাব চট্টগ্রাম রিজিওনাল কমিটির চেয়ারম্যান হাজি দেলোয়ার হোসেন সমকালকে বলেন, ‘মধ্যবিত্তের নাগালের মধ্যে ফ্ল্যাট নির্মাণের জন্য জায়গা চেয়ে দীর্ঘদিন সিডিএর কাছে ধরনা দিয়েছে রিহ্যাব। কোনো জমি বরাদ্দ পায়নি। উল্টো অখ্যাত প্রতিষ্ঠানকে শতকোটি টাকার জমি বরাদ্দ দিয়েছে তারা। এটি দুঃখজনক।’ তিনি বলেন, ‘বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু ইজারার শর্ত লঙ্ঘন করেছে। তাই তাদের বরাদ্দ বাতিল করে প্রতিষ্ঠিত ও আবাসন খাতে সুনাম আছে এমন প্রতিষ্ঠানকে জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়া হোক। তাহলে জমিটি কাজে আসবে।’
এ বিষয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. নুরুল করিম বলেন, ‘আগে অনেক অনিয়ম হয়েছে। আমরা সবকিছু শৃঙ্খলায় আনার চেষ্টা করছি। জায়গাটি ইজারা নিয়ে ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তাই সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘অনুমোদন ছাড়া ওই জমিতে বাণিজ্যিক স্থাপনা করায় হাসান আবাসন প্রাইভেট লিমিটেডকে নোটিশ দেওয়া হবে। স্থাপনা সরিয়ে না নিলে উচ্ছেদ করা হবে।’
- বিষয় :
- আবাসিক শহর