ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

হাওরের জলমহাল দখলে আ’লীগ-বিএনপি ‘আঁতাত’

হাওরের জলমহাল দখলে আ’লীগ-বিএনপি ‘আঁতাত’
×

.

 পঙ্কজ দে, সুনামগঞ্জ

প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৪ | ০০:৪১

‘সরকার যার, জলমহাল তার’– এটি হাওরের অলিখিত প্রবাদ। গত সাড়ে ১৫ বছর ভোগ করলেও ৫ আগস্টের পর বিপাকে পড়েছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তবে তারা বিনিয়োগের অর্থ বিএনপির প্রভাবশালীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে উঠিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরই অংশ হিসেবে কোনো জলমহালে বিএনপি নেতাদের শরিকানা দিয়েছেন। আবার কোনোটি স্ট্যাম্প করে দিয়ে গেছেন।

সুনামগঞ্জে ছোট-বড় ১ হাজার ২৯টি জলমহাল রয়েছে। ২০ একরের নিচে ৪০৫ ও ২০ একরের ওপরে রয়েছে ৬২৪টি। ২০ একরের নিচের ৩৭৯ জলমহাল ইজারা, বাকি ২৬টি খাস কালেকশন দিয়েছে সরকার। অন্যদিকে, ২০ একরের ওপরের ৪৬০ জলমহাল ইজারা ও বাকি ৬৪টি দেওয়া হয়েছে খাস কালেকশন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, গত সাড়ে ১৫ বছর এসব জলমহালের বেশির ভাগ নামমাত্র ইজারা, অর্থ না দিয়ে কিংবা আগের ইজারাদারকে মামলায় জড়িয়ে দখল এবং ভোগ করেছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। এ জন্য তারা হাওরাঞ্চলে ‘ওয়াটার লর্ড’ নামে পরিচিত। এসব জলমহালে প্রতিবছর ডিসেম্বরের মাঝামাঝি মাছ ধরা শুরু হয়। মৎস্য আহরণ চলে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর বেকায়দায় পড়লেও পরে আওয়ামী লীগের ইজারাদাররা যে যার মতো পুঁজি রক্ষার চেষ্টা করেছেন।

বিনিয়োগ তুলতে বিএনপির প্রভাবশালীদের আওয়ামী লীগ রক্ষাকবচ বানানোয় অনেকেই ক্ষুব্ধ। ফলে বড় বড় জলমহালে মাছ ধরা নিয়ে সংঘাতের আশঙ্কা করছে জেলা প্রশাসন। গতকাল রোববার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে জলমহালে সতর্ক দৃষ্টি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সমর পালের সঞ্চালনায় সভায় সেনাবাহিনীর সুনামগঞ্জের দায়িত্বপ্রাপ্ত দ্বিতীয় কমান্ডিং অফিসার মহিউদ্দিন ফারুকি, পুলিশ সুপার আ ফ ম আনোয়ার হোসেন খান, বিজিবির সুনামগঞ্জ ক্যাম্পের অধিনায়ক লে. কর্নেল জাকারিয়া কাদির, র‍্যাব-৯ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহ আলম প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

সভায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, আগের নামেই জলমহালগুলোর ইজারা রয়েছে। ইজারাদারদের বেশির ভাগ এলাকায় নেই। তাদের অনেকের ওপর মানুষ ক্ষুব্ধ। ফলে মাছ ধরা নিয়ে কোনোভাবেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি হতে দেওয়া যাবে না। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা ওসিসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসবেন। প্রয়োজনে এ বিষয়ে কমিটি করতে হবে। সতর্ক থাকতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, জেলার মধ্যনগরের লুঙ্গাতুঙ্গা, শালদিঘা, বাইমচাপড়া, গুড়াডোবা, জামালগঞ্জের শালমারা, তাহিরপুরের শনির হাওর, মাটিয়ান হাওর, ধর্মপাশার ধারাম, কাওনাই ও চাঁনপুরের দাইড়, দিরাই উপজেলার ভাদালিয়া, নিমাইখালী, নোখালী, বরাম হাওর, শাপলার চর ও বাঘুয়া জলমহাল নিয়ে বিরোধ রয়েছে। কিছু জলমহাল আওয়ামী লীগের ইজারাদাররা বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে বিনিয়োগ তোলার চেষ্টা করছেন। কোথাও কোথাও জলমহাল দখল নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

তাহিরপুরের বিশাল শনির হাওর আনন্দনগর মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা নেন আওয়ামী লীগ নেতা শামীম আখঞ্জি। তিনি বৈশাখ মাসে জলমহালের রাজস্ব জমা দেননি। বিষয়টি জানাজানি হলে সম্প্রতি স্থানীয়রা জলমহালের মাছ ধরে নেন। এ উপজেলার মাটিয়ান হাওর ভাটি তাহিরপুর মৎস্যজীবী সমিতির নামে ইজারা নেন উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শফিকুল ইসলাম। ৫ আগস্টের পর স্থানীয়রা এটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে শফিকুল বিএনপির স্থানীয় নেতা শফি আলমের সঙ্গে আঁতাত করে রফা করেন। বিএনপি নেতা শফি আলম বলেন, ‘মাটিয়ান হাওরে কোনো সমস্যা নেই। আমি শফিকুলের কাছ থেকে অংশ কিনে নিয়েছি।’

মধ্যনগরের বড় জলমহালগুলো বিভিন্ন সমিতির নামে সাবেক সংসদ সদস্য মোয়াজ্জেম হোসেন রতন ও অ্যাডভোকেট রঞ্জিত সরকারের সহযোগিতায় ভোগ করেন আওয়ামী লীগ নেতা আজিম মাহমুদ, মোবারক হোসেন, কামাল হোসেন ও পরিতোষ সরকার। এসব জলমহাল স্ট্যাম্পে লিখে বিএনপি নেতা আব্দুল কাইয়ুম মজনুর ঘনিষ্ঠদের দিয়ে গেছেন আওয়ামী লীগের ওই ইজারাদাররা।
ধর্মপাশার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোকারম হোসেন বলেন, ‘ধারাম, কাওনাই ও চাঁনপুরের দাইড় জলমহাল ছেড়ে দিতে বিএনপি নেতা (ধর্মপাশা উপজেলা বিএনপির সভাপতি) মোতালেব খান চাপ দেন। এক পর্যায়ে ধারাম বিল অর্ধেক মোতালেবের এক আত্মীয়ের নামে লিখে দিয়েছি। বাকি অংশও তারা চাচ্ছেন। কাওনাই ও চাঁনপুরের দাইড়ও লিখে দিতে চাপ রয়েছে।’ তবে আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘মোকারমের অভিযোগ সত্য নয়। তিনি গত ১৫ বছর বিলের পাশে থাকা আমার পারিবারিক জমিও দখলে রেখেছিলেন। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি রতনের লাঠিয়াল ছিলেন মোকারম। শুনেছি, মোকারম বিভিন্ন জলমহাল ইজারা নিয়ে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করেছেন। ভৈরবের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছেন।’ মধ্যনগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম মজনুও জানান, তাঁর নামে মিথ্যা অপপ্রচার করছেন আওয়ামী লীগের সমর্থকরা।

আরও পড়ুন

×