দুই অর্থ পাচারকারীকে রক্ষায় কর্মকর্তা
.
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ০১:২০ | আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ | ০৮:১৭
ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা না গেলেও চীন থেকে এসেছে ২৬ হাজার কেজি পণ্য। খালাসের জন্য ব্যাংকের দেওয়া এলসির প্রত্যয়নপত্র জাল ধরা পড়লে ৩৪ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। খোলা চোখে এটি কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের বিশাল কর্মযজ্ঞ মনে হলেও, ভূত তাদের মধ্যেই রয়েছে। আর তা সামনে এসেছে একই সংস্থার দুই তদন্তে।
অভিযোগ উঠেছে, চট্টগ্রামের ‘অ্যাপারাল অপটিঅনস প্রাইভেট লিমিটেডের’ অর্থ পাচার জানার পরও সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মীর পাভেল রহমান প্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করে দায়মুক্তি দিয়েছেন। তিনি চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান ও পরিচালক মির্জা মো. আবু সোলায়মানকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছেন। আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্তে বেরিয়ে এসেছে অর্থ পাচার।
সাবেক চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্পেশাল পিপি মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘কাস্টমস আইনে মানি লন্ডারিং ফৌজদারি অপরাধে কাউকে দায়মুক্তি দেওয়ার সুযোগ নেই। অ্যাপারাল অপটিঅনসের ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে কৌশলে আসামিদের বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন।’
অভিযুক্ত সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মীর পাভেল রহমান বলেন, ‘শুল্ক ফাঁকি-সংক্রান্ত বিষয় তদন্ত করে আমি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আসামিদের অব্যাহতির সুপারিশ করেছিলাম। এটি আমার একার সিদ্ধান্ত নয়। এনবিআর বোর্ড থেকে অনুমোদন নিয়েই সুপারিশ করেছি।’ অর্থ পাচারে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি কাস্টমস দিতে পারে কিনা– প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মানি লন্ডারিং হলে কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে যা করেছি, আমি বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে করেছি। আসামিদের ইচ্ছাকৃতভাবে রক্ষার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। কোনো অনৈতিক সুবিধাও নিইনি।’
আদালতের নির্দেশে অধিকতর তদন্ত করা রাজস্ব কর্মকর্তা আকরাম হোসেন বলেন, ‘এখানে মানি লন্ডারিং ও শুল্ক ফাঁকি– দুটিই ছিল। কিন্তু আগের তদন্তে মানি লন্ডারিং আড়াল করা হয়েছে। দুটি বিষয় তদন্ত করে আমি আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছি।’
একই সংস্থার ভিন্ন তদন্ত
কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তদন্ত করে অ্যাপারাল অপটিঅনস প্রাইভেট লিমিটেডের মানি লন্ডারিং ও শুল্ক ফাঁকির সত্যতা পায়। তারপর মামলা হয়। তদন্ত করে প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা দুই ব্যবসায়ী আজিজুর রহমান ও মির্জা মো. আবু সোলায়মানকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। তা আমলে না নিয়ে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। আরেক তদন্ত কর্মকর্তা অধিকতর তদন্তে মানি লন্ডারিং ও শুল্ক ফাঁকির অভিযোগে গত ২ ফেব্রুয়ারি দুই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম আদালতে সম্পূরক তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এর পরই সামনে আসে এক সংস্থার দুই ধরনের তদন্ত।
শেষ রক্ষা হলো না অর্থ পাচারকারীর
সম্পূরক তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দুটি বিল এন্ট্রি উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে একটির মাধ্যমে ভুয়া ফ্রি অব কস্টে (এফওসি) এলসি ছাড়াই ২৬ হাজার কেজি ১০০ শতাংশ পলি ফেব্রিক্স (ইনভয়েস মূল্য ১৫ হাজার ৬০০ ডলার) আমদানি করা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পর খালাসে কাস্টমস হাউসের বন্ডেড প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইএম ও বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে। সন্দেহ হলে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর চালানের শুল্কায়ন স্থগিত করে। অনুসন্ধানে এফওসি সুবিধায় আমদানি-সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্র ভুয়া ধরা পড়ে। কমার্শিয়াল ইনভয়েস, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক জুবিলি রোড শাখা (চট্টগ্রাম) প্রত্যয়নপত্র ইস্যুই করেনি। প্রত্যয়নপত্রে থাকা কর্মকর্তার স্বাক্ষর-সিল সবই জাল। পরে অপটিঅনসের চেয়ারম্যান ২০১৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি কাস্টমস হাউসের শুনানিতে ব্যাংকের প্রত্যয়নপত্র সঠিক দাবি করেন। কিন্তু স্বাক্ষর করা ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা কামরুন নাহার ২০২০ সালের ৫ আগস্ট কাস্টমসের শুনানিতে লিখিত দেন, তাঁর স্বাক্ষর, স্মারক নম্বর, ডেসপাসসহ সবকিছুই জাল। এর পর প্রতিষ্ঠানের এমডি মির্জা আবু ওসমান কাস্টমস কমিশনারের শুনানিতে প্রত্যয়নপত্র জালসহ সব অপরাধ স্বীকার করেন। তিনি পণ্য বাজেয়াপ্ত না করে কাস্টমস আইনে ন্যায়নির্ণয়ন আরোপের আবেদন করেন। পরে ৩৪ লাখ টাকা শুল্ক ফাঁকির চেষ্টায় প্রতিষ্ঠানটিকে ১৮ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেয় কাস্টমস।
এতে আরও বলা হয়, আসামিরা সব জেনে মিথ্যা ও ভুয়া এফওসি প্রত্যয়নপত্র ব্যবহার করে চীন থেকে পণ্য আমদানি করেন। এ বাবদ ১৫ হাজার ৬০০ মার্কিন ডলার অবৈধ পথে গোপনে কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে পরিশোধ করেন, যা মানি লন্ডারিং।
আসামিদের রেহাই দেন প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা
আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মানি লন্ডারিং ও রাজস্ব ফাঁকির সত্যতা পেয়েও ১৮ লাখ টাকা ন্যায়দণ্ড আরোপ করা হয়। এ অর্থদণ্ডকে কৌশল হিসেবে কাজে লাগিয়ে ৬৭ লাখ ৭৩ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির সম্ভাবনাকে তথ্যগত ভুল উল্লেখ করে মানি লন্ডারিং অপরাধ থেকেও আসামিদের রক্ষার চেষ্টা করেন প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা। ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁর দেওয়া প্রথম চূড়ান্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কাস্টমস আইন অনুযায়ী আরোপিত অর্থদণ্ড ও রাজস্ব ফাঁকির অর্থের পরিমাণ বিবেচনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তথ্যগত ভুল দাখিলের অনুমোদন করে। আসামিরা কাস্টমস আইন অনুযায়ী ১৮ লাখ টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে পরিশোধ করায় এটি তথ্যগত ভুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আসামিদের মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানানো হলো।
- বিষয় :
- পাচারকারী
