চার বছর সূর্যের মুখ দেখেনি মেয়েটি
.
আক্কেলপুর (জয়পুরহাট) সংবাদদাতা
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৫ | ০১:২৪ | আপডেট: ২৮ জুলাই ২০২৫ | ০১:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
স্ত্রীর মৃত্যুর পর দুই মেয়েকে আগলে রাখেন। কিন্তু প্রেম করে বড় জনের পালিয়ে বিয়ে মেনে নিতে পারেননি বাবা। তাঁর মনে সন্দেহ দানা বাঁধে, ছোট মেয়েও একই পথে হাঁটবে। এজন্য এসএসসি পাসের পরই তাঁকে ঘরবন্দি করেন। ঘুমের ইনজেকশন পুশ করে তালা দিয়ে বাইরে যেতেন। প্রতিদিন ফিরে তালা খুলতেন।
দিন, মাস নয়; টানা চার বছর একই কাজ করেছেন আক্কেলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট। ১৯ বছর বয়সী মেয়েটি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। অবশেষে শনিবার সন্ধ্যায় প্রতিবেশীদের হস্তক্ষেপে নির্মমতার অবসান হয়েছে। পুলিশ পৌর এলাকার বাড়ির কক্ষ থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করে।
আক্কেলপুর থানার এসআই গণেশ চন্দ্র জানান, প্রতিবেশীদের সহায়তায় তারা অস্বাস্থ্যকর আবদ্ধ কক্ষ থেকে মেয়েটিকে উদ্ধার করেন। কথাবার্তায় অসংলগ্নতা পেয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার জন্য বাবাকে বলেছেন।
যে বাবা দিনের পর দিন এমন নির্যাতন করলেন, তাকেই দায়িত্ব কেন– প্রশ্নে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মমিনুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ‘কথাবার্তায় মনে হয়েছে, বাবা ভুল বুঝতে পেরেছেন। তিনি স্বাভাবিক পরিবেশে রাখা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করার অঙ্গীকার করেছেন। এ জন্য প্রতিবেশীদের সজাগ করে মেয়েটিকে তাঁর কাছে রেখেছি।’
তিনি বলেন, ‘সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছি। অঙ্গীকারের ব্যত্যয় কিংবা নির্যাতন করা হলে বাবার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মেয়েটির বাবা সাংবাদিকদের বলেন, ‘বড় মেয়ের কারণে আমার মানসম্মানের বড় ক্ষতি হয়েছে। ছোট মেয়ে ২০২১ সালে এসএসসি পাস করে। চেহারা সুন্দর হওয়ায় ছেলেরা তাকে উত্ত্যক্ত করত। এ কারণে পড়ালেখা বন্ধ করে বাড়িতে রেখে দিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘শনিবার সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ফটকের সামনে পুলিশ ও স্থানীয়দের দেখতে পাই। তারা বাড়ির ভেতরে ঢুকে আমার মেয়েকে দেখেছে। সে স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলতে পারেনি। পুলিশ আমাকে কিছু নির্দেশনা দিয়েছে, সেগুলো পালন করব।’
শনিবার বিকেলে সরেজমিন বাড়ির প্রধান ফটকে তালা দেখা যায়। সন্ধ্যায় বাবা এসে প্রতিবেশীদের তোপের মুখে পড়েন। ততক্ষণে পুলিশ সদস্যরা আসেন। এক পর্যায়ে বাবা তালা খুলে দিলে পুলিশ ও প্রতিবেশীরা মেয়েটিকে বের করে আনেন।
বাইরের নজর এড়াতে ঘরের জানালায় টিন ও কাঠ লাগানো। মেয়েটির কক্ষে একটি ছোট ফ্যান ও একটি বাতি। আসবাবে কাগজে বাড়ির মালিকের নামের আগে ডা. লেখা।
দুই প্রতিবেশী জানান, বাড়িতে প্রতিবেশীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেন বাবা। পরে মেয়ের মাথাও ন্যাড়া করেছেন। প্রভাবশালী হওয়ায় বাবার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলার সাহস পেতেন না।
সৎমা বলেন, ‘বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমার স্বামী গেটে তালা দিয়ে যেতেন। ফিরে এসে খুলতেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ ছিল না। বাড়িতে স্বামীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস আমার ছিল না।’
- বিষয় :
- বন্দি
