চট্টগ্রামে তিন প্রতিষ্ঠানের হুন্ডি কারবারের জাল
.
আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২৫ | ০১:০১
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশিদের কাছ থেকে হুন্ডির উদ্দেশ্যে অর্থ সংগ্রহ করেন ছয়জন। সেই অর্থ প্রবাসীদের স্ত্রী, মা-বাবার মোবাইল নম্বরে নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে পৌঁছে দেন চট্টগ্রাম নগরীতে অবস্থান করা হুন্ডি কারবারিরা। এই চক্রে জড়িত তিন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের চিহ্নিত করেছে পুলিশ।
সৌদিপ্রবাসী হুন্ডি কারবারিরা অর্থ জমা নেওয়ার সময় বাংলাদেশে কোন নম্বরে পাঠানো হবে, সেটি সংগ্রহ করেন। পরে কত টাকা পরিশোধ করতে হবে সে হিসাব ও মোবাইল নম্বর ইমো-হোয়াটসঅ্যাপে পাঠায় বাংলাদেশে তাদের সহযোগীদের কাছে।
দুই প্রতিষ্ঠান সুমন অ্যাসোসিয়েট ও আক্তার অ্যান্ড ব্রাদার্স ‘ইজিক্যাশ ডটকম’-এর মাধ্যমে চালায় লেনদেন। নগদ কমিশন নিয়ে নতুন নতুন এজেন্ট নিয়োগ দিয়ে কারবারের বিস্তার ঘটায় সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্স। শুধু চার মাসে তারা লেনদেন করেছে ছয় কোটি ছয় লাখ টাকা। এই সময়ে আট হাজারবার লেনদেন হয়েছে। এতে জড়িত তিন প্রতিষ্ঠানের ২৬ জনকে শনাক্ত করেছে সিআইডি।
তবে হুন্ডির সব অর্থ সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের মাধ্যমে হাতে হাতে পৌঁছলেও প্রতিষ্ঠানটির মালিক মোহাম্মদ মামুন সালাম থেকে গেছেন তদন্তের বাইরে। তিনি সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের খালাতো ভাই।
২০২২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর নগরীর রিয়াজউদ্দিন বাজারে রুপন কান্তি দাশ নামে এক কম্পিউটার দোকানির বিকাশ নম্বরে অস্বাভাবিক লেনদেনের বিষয় নজরে আসে সিআইডির। এরপর করা হয় মানি লন্ডারিং আইনে মামলা। তদন্তে বেরিয়ে আসে হুন্ডি চক্রের তথ্য। ১১ আগস্ট চট্টগ্রামের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।
হুন্ডির টাকা প্রবাসীদের স্বজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন ১০ আসামি। আক্তার হোসেন, রাশেদ, ইমন, আসিফ, আদিবুর, জুনাইদুল, কবির, মবিন, খোরশেদুল ও জয় জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা বলেন, ‘নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে তারা হুন্ডির টাকা নগদ ও বিকাশে লেনদেন করেন। সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের হয়ে প্রবাসীর স্বজনের নম্বরে টাকা স্থানান্তর করতেন। সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের সেলস টার্গেট পূরণ করার জন্য হুন্ডির অর্থ তারা লেনদেন করতে বাধ্য হন।’
তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি অর্গানাইজড ক্রাইমের (ফিন্যান্সিয়াল) এসআই রুহুল আমিন সমকালকে বলেন, চট্টগ্রামে দুটি সিম ব্যবহার করে বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে অপকর্মে জড়িত ২০ জনকে শনাক্ত করেছেন। তিনটি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরব ও চট্টগ্রামে হুন্ডি কারবারে সম্পৃক্ত। আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তিনি।
এক প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন বলেন, সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক মামুন সালামের বিরুদ্ধে আরেকটি মানি লন্ডারিং মামলার তদন্ত চলছে। তাই এই মামলায় তাঁকে তদন্তের আওতায় আনা হয়নি।
এ ব্যাপারে জানতে মামুন সালামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েও তাঁর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তবে সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের সিইও রাশেদ মঞ্জুর ফিরোজ সানি সমকালকে বলেন, ‘বিকাশে কমিশন নিয়ে আমরা অর্থ লেনদেন করতাম। কোনো ধরনের হুন্ডি কারবারে জড়িত ছিলাম না।’ আরেক অভিযুক্ত আক্তার হোসেন বলেন, বিকাশ এজেন্টের ব্যবসা করেছি। অর্থ লেনদেন করেছি। কোনো হুন্ডির অর্থ লেনদেন করিনি।’
চট্টগ্রামের সিনিয়র আইনজীবী মেজবাহ উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ব্যাংকিং চ্যানেল ছাড়াই খুব সহজে হুন্ডিতে অর্থ পাঠানো হচ্ছে। বিদেশে থাকা সিন্ডিকেট প্রবাসীর অর্থের পরিমাণ ও দেশে যার কাছে পাঠাবে তার মোবাইল নম্বর জনিয়ে দেয়। নগদ ও বিকাশের মাধ্যমে প্রবাসীর স্বজনের নম্বরে সহজেই অর্থ পাঠানো হয়। এতে ডলার দেশে না এসে বিদেশেই থেকে যাচ্ছে। এ প্রক্রিয়াতেই দেশ থেকে পাচার হচ্ছে কালো টাকা। রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক কারবারিরা হুন্ডির শক্তিশালী জাল বিস্তার করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে মেজবাহ উদ্দিন বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং শুরুর আগে হুন্ডিতে টাকা পাচার কঠিন ছিল। তখন ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ও নগদে সরাসরি লেনদেন করতে হতো। সেই সময় অপরাধে জড়িতদের সহজে শনাক্ত করা যেত। এখন এমন অপরাধ ঘটানো সহজ হয়ে গেছে।
তিন প্রতিষ্ঠানের ২৬ ব্যক্তি হুন্ডি কারবারে
চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন বাজারকেন্দ্রিক সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্স, আক্তার অ্যান্ড ব্রাদার্স ও সুমন অ্যাসোসিয়েটের লোকজন সৌদি আরবে থাকা প্রবাসীদের সঙ্গে হুন্ডি কারবারে সম্পৃক্ত। তারা দীর্ঘদিন অপকর্মে সম্পৃক্ত থাকলেও সিআইডি তাদের মাত্র চার মাসের অপকর্মের হদিস পেয়েছে। এতেই উঠে এসেছে ৬ কোটি ৬ লাখ টাকা লেনদেনের ফিরিস্তি। অবৈধ লেনদেন পরিচালনাকারী হিসেবে আক্তার অ্যান্ড ব্রাদার্সের আক্তার হোসেন, সুমন অ্যাসোসিয়েটের দিদারুল আলম, সেলিম অ্যান্ড ব্রাদার্সের সিইও রাশেদ মঞ্জুর ফিরোজ সানিকে শনাক্ত করেছে সিআইডি। তাদের সহযোগীরা হলেন– ফরহাদ হোসেন ইমন, আসিফ নেওয়াজ, আদিবুর রহমান, জুনাইদুল হক, হোসাইনুল কবির, মবিন উল্লাহ, খোরশেদুল আলম ইমন (দিদারুল আলমের ভাই), রুপন কান্তি দাশ জয়, ওয়াহিদুল আলম, আবুল বশর, জাবের হোছাইন, মোহাম্মদ সাইফুল আলম, মুহাম্মাদ ফজল করিম, রেজাউল আলম মাসুদ, শওকত আলী, বরিউল হোসেন সাইমন ও শাহ আলম। সৌদি আরবে অবস্থানরতরা হলেন– আওয়াল, হোসাইন, মামুন, রক্কর, আফসার ও সাইফুল।
- বিষয় :
- হুন্ডি
