ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

মেদিনী মণ্ডল গার্লস কলেজ

চারতলা ভবন, ছাত্রী পাঁচজন, অধ্যক্ষই শুধু স্থায়ী

চারতলা ভবন, ছাত্রী পাঁচজন, অধ্যক্ষই শুধু স্থায়ী
×

.

লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:৩২ | আপডেট: ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:১১

মেদিনী মণ্ডল গার্লস কলেজ লৌহজং উপজেলার একমাত্র মহিলা কলেজ। পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্তে এটির অবস্থান। বিনা বেতনে পড়ানো হয়। আইসিটি কক্ষসহ রয়েছে চারতলা ভবন। তবে ছাত্রী মোটে ৫ জন। তারা দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছেন। একাদশ শ্রেণিতে এ বছর কেউ ভর্তিই হয়নি। স্থানীয়দের অনীহা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে ২৫ বছর ধরে ধুঁকতে থাকা বেসরকারি কলেজটির দ্বার আগামী বছর খুলবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

কলেজটিতে অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তারই শুধু পূর্ণকালীন। চারজন শিক্ষক আছেন খণ্ডকালীন। চালু আছে শুধু মানবিক বিভাগ। গত বছর পাঁচজন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছেন মাত্র একজন। সম্প্রতি সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটকে লেখা কলেজের নাম মুছে গেছে। সীমানাপ্রাচীর ঘেরা কলেজটি জঙ্গলসম গাছপালায় ভরে গেছে। জনশূন্য কলেজটি ভূতুড়ে মনে হয়। 
অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তার জানান, কলেজে একমাত্র তিনিই স্থায়ী শিক্ষক। পাঁচজন ছাত্রী, চারজন খণ্ডকালীন শিক্ষক ও একজন আয়া নিয়ে চলছে কলেজটির কার্যক্রম। ২০২৪ সালে চারজন এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে একজন পাস করেছে। অধ্যক্ষ জানান, এত কিছুর পরেও প্রতিবছর নির্ধারিত ফি দিয়ে কলেজের ১১টি পাঠ্যবিষয়ে স্বীকৃতি সনদ নবায়ন করা হচ্ছে। 

লৌহজংয়ে ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। প্রতি বছর এসব বিদ্যালয় থেকে কমপক্ষে ৫০০-৬০০ ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তারা উপজেলার সরকারি লৌহজং কলেজ, ইউনুস খান মেমোরিয়াল কলেজ, পার্শ্ববর্তী শ্রীনগর উপজেলার সরকারি শ্রীনগর কলেজ কিংবা ঢাকার কলেজগুলোতে ভর্তি হয়। মেদিনী মণ্ডল গার্লস কলেজটি যে মেদিনী মণ্ডল ইউনিয়নে অবস্থিত, সে ইউনিয়নেই তিনটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি বছর ১৫০-২০০ জন ছাত্রী পাস করে বের হয়। কিন্তু তারাও এ কলেজে ভর্তি হতে চায় না। এমনকি কলেজ লাগোয়া আনোয়ার চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পাস করা ছাত্রীরাও এখানে ভর্তি হতে অনিচ্ছুক। কারণ, কলেজটিতে শিক্ষকের সংকটের পাশাপাশি রয়েছে শুধু মানবিক শাখা। 

লৌহজং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শরীফ মো. মোর্তজা আহসান বলেন, কলেজের পরিচালনা কমিটি সক্রিয় হলে কলেজটি দাঁড়িয়ে যাবে বলে আমি বিশ্বাস করি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নেছার উদ্দিন জানান, কলেজটি যেহেতু বেসরকারি। অতএব, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলবে। তবে কলেজ পরিচালনায় কোথাও বাধাপ্রাপ্ত হলে আমরা দেখব। 

স্থানীয়দের অনীহা, রাজনৈতিক টানাপোড়েন
জানা যায়, ১৯৯৩ সালে দক্ষিণ মেদিনীমণ্ডল গ্রামের জলিল হাওলাদার নামে একজন শিক্ষানুরাগী নারীদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য এক একর জমি দান করেন। ১৯৯৪ সালের ২১ নভেম্বর স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য উইং কমান্ডার (অব.) এম হামিদুল্লাহ খান বীরপ্রতীককে প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি করে কলেজের কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকা কলেজের তৎকালীন ইংরেজি বিভাগের চেয়ারম্যান এম এ রশিদ ছিলেন প্রতিষ্ঠাকালীন অধ্যক্ষ। তখন ৪০ জন ছাত্রী নিয়ে পাঠদান শুরু হয়। ১৯৯৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০০০ সালের মে পর্যন্ত মো. শাহজাহান মিয়া অধ্যক্ষ ছিলেন। ২০০৫ সালে প্রভাষক রোজিনা আক্তার পূর্ণকালীন অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পান। স্থানীয়রা জানান, ২০০০ সালের পর থেকেই কলেজটির পতন শুরু হয়।

অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তারকে নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দুই ধরনের মনোভাব রয়েছে। একপক্ষ মনে করেন, রোজিনা আক্তার আছেন বলে কলেজটি এখনও টিকে আছে, নইলে এতদিনে কলেজের দরজা-জানালাও অবশিষ্ট থাকতো না। অন্যপক্ষের মতে, রোজিনা আক্তারের অধ্যক্ষ হওয়ার যোগ্যতা নেই। তাঁর কারণেই স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও শিল্পপতিরা এগিয়ে আসছেন না। রোজিনা আক্তারের বিষয়ে অনেকের ইতিবাচক মনোভাব নেই। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারও কলেজটির দিকে সুনজর দেয়নি। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তারকে বিএনপির সাবেক এমপি এম হামিদুল্লাহ খানের অনুসারী এবং বিএনপিপন্থি তকমা দিয়ে এড়িয়ে চলেছেন। এ কারণে টানা তিনবারের উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও শিল্পপতি ওসমান গনী তালুকদারও কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রমে এগিয়ে আসেননি। এমনকি সাবেক সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলিও কলেজটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। তৎকালীন ইউএনও, জেলা প্রশাসকদের দ্বারস্থ হয়েও কলেজের উন্নয়নে কোনো ব্যবস্থা করতে পারেননি বলে দাবি করেছেন অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তার। 

স্থানীয় শিক্ষানুরাগী প্রবীণ আবদুল লতিফ খান জানান, তিনি কলেজটির প্রতিষ্ঠালগ্নে প্রতিষ্ঠাতা হামিদুল্লাহ খান বীরপ্রতীকের সঙ্গে মিলে অর্থ সংগ্রহ করেছেন। সে সময় ১৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা সংগ্রহ করেছিলেন। আরেক প্রবীণ ব্যক্তি মোতালেব চৌধুরী বলেন, কলেজটিকে বাঁচাতে হলে একটি শক্তিশালী ম্যানেজিং কমিটি দরকার। সেই সঙ্গে একটি বড় আর্থিক তহবিল গঠন করা প্রয়োজন। 
জানা গেছে, গত সপ্তাহে কলেজের চার সদস্য বিশিষ্ট পরিচালনা পরিষদের অ্যাডহক কমিটির অনুমোদন দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অ্যাডহক কমিটির সভাপতি শ্রীনগর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম, পদাধিকার বলে অধ্যক্ষ রোজিনা আক্তার সদস্য সচিব, মো. আশরাফুল ইসলাম শিক্ষক প্রতিনিধি ও মৌসুমী বেগম অভিভাবক প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। গত সোমবার সকালে কলেজে এ কমিটির প্রথম সভা হয়। অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে কমিটির সদস্যরা ছাড়াও সভায় স্থানীয় প্রবীণ শিক্ষানুরাগী আবদুল লতিফ খান, মোতালেব হোসেন চৌধুরী, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত উইং কমান্ডার (অব.) এম হামিদুল্লাহ খান বীরপ্রতীকের ছেলে তারিক হামিদ খান, পুত্রবধূ রাইকা খান, ভাতিজা আরিফ খান, মেদিনী মণ্ডল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি গোলাম গাউস প্রমুখ অংশগ্রহণ করেন। 

সভা শেষে অ্যাডহক কমিটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম জানান, কলেজটিকে বাঁচাতে সভায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, ধনী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সহায়তা কামনায় তালিকা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরে তাদের নিয়ে বসে একটি অর্থ তহবিল গঠন করা হবে। কারণ, কলেজটির জন্য সর্বাগ্রে একটি আর্থিক তহবিল গঠন জরুরি। তখন ভালো ভালো শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা এ কলেজে ভর্তি হবে।
বিশিষ্ট সংগঠক নাছির উদ্দিন আহমেদ জুয়েল বলেন, লৌহজং উপজেলা একটি ধনী এলাকা। এলাকার গণ্যমান্য ও ধনী ব্যক্তিদের দ্বারস্থ হয়ে কলেজটিকে রক্ষা করতে হবে। 

আরও পড়ুন

×