চিংড়ি চাষে এবার বড় ক্ষতির মুখে চাষিরা
.
মাহমুদুর রহমান মাহমুদ, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৪ | আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:২৮
চকরিয়ার উপকূলীয় এলাকায় বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে পরিচিত চিংড়ি খাত চলতি মৌসুমে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। বৈরী আবহাওয়ায় উৎপাদন ব্যাপক কমে যাওয়ায় বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন চাষিরা।
চকরিয়ার চিংড়ি চাষিরা জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে প্রকৃতি খুবই বৈরী আচরণ করেছে। তেমন বৃষ্টি হয়নি, গরম ছিল বেশি। বন্যাও হয়নি। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে চিংড়ি ঘেরে কয়েক দফা মড়ক দেখা দেয়। এছাড়া প্রবহমান খাল বন্ধ ও ঘেরের কম গভীরতার কারণেও উৎপাদন কমে গেছে। প্যারাবন নিধন ও অবৈধভাবে প্রবহমান খাল দখল করে চিংড়ি চাষ করার কারণে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
চকরিয়া মৎস্য দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৮২৮টি ঘেরে ৮ হাজার ৪২০ টন, ২০২৩ সালে ৭ হাজার ৪৪৭টি ঘেরে ৯ হাজার ২১৬ টন, ২০২৪ সালে ৭ হাজার ৭৬৪টি ঘেরে ৯ হাজার ৫১৬ টন চিংড়ি ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ উৎপাদন হয়। চলতি মৌসুমে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। মৌসুম শেষ হতে বাকি আর দেড় মাস।
চকরিয়ায় ৯ হাজার ৫৮৯টি মৎস্য খামার নিবন্ধিত রয়েছে। এসব খামারের চিংড়িসহ অন্যান্য মাছের উৎপাদন বৈরী আবহাওয়া ও ঘেরের নির্ধারিত পরিমাণ গভীরতা না থাকায় উৎপাদন কমে গেছে।
চকরিয়া উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল আমিন বলেন, ‘চিংড়ি উৎপাদন কমার মূল কারণ প্রকৃতির বৈরী আচরণ, প্রবহমান খাল বন্ধ এবং পোনা সংকট। এ ছাড়া চাষিরা চিংড়ি ঘেরের যথাযথ গভীরতা বজায় রাখেন না। চলতি মৌসুমে আমরা রামপুর মৌজায় টেকসই বেড়িবাঁধ এবং জোয়ার-ভাটার পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে স্লুইসগেট নির্মাণ ও ঘেরের বাইরে বেড়িবাঁধে প্যারাবন সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছি; যা সম্পন্ন হওয়ার পথে। এছাড়া চিংড়ি ঘের এলাকার প্রবহমান খালের দুপাশে প্যারাবন সৃষ্টির মাধ্যমে চিংড়ি চাষের পরিবেশ ফিরিয়ে আনার জন্যও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’
বড় লোকসানের শঙ্কায় চাষিরা
প্রতি বছরের মতো উপজেলার চিরিঙ্গা ইউনিয়নের চরণদ্বীপ, সাহারবিল ইউনিয়নের রামপুর, ডুলাহাজারা ও খুটাখালী ইউনিয়নের বহলতলী, বদরখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা ও কোনাখালী ইউনিয়নের অন্তত ১৮ হাজার ৪৪৪ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হলেও উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
সূত্র মতে, ২০০৫ সালে উপজেলার চিংড়ি জোন এলাকায় ১৮ হাজার ৪৪৪ হেক্টর জমিতে প্রায় ৯ হাজার ৫০৬ টন চিংড়ি উৎপাদন হতো, সেখানে বর্তমানে তা ৪ হাজার টনে এসে দাঁড়িয়েছে।
রামপুর এলাকার চিংড়ি চাষি নজরুল ইসলাম ও চিরিংগা ইউনিয়নের বুড়িপুকুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল হামিদ পালাকাটা জানান, এক সময় প্রতি হেক্টর চিংড়ির জমিতে ৫০০ কেজি চিংড়ি উৎপাদন হতো, যা বর্তমানে ২০০ কেজির নিচে নেমে এসেছে। ফলে বেশির ভাগ ঘের মালিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আব্দুল হামিদ পালাকাটা জানান, মৌসুম শেষের পথে অথচ তিনি তাঁর বিনিয়োগের ৭০ ভাগ অর্থ ওঠাতে পেরেছেন।
বহালতলী মৌজার চিংড়ি চাষি মিজবাহ উদ্দিন বলেন, চিংড়ি ঘেরের ওপর দিয়ে প্রবহমান প্রায় ১১টি খাল অবৈধ দখলদারেরা দখল করে পানি চলাচল বন্ধ করে মাছ চাষ করছে। ফলে জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল বন্ধ হয়ে চিংড়ি ঘেরে প্রয়োজনীয় লবণাক্ত পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে চিংড়ি চাষ প্রচণ্ডভাবে ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে প্যারাবন নিধন করে অনেক চিংড়ি ঘের সম্প্রসারণ করার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চকরিয়া পরিবেশ সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এম. মনছুর আলম রানা জানান, একসময় চকরিয়ায় সুন্দরবনের চিংড়িসহ অন্যান্য মাছ উৎপাদনের চমৎকার পরিবেশ ছিল। বর্তমানে তা নেই। বেশির ভাগ প্যারাবন নিধন হয়ে গেছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে চিংড়ি ও মাছ উৎপাদন আরও কমে যাবে। তবে ইদানীং কিছু কিছু এলাকায় প্যারাবন সৃষ্টির কাজ চলছে।
চকরিয়ার বড় চিংড়ি চাষি সাহারবিল ইউনিয়নের কোরালখালী গ্রামের আবু তৈয়ব জানান, চলতি বছর প্রায় ১ হাজার একর জমিতে চিংড়ি চাষ করেছেন। বিনিয়োগ করেছেন প্রায় ১ কোটি টাকা। চিংড়ি ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ বিক্রি করেছেন এ পর্যন্ত ৭০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ টাকার। এতে তাঁকে বিশাল ক্ষতির বোঝা বহন করতে হবে। তবে মৌসুম শেষ হতে আরও দেড় মাস সময় রয়েছে। কিছু চিংড়ি ও অন্যান্য প্রজাতির মাছ উৎপাদন হলে হয়তো ক্ষতির পরিমাণ কমে আসবে। গত মৌসুমে তিনি কোটি টাকার বেশি দামের মাছ উৎপাদন করেছিলেন।
আবু তৈয়ব আরও জানান, চলতি বছর অনাবৃষ্টির কারণে লবণাক্ততা বেড়ে ঘেরগুলোতে তিন দফা মড়ক দেখা দেয়। আবার কোনো কোনো সময় অতি বর্ষণ হলে ঘেরের পানিতে লবণাক্ততা কমেও চিংড়িতে মড়ক দেখা দেয়। চলতি মৌসুমে বড় বন্যা হয়নি। ফলে ঘেরের পানিতে অতিরিক্ত গরমের কারণে চিংড়িতে মড়ক দেখা দিয়েছে।
সাহারবিল ইউনিয়নের রামপুর এলাকার চিংড়ি চাষি নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, তিনি ২০০ একর জমিতে চিংড়ি চাষ করে মৌসুম শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১০ লাখ টাকার মাছ পেয়েছেন। এরমধ্যে চিংড়ি ২০০ কেজির বেশি হবে না। তিনি দাবি করেন, গত মৌসুমে লবণের ন্যায্যমূল্যও পাননি। চলতি মাছ মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিনিয়োগ করা পুঁজি ওঠানো সম্ভব হবে না। তিনি এ পরিমাণ জমিতে চিংড়ি চাষাবাদ করে অন্যান্য বছর ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা আয় করতেন।
চিংড়ি চাষের অতীত ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন চকরিয়ার রামপুর এলাকার চিংড়ি ঘেরমালিক মাস্টার আব্দুস সোবহান। চিংড়ি ঘের এলাকায় উৎপাদন বাড়ানোর যথাযথ পদক্ষেপ, আইনশৃঙ্খলা উন্নতি ও চাঁদাবাজি বন্ধের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুর রহমান। চিংড়ি ঘের এলাকায় প্রতি জো-তে চাঁদাবাজি ও ডাকাতের তাণ্ডব বন্ধের মাধ্যমে এ খাতে সুদিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন চাষিরা।
আইনশৃঙ্খলার বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে চকরিয়া থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার জানান, তিনি এ থানায় নতুন। চাষিদের অভিযোগ পেলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া চিংড়ি ঘের এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় পুলিশের পক্ষে নিয়মিত টহল দেওয়া কষ্টকর বলে জানান একাধিক পুলিশ সদস্য।
- বিষয় :
- চিংড়ি
