ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভুয়া রসিদে গৃহকরের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ

ভুয়া রসিদে গৃহকরের লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ
×

কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৭:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘদিন ধরে ভুয়া রসিদ বই ছাপিয়ে গাজীপুরের কাপাসিয়ার তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের কর আদায়কারীরা লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি জানাজানি হলে তাদের কাছ থেকে ওই ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা গত বুধবার এক বস্তা ভুয়া রসিদ বই জব্দ করেন।

তবে রহস্যজনকভাবে ওইদিন কর আদায়কারী চারজনকে আটক না করে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। এর পর গত পাঁচ দিনেও এ বিষয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। অভিযোগ উঠেছে, চক্রটির সঙ্গে ওই ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও কয়েকজন ইউপি সদস্য যুক্ত রয়েছেন। আত্মসাতের ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর সেটি ধামাচাপা দিতে অন্য ইউপি সদস্যদের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি জানতে পেরে গতকাল সোমবার বিকেলে তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয় পরিদর্শনে যান গাজীপুরের স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক আহাম্মদ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি সমকালকে বলেন, কর আদায়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা চার ব্যক্তির নিয়োগ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র কিংবা রেজ্যুলেশন তিনি ইউনিয়ন পরিষদে তল্লাশি করে পাননি। তিনি আরও বলেন, করের টাকা আত্মসাতের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এ ঘটনার সঙ্গে একাধিক ব্যক্তির সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা হবে।
জানা যায়, উপজেলার ৮ নম্বর তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের আওতাধীন ১৩-১৪টি গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দাদের বাড়ি থেকে হোল্ডিং ট্যাক্স (গৃহকর) হিসেবে বার্ষিক বিভিন্ন পরিমাণ টাকা আদায় করা হয়। বাসিন্দাদের বসতবাড়ির অবকাঠামোর ধরন ও তারতম্যের ভিত্তিতে ১০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত এই কর ধার্য করা হয়ে থাকে। অন্যান্য ইউনিয়নে এ কর আদায়ের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্য থেকে জনবল নিয়োগ করা হলেও সম্প্রতি তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদে নীলফামারী ও রংপুরের চার যুবককে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তারা হলেন– নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মেলাবর গ্রামের রবীন্দ্রনাথ রায়ের ছেলে প্রদীপ কুমার রায়, একই উপজেলার পাড়াগ্রামের সুলতান আলীর ছেলে জুনায়েত আলী, দুলাল মিয়ার ছেলে সোহেল ইসলাম ও রংপুর সদরের উত্তর খলেয়ার আনোয়ার হোসেনের ছেলে সোরাব মিয়া। অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল তাদের মোবাইল ফোনে কল দিলে তা বন্ধ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা জানান, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এই চারজন কর আদায়ের কাজ করছিলেন।
তরগাঁও ইউনিয়নের মৈশন গ্রামের রুপজু মিয়া জানান, কর আদায়কারীরা স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের রসিদ দিয়ে নির্ধারিত হারে টাকা আদায় করায় তারা কোনো সন্দেহ করেননি। পরে তারা ইউনিয়ন পরিষদে সংরক্ষিত কাগজপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে জানতে পারেন, বাসিন্দাদের কাছ থেকে কর আদায় করে যে রসিদ দেওয়া হচ্ছে সেটি নকল। বাড়ির মালিকদের এক হাজার কিংবা ৫০০ টাকা অথবা ৩০০ টাকা আদায়ের নকল রসিদ দেওয়া  হতো। পরে আসল রসিদ বইয়ের মুড়ি চেকে ১০০ বা ১৫০ টাকা লিখে ইউনিয়ন পরিষদে জমা দেওয়া হতো। 

এ বিষয়ে তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আলমগীর হোসেন জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আয়ুবুর রহমান শিকদার পলাতক। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা রুহুল আমীনকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে দীর্ঘদিন কর আদায় বন্ধ থাকায় ওই চারজনকে তিনি কর আদায়ের জন্য নিয়োগ দেন। তাদের ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে ৩০টি রসিদ বই বুঝিয়ে দেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে হিসাব বুঝে নেওয়ার জন্য ইউপি সদস্যদের মধ্য থেকে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি ওই কর আদায়কারীরা আসল বইয়ের মতো করে নকল রসিদ বই ছাপিয়ে বাসিন্দাদের কাছ থেকে কর আদায় করছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই চারজন ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দোতলায় থাকতেন। গত বুধবার কয়েকজন ইউপি সদস্য সেখানে অভিযান চালিয়ে এক বস্তা নকল রসিদ বই উদ্ধার করেন। পরে তাদের কাছে হস্তান্তর করা ৩০টি বই ফেরত নেওয়া হয়। এ ঘটনা জানাজানি হলে ওই চারজন পালিয়ে যান। এক প্রশ্নের জবাবে ইউনিয়ন পরিষদের সচিব আলমগীর হোসেন বলেন, ওই চক্রের সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ঘটনার দিন তাদের আটক করা হলো না কেন? জানতে চাইলে কোনো ইউপি সদস্যই স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

করের অর্থ বুঝে নেওয়ার জন্য গঠিত কমিটির একজন ওই ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য পারুল আক্তার। তিনি জানান, কর আদায়কারীদের কাছ থেকে পাওয়া রসিদ বইগুলোর তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকা আদায়ের হিসাব পাওয়া গেছে। এর বাইরে ভুয়া রসিদের মাধ্যমে কত টাকা তারা হাতিয়ে নিয়েছে, তা অনুমান করা সম্ভব নয়। 
এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও তরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক রুহুল আমীন জানান, ওই চার ব্যক্তি আগের চেয়ারম্যানের আমলে নিয়োগ পেয়ে কর্মরত ছিল। গত বছরের ৫ আগস্টের পর তারা পলাতক ছিলেন। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন কর আদায় বন্ধ থাকায় তাদের আবারও সেই দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়। করের টাকা আত্মসাতের ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গেই ইউপি সচিবকে তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।

কাপাসিয়ার ইউএনও তামান্না তাস্‌নীম বলেন,  অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কমিটি করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×