ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

পশু জবাইয়ে মানা হচ্ছে না বিধিবিধান

পশু জবাইয়ে মানা হচ্ছে না বিধিবিধান
×

কসাইখানার চারপাশে ময়লা-আবর্জনা। এ রকম অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই পশু জবাই করা হয়। মঙ্গলবার রাজবাড়ী বাজারের কসাইখানায় সমকাল

সৌমিত্র শীল চন্দন, রাজবাড়ী

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবাড়ী বাজারে নোংরা পরিবেশে জবাই করা হচ্ছে খাসি। এখানে খাসি জবাইয়ের জন্য কসাইখানা থাকলেও গরু জবাইয়ের ব্যবস্থা নেই। মাংস ব্যবসায়ীরা বাড়িতেই গরু জবাই করে থাকেন। এসব পশু জবাইয়ের আগে স্বাস্থ্য পরীক্ষাও করা হয় না। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

খাসির মাংস বিক্রেতা আফজাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কসাইখানার আশপাশের আবর্জনা দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা হয় না। তাদের বর্জ্য ফেলার কোনো জায়গা নেই। বাধ্য হয়ে কসাইখানার আশপাশে ফেলতে হয়। চারপাশে আবর্জনায় এমন হয়েছে চলার মতো অবস্থা নেই।

তাঁর কথাতেই রাজবাড়ী বাজারের কসাইখানার পরিবেশ সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন ধরে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে করা হয় পশু জবাই। খাসি জবাইয়ের জন্য একটি কসাইখানা থাকলেও গরু জবাইয়ের জন্য তাও নেই। ব্যবসায়ীরা নিজ বাড়িতে করেন গরু জবাই; যা পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইনের পরিপন্থি। অন্যদিকে ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে না। সম্প্রতি দেশে অ্যানথ্রাক্স ধরা পড়ায় এভাবে পশু জবাই নিয়ে ভোক্তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাজবাড়ী বাজারে মাংস, মাছ ও মুরগির দোকানগুলো একই জায়গায়। এখানে আছেন ১৪ জন খাসির মাংস বিক্রেতা এবং ১৬ জন গরুর। মাংসের দোকান থেকে কসাইখানার দূরত্ব প্রায় ১০০ গজ। গত মঙ্গলবার সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কসাইখানার পূর্ব পাশ দিয়ে যে রাস্তাটি আছে তার পাশে আবর্জনার স্তূপ। পশ্চিম পাশে আবর্জনার এমন অবস্থা যেখানে পা ফেলার উপায় নেই। সেখানেই রয়েছে একটি নলকূপ। যেটি কসাইখানার পানি সরবরাহের একমাত্র উৎস। পশুর বর্জ্য ফেলার জায়গা নেই বলে কসাইখানার সামনেই ফেলা হয়। আবর্জনার গন্ধে যেমন দাঁড়ানো যায় না, তেমনি মশা-মাছির উপদ্রব। অথচ পশু জবাই ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, মাংস বিক্রির স্থানগুলো যেন স্বাস্থ্যকর থাকে।

গরু জবাইয়ের জন্য কসাইখানা না থাকায় মাংস বিক্রেতারা নিজেদের বাড়িতে কাজটি করছেন। এখানেও আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হচ্ছে। আইনে উল্লেখ রয়েছে, নিম্নবর্ণিত ক্ষেত্র ছাড়া, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা জবাইখানার বাইরে কোনো পশু জবাই করতে পারবেন না, (ক) ঈদুল আজহা, ঈদুল ফিতর বা অন্য কোনো ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং সরকারি প্রজ্ঞাপন দ্বারা ঘোষিত অন্য কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠান; (খ) পারিবারিক চাহিদার ভিত্তিতে পারিবারিক ভোজনের উদ্দেশ্যে।

এ ছাড়া দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে জবাইয়ের আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মাংসের মান নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। আইনে উল্লেখ রয়েছে–পশু জবাই, মাংস প্রক্রিয়াকরণ ও বিপণনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মী সংক্রামক অথবা ছোঁয়াচে রোগমুক্ত কিনা, তা চিকিৎসকের প্রত্যায়িত হতে হবে এবং চিকিৎসকের দেওয়া সনদপত্র জবাইখানা, মাংস বিক্রয় স্থাপনা, মাংস প্রক্রিয়াকরণ কারখানার মালিক, ব্যবস্থাপক বা অন্য কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি সংরক্ষণ করবেন এবং প্রয়োজনে ভেটেরিনারি কর্মকর্তা বা ভেটেরিনারিয়ানকে প্রদর্শন করতে বাধ্য থাকবেন।

গরুর মাংস বিক্রেতা নেকবার মণ্ডল জানান, তিনি ৪৫ বছর ধরে গরুর মাংস বিক্রি করছেন। এত বছরেও রাজবাড়ী বাজারে গরু জবাইয়ের জন্য একটি কসাইখানা করা হয়নি। বাধ্য হয়ে 
বাড়িতেই গরু জবাই করেন তারা। আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো। দীর্ঘদিন পরীক্ষার জন্য কেউ আসেন না।
খাসির মাংস বিক্রেতা আনিস সর্দার জানান, কসাইখানায় পানির ব্যবস্থা বলতে একটি নলকূপ। এটি দিয়েই তাদের পরিষ্কা-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে হয়। পশুর বর্জ্য বাইরে ফেলার জায়গা না থাকায় কসাইখানার পাশেই ফেলেন।

রাজবাড়ী পৌরসভার স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ইয়াসমীন আক্তারের ভাষ্য, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি তদারকি করে কনজারভেন্সি শাখা। পরে তিনি রাজবাড়ী পৌরসভার কনজারভেন্সি ইনস্ট্রাক্টর ছাবেদুল হককে ফোন ধরিয়ে দেন। তিনি বলেন, মাত্রই দুর্গাপূজা ও লক্ষ্মীপূজা গেছে। পরিচ্ছন্নতাকর্মী পাওয়া যাচ্ছে না। শিগগিরই এটি পরিষ্কার করা হবে। তিন বছর ধরে কেন পরিষ্কার করা হচ্ছে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পরিষ্কার করা হয়েছে কিন্তু সেটা আশানুরূপ হয়নি। আমরা তিন দিনের মধ্যে পরিষ্কার করে দেব।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা প্রকাশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, জবাই করার আগে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা বা মাংসের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ বিভাগ এককভাবে করবে বিষয়টি এমন নয়। স্থানীয় সরকার, পৌরসভা তাদেরও কর্মকর্তা থাকার কথা। পৌরসভা একজনকে দায়িত্ব দেবে। আমাদের কার্যপরিধির মধ্যে আছে আমরা মাঝে মধ্যে গিয়ে তদারকি করব। মাঝে মধ্যে গিয়ে আমরা দেখি। উপজেলা কার্যালয়কে এটি দেখতে বলা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আইন পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন ব্যাপার। সে ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারকে আগে উদ্যোগী হতে হবে। তারা যদি স্বাস্থ্যসম্মত একটি জবাইখানা করে দেয় তাহলে স্বাস্থ্যসম্মত মাংস সরবরাহ করা সম্ভব।

জেলা নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা আসিফুর রহমানের ভাষ্য, পশু জবাইয়ের আগে অবশ্যই স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা উচিত। ভাইরাসের বাইরেও অনেক ঝুঁকি থাকে। যেভাবে মাংসটা বিক্রি হয় অনেক সময় এটাও সঠিক নয়। কসাইখানার আশপাশে যে আবর্জনা সেটিও স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ক্ষতিকর। 
রাজবাড়ী পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক ড. মাহমুদুল হক বলেন, কসাইখানার চারপাশে নোংরা আবর্জনা পরিষ্কার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×