কাশখড় যাচ্ছে ভূমিদস্যুর হাতে অসহায় প্রকৃত জমির মালিক
সুন্দরগঞ্জের তিস্তার চরের কাশখড় সংগ্রহের পর নেওয়া হচ্ছে সংরক্ষণের জন্য। মওলানা ভাসানী সেতু এলাকার ছবি- সমকাল
এ মান্নান আকন্দ, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
প্রকাশ: ২৬ অক্টোবর ২০২৫ | ০৭:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার মানুষের জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে এক আশীর্বাদের নাম তিস্তার বালুচর। এই চরে প্রতি শরৎকালে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে অবারিত কাশবন। যা স্থানীয় অনেকের জীবনমান বদলে দিয়েছে। ভূমিদস্যুদের কারণে প্রকৃত জমির মালিকরা এই সুবিধা আদায় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয়রা জানান, প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাশফুলের জন্য আলাদাভাবে কোনো শ্রমই দিতে হয় না তাদের। বনের কাশখড় বিক্রি করে তাদের অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বিশেষ করে চরবাসীর একাংশ এখান থেকে প্রতিবছর যে উপার্জন করেন, তা পরবর্তী সময়ে চাষাবাদ বা ব্যবসার কাজে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করেন। চরে বসবাসকারী দুই-তিনটি গোষ্ঠীর কারণে অনেক প্রকৃত জমির মালিক নিজ জমির কাশখড় সংগ্রহ করতে পারছেন না। এসব গোষ্ঠীর সদস্যরা তাদের জমির কাশখড় তুলে নিয়ে বিক্রি করে দেন। আবার জমি দখলে রেখে চাষাবাদও করেন।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চণ্ডিপুর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত তিস্তা নদীর বিভিন্ন চরে বেড়ে ওঠা এই কাশখড় এখন আমদানি করা হচ্ছে জেলার বাইরে রাজশাহী ও বরিশালে। অনেকে চরের নিজস্ব জমির মালিকানা দাবি করে আবার কেউ কেউ গায়ের জোরে প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃতির এই দান তুলে নিচ্ছে নিজের করে। এ নিয়ে প্রতিনিয়ত চরে ভূমিদস্যুদের সঙ্গে প্রকৃত জমির মালিকাদের বিরোধ চলছেই। প্রশাসনের চেষ্টা থাকলেও নানা সীমাবদ্ধতায় দুর্গম চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা উন্নত রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের।
এই অঞ্চলের আলোচিত চর এলাকা কাপাসিয়া ইউনিয়নের মিন্টু মিয়ার চরের জমির মালিক রাশিদুল ইসলাম বলেন, গত ৫ বছর হলো ওই চরে তাদের ১০০ বিঘা জমি জেগে উঠেছে। তখন থেকে চরের ভূমিদস্যুরা তাদের জমি দখলে রেখেছে। সেখান থেকে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাশখড় বিক্রি করে দিচ্ছে তারা। জমির মালিক হয়েও সেটা তারা পাচ্ছেন না। এ ছাড়া ওই জমি দখলে রেখে তরমুজ, বাদাম এবং কুমড়া চাষ করে বছরজুড়ে লাখ লাখ টাকা আয় করছেন মিন্টু মিয়ার অনুসারীরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিন্টু ও মঞ্জু নামে দুজনের পরিবার ও অনুসারীরা এই চরাঞ্চলে সবচেয়ে প্রভাবশালী। তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এখানকার অধিকাংশ জমিজমা। রাশিদুলের মতো অনেকের জমিই তাদের আয়ত্তে রয়েছে। এলাকায় না থাকায় এ ব্যাপারে মিন্টু বা মঞ্জুর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
রাশিদুলের মতো একই দাবি করেছেন কাপাসিয়ার বাদামের চরের আনছার আলী। তিনি বলেন, বালুচরের জমিতে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কাশখড় বিক্রি করে এখন অনেকে স্বাবলম্বী। প্রতি বিঘা জমির কাশখড় বিক্রি হচ্ছে এক থেকে দুই হাজার টাকায়। ব্যবসায়ীরা এসব কাশখড় কিনে নিয়ে জেলার বাইরে রাজশাহী ও বরিশালে রপ্তানি করছেন। প্রকৃত জমির মালিকরা ভূমিদস্যুদের কারণে এ আয় থেকে বঞ্চিত।
হরিপুর ইউনিয়নের কাশখড় ব্যবসায়ী মাহবুর রহমান বলেন, চরের খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রতি বিঘা জমির কাশখড় তাঁর কাছে দুই থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি করেন। সেই খড় তিনি ট্রাকে করে রাজশাহী ও বরিশালে পাঠান। এক ট্রাক কাশখড় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ভাড়া বাবদ খরচ হয় ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। সে হিসেবে প্রতি ট্রাকে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা লাভ হয়।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মঞ্জু মিয়া বলেন, বিনাচাষে তিস্তার চরে বেড়ে ওঠা কাশখড় বিক্রি করে এখন অনেকেই ভালো উপার্জন করছেন। কাশখড় যেন চরবাসীর জন্য আশীর্বাদ। ২৫ থেকে ৩৫ বছর আগে তিস্তা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়া অনেক জমি-জমা এখন জেগে উঠেছে। সেই সব চরে এখন কাশফুলসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হচ্ছে। জমি হারানো পরিবারগুলো তাদের বাপ-দাদার ভিটামাটি সহসাই ফিরে পাচ্ছে না। সে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে করতে জমির দখল চলে যাচ্ছে ভূমি দস্যুদের হাতে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল কবির বলেন, কাশফুলের খড় চরবাসীর উপার্জনের মোক্ষম উৎস। এসব কাশখড় পানের বরজ, ঘরের ছাউনি এবং বিনোদন কেন্দ্রের গোলঘরে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কাশফুল দিয়ে ঝাড়ু তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট থানার ওসি মো. আব্দুল হাকিম আজাদ বলেন, মাঝেমধ্যে চরের জমি-জমা নিয়ে বিরোধের অভিযোগ পাওয়া যায়। দুর্গম চরাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের জন্য অত্যন্ত দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও সাধ্যমতো চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
ইউএনও রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, চরের জমি-জমা নিয়ে অনেক জটিলতা রয়েছে। অনেকের জমি খাস খতিয়ানে চলে গেছে। তাছাড়া প্রকৃত মালিকানা নিয়ে বিরোধ রয়েছে। তারপরও অভিযোগ আমলে নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
- বিষয় :
- ভূমিদস্যু
