ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ঐতিহ্যবাহী মুক্তমঞ্চ ভাঙায় ক্ষুব্ধ পৌরবাসী, শিল্পীরা

ঐতিহ্যবাহী মুক্তমঞ্চ ভাঙায়  ক্ষুব্ধ পৌরবাসী, শিল্পীরা
×

সুনামগঞ্জ পৌরসভা প্রাঙ্গণের সামনের খোলা অংশে ছিল মুক্তমঞ্চটি; যা সম্প্রতি সড়ক সংস্কারের নামে ভেঙে ফেলা হয়েছে সমকাল

 সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জ পৌরসভা প্রাঙ্গণের সামনের খোলা অংশ। যেটি মূলত সড়ক নয়। অথচ সেটিকেই সড়ক দাবি করে তা সংস্কারের নামে ভেঙে ফেলা হয়েছে পৌর অঙ্গনে স্থাপিত কালের সাক্ষী ঐতিহ্যবাহী মুক্তমঞ্চটি। এ নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

জানা যায়, পৌরসভার সামনের মূল ফটকে সংস্কারের কাজ চলছে। চারদিক প্রাচীরে ঘেরা থাকায় ভেতরটা সহজে নজরে আসে না বাইরে থেকে। এই কাজের সঙ্গেই ভেঙে ফেলা হয় মুক্তমঞ্চটি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিষয়টি চোখের আড়ালে রাখতেই এমন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে মুক্তমঞ্চ ভাঙার জন্য। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা বন্ধের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে একটি গোষ্ঠী। সেই একই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ কিনা, খতিয়ে দেখা উচিত।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আরও আগেই সেখানকার মঞ্চ ভেঙে ফেলা হয়েছে। সম্প্রতি মানুষের নজরে পড়লে তা নিয়ে শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।     
১৯৯৮ সালের দিকে সুনামগঞ্জ পৌরসভার সামনে করা হয়েছিল পৌর মুক্তমঞ্চ। পৌর ভবনের ডিজাইনের সঙ্গে মিলিয়ে এটা করা হয়েছিল। এখানে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চাসহ পৌরবাসী বহু নাগরিক সভাও করেছেন। পৌর এলাকার মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এই মঞ্চ শুধু ইট-সিমেন্টের স্থাপনা নয়। একটি আবেগের স্মৃতিস্তম্ভ। সেখানে একজন মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে, যার মতো প্রান্তিক মানুষের প্রাণের মুক্তমনা জনপ্রতিনিধি আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না। তিনি মরমি কবি হাসন রাজার প্রপৌত্র, তিনবারের নির্বাচিত পৌর মেয়র প্রয়াত কবি মমিনুল মউজদীন। মূলত তাঁর চাওয়া থেকেই করা হয়েছিল এই মঞ্চ। স্থানীয়দের শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিচর্চার এক অনন্য পটভূমি এখানে গড়ে ওঠে। প্রয়াত সেই সুহৃদ এবং সময়ের সঙ্গে বহু স্মৃতি আর ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে উঠেছিল মুক্তমঞ্চটি। এটি ভেঙে ফেলার ঘটনায় নানা প্রশ্ন করছেন এলাকাবাসী। হঠাৎ কোন সড়ক সম্প্রসারণে এটি ভাঙা হলো– জানতে চাচ্ছেন অনেকেই।

স্থানীয় সাংবাদিক সাঈদুর রহমান আসাদ বলেন, প্রয়াত মমিনুল মউজদীনের চিন্তা থেকেই মঞ্চটির সৃষ্টি। সেখানে মুক্তমনা মানুষেরা সৃজনশীলতার চর্চা করবেন; বলবেন মানুষের কথা। তিনি সড়কবাতি নিভিয়ে পৌরবাসীকে আহ্বান জানাতেন পূর্ণিমা উপভোগের।

স্থানীয় শিল্পীরা বলেন, এই মুক্তমঞ্চে আয়োজন করা হতো নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। সবার প্রাণের জায়গা ছিল পৌরসভার সামনের মুক্তমঞ্চটি। উন্নয়নের নামে আসলে সংস্কৃতির এই মোর্চার ঐতিহ্য মুছে দেওয়া হয়েছে। 
থিয়েটার একুশের সভাপতি পল্লব ভট্টাচার্য্য জানান, এই মঞ্চে প্রচুর পথনাটক করেছেন তারা। মুক্তমঞ্চটি পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্র ছিল। এটি ভাঙার পর সমাজ থেকে মুক্তমনাদের বিতাড়ন প্রক্রিয়া শুরু হবে কিনা– ক্ষোভের সঙ্গে জানতে চেয়েছেন তারা।

একতা নাট্য সংস্থার সভাপতি গৌতম কুমার কর (তপন) বলেন, শিল্পকলার মতো কোনো অডিটরিয়াম ছিল না শহরে। এই মঞ্চই ছিল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার পটভূমি। কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তে মর্মাহত।
বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বেশ পুরোনো পৌরসভার সামনের এই মুক্তমঞ্চটি। এখানে নিয়মিত আয়োজিত হতো পথনাটক, রাজনৈতিক সমাবেশসহ জাতীয় দিবসের নানা অনুষ্ঠান। মনে হচ্ছে, নতুন প্রজন্মের সামনে থেকে এমন কিছু সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা থাকা খুব দরকার ছিল। শিল্পমনা মানুষ উগ্রবাদবিরোধী হয়।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পৌর কর্তৃপক্ষ বার বার এর কারণ ব্যাখ্যার চেয়ে নতুন একটি করা হবে, সেদিকে বেশি গুরুত্ব দেন। পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কালীকৃষ্ণ পাল বলেন, রাস্তা প্রশস্ত করায় মুক্তমঞ্চের সামনের জায়গা কমে গেছে। 

আরও পড়ুন

×