অঙ্কন
নবনূরের রংতুলির অন্যরকম আলো
শিল্পী নবনূর আলীর চিত্রকর্ম (ইনসেটে) নবনূর আলী -সংগৃহীত
স্বপন চৌধুরী, রংপুর
প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৮:১৯ | আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রংপুরের চিত্রশিল্পী নবনূর আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় শখের বশে রংতুলি নিয়ে সময় কাটাতেন। জীবনের প্রয়োজনে সেই ছবি আঁকাকেই এখন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
আজকের আধুনিক যুগে হাতে আঁকা পোস্টার-ব্যানারের চিন্তা কারও মাথায় আসে না। সব ডিজিটাল হয়ে গেলেও নবনূর আলীর আঁকা ছবির কদর কমেনি, বরং বেড়েছে। বিশেষ করে দেয়াল লিখন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছবি আঁকার ক্ষেত্রে রংপুরে তাঁর বিকল্প নেই। ক্রমে সারাদেশে ছবি বেচার দোকানগুলোতেও তাঁর আঁকা চিত্রের চাহিদা রয়েছে।
৬৫ বছর বয়সেও নবনূর আলী সমানতালে ছবি এঁকে চলেছেন। নগরীর নিউ জুম্মাপাড়া এলাকায় তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম ‘নবনূর আর্ট’। তিনি জানান, একসময় রংপুর শহরে অনেক আর্টের দোকান ছিল। হাতে আঁকা পোস্টার-ব্যানার তখন অপরিহার্য ছিল। যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে অনেক শিল্পী পেশা বদলেছেন। কিন্তু তিনি শখের বশে শুরু করা এই আঁকাআঁকির মায়া ত্যাগ করতে পারেননি।
রংপুর নগরীর পায়রা চত্বরের মানচিত্রের (চিত্রকর্ম বিক্রেতা) মালিক নূর মোহাম্মদ বলেন, আর্টের দোকানগুলোর পাশাপাশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নবনূরের আঁকা চিত্রগুলোর চাহিদা রয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, মনের মাধুরী মিশিয়ে নবনূর রংতুলিতে প্রতিটি ছবি আঁকেন। তাঁর আঁকা ছবি সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়। হুবহু যে কোনো কিছু এঁকে দিতে পারেন তিনি। নবনূরের কাছে এখন দেশের বিভিন্ন এলাকা এমনকি দেশের বাইরে থেকেও ছবির অর্ডার আসে। এরই মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তাঁর চিত্রকর্ম সরবরাহ করা হয়েছে। ইংল্যান্ড, ভারত, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে তিনি একাধিক চিত্রকর্ম পাঠিয়েছেন।
প্রতিবেশী ব্যবসায়ী এনামুল হক নিশ্চিত করেন, নবনূর একজন ভালো শিল্পী। তাঁর কাছে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ কাজ করাতে আসেন। এখন বিদেশেও তাঁর ছবির চাহিদা বাড়ছে।
এলাকার কলেজ শিক্ষার্থী হামিদুর রহমান জানান, হাতে এত সুন্দর ছবি আঁকা যায়, না দেখলে বোঝা কঠিন।
সংগ্রামের গল্প ও ডিজিটাল চ্যালেঞ্জ
নবনূর জানান, আঁকাআঁকি তাঁর কাছে নেশার মতো। অন্য কিছুতে তাঁর মন টেকে না। এই নেশার কারণে পরিবার ও অনেকের কাছ থেকে তাঁকে নানা কথা শুনতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনও আঁকা ছাড়েননি। পড়াশোনা ভালো না লাগায় তিনি এসএসসির আগেই স্কুল ছেড়ে দেন।
প্রথমদিকে ব্যানার, পোস্টার লিখতেন। দেয়ালে ছবি আঁকতেন। দ্রুত তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। রংপুর শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থানও অর্জন করেন। কিন্তু ডিজিটাল পদ্ধতি আসার পর তাঁর মতো অনেক শিল্পীর কাজ কমে গেছে।
নবনূর বলেন, শখের বশে আঁকা চিত্রগুলো ফেসবুকে দিলে প্রথম দিকে মানুষ প্রশংসা করত। একদিন হঠাৎ অনলাইন থেকে অর্ডার আসে। সেই থেকে শুরু। এখন দেশ-বিদেশ থেকে সরাসরি অনলাইনে অর্ডার পান তিনি।
এই শিল্পী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘আঁকার প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম বেড়েছে। ছবির দাম সেই তুলনায় বাড়েনি। এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের উচিত এখনই কর্মসংস্থান সৃষ্টি বা বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া। তা না হলে ভবিষ্যতে ভালো কোনো শিল্পী পাওয়া যাবে না।’
- বিষয় :
- শিল্পী
