২৮ কোটি টাকা ব্যয়েও হতশ্রী ঘাঘট লেক
সড়ক ভাঙা। বসার বেঞ্চ, শিশুদের দোলনা উধাও। আবর্জনায় পানির স্বাভাবিক রং হারিয়ে কালো হয়ে গেছে। ছড়াচ্ছে উৎকট গন্ধ। গাইবান্ধার ঘাঘট লেক সমকাল
মাসুম লুমেন, গাইবান্ধা
প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:০১
| প্রিন্ট সংস্করণ
গাইবান্ধা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঘাঘট লেক একসময় ময়লা-আবর্জনায় ভর্তি ছিল। সেই লেকের উন্নয়নে নেওয়া হয় ২৮ কোটি টাকার প্রকল্প। নির্মাণ হয় দৃষ্টিনন্দন সেতু, পাকা সিঁড়ি, চলাচলের রাস্তা। পথচারীদের বসার জন্য বেঞ্চ। এরপর নানা জটিলতায় বন্ধ হয়ে যায় কাজ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে পরিবেশের আরও অবনতি হয়েছে। ঘাঘট লেক নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন এলাকাবাসী, তা অপূর্ণই রয়ে গেছে। উল্টো পরিত্যক্ত লেকটি পৌরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে কাজ শেষ না হওয়ায় লেক বুঝে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। ঠিকাদারকে ঠিকই বিল পরিশোধ করেছে এলজিইডি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়নি। দুই পাড়ে গড়ে ওঠা শহর, বাজার ও বাসাবাড়ির ময়লা, অপচনীয় পলিথিন, প্লাস্টিক, ককশিটসহ বিষাক্ত বর্জ্য আগের মতোই লেকে ফেলা হচ্ছে। এতে বিষাক্ত হয়ে উঠছে আশপাশের পরিবেশ। দখল হয়ে যাচ্ছে লেক ও উপরিভাগের কিছু অংশ। উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নামে এমন অনিয়ম-দুর্নীতির তদন্ত ও দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ চান পৌরবাসী।
২০১৭-১৮ অর্থবছরে প্রায় ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ঘাঘট লেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। কাজ পায় রংপুরের প্রতিষ্ঠান খাইরুল কবির রানা ট্রেডার্স। ওই বছরই ছয় কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের লেকে পার্কের নির্মাণকাজ শুরু হয়। এর মধ্যে চার কিলোমিটার অংশে দুটি সেতু, চারটি সিঁড়ি (ঘাটলা), দুই পাশে ১ হাজার ১০৬ মিটার পাকা রাস্তা, একটি ওয়াশ ব্লক, ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার তীর সংরক্ষণ কাজ, ৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার ফুটপাত, তিন ভেন্টের একটি ও এক ভেন্টের একটি স্লুইসগেট, দুই পাশে ২০টি বসার বেঞ্চ ও দুটি ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হয়। বাকি প্রায় দুই কিলোমিটার অংশের কাজ দখল-উচ্ছেদ না হওয়ায় সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সালের জুন মাসে কাজের মেয়াদ শেষ হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, লেকে চলাচলের জন্য কোথাও সামান্য রাস্তা, কোথাও একেবারেই নেই। দুই বছরেই সিঁড়িগুলোতে শ্যাওলা জমেছে। শহর, বাজার ও বাসাবাড়ির ময়লা, পলিথিন, প্লাস্টিক, ককশিটসহ বিষাক্ত বর্জ্যে ভরে আছে লেক। সেই সঙ্গে রয়েছে কচুরিপানা। সেখানে বাসা বেঁধেছে মশা। উৎকট গন্ধের কারণে নাক চেপে চলতে হয়। বেঞ্চগুলোও নষ্ট হওয়ার পথে। দোলনাসহ সব খেলনা চুরি হয়ে গেছে। বাতি ও সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় সন্ধ্যা হলেই মাদকসেবীর আড্ডা বসে। লেকের একটি বিরাট অংশে রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি। এতে যাতায়াতেও সমস্যা হয়।
যা বলছেন পরিবেশবিদ ও এলাকাবাসী
গাইবান্ধা পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক ওয়াজিউর রহমান র্যাফেল বলেন, লেকের কাজে অনিয়ম আর লুটপাট হয়েছে। তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তাদের কারণে অসমাপ্ত কাজ আর তদারকির অভাবে ঘাঘট লেক আজ ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
লেকপাড়ের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলম হিরো জানান, পুরাতন ঘাঘট নদীর ওপর দৃষ্টিনন্দন লেকের স্বপ্ন দেখেছিল এলাকাবাসী। দুটি সেতু হলেও সন্ধ্যায় সেখানে বাতি থাকে না। চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা হয়নি আজও।
৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ও চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক বাবুল ইসলাম জানান, ময়লা আবর্জনার কারণে মশার ডিপোতে পরিণত হয়েছে লেকটি। শিশুদের খেলনাগুলো চুরি হয়ে গেছে। লেকটিকে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন করতে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য
কাজের অনিয়ম নিয়ে কথা বলতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মো. খাইরুল কবির রানার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তাঁর মোবাইল ফোনে কল দিলেও সাড়া মেলেনি।
তৎকালীন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ছাবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, কাজ শেষ না করায় ঠিকাদারকে এক কোটি টাকা কম দেওয়া হয়েছে। অসমাপ্ত কাজের পরও কেন বিল ছাড় করা হলো জানতে চাইলে উত্তর দেননি এ প্রকৌশলী।
গাইবান্ধা এলজিইডির বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জ্বল চৌধুরী বলেন, ‘আমি যোগদানের আগেই লেকের প্রকল্প শেষ হয়েছে। সে কারণে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছি না।’ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর হানিফ সর্দার বলেন, ‘লেকের কাজ শেষ হয়নি। তাই এলজিইডি থেকে বুঝে নিইনি। তবে লেকটির পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য সাত লাখ টাকা খরচ করেছে পৌরসভা।’
জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জম আহম্মদ বলেন, সম্প্রতি ডিজিটাল সার্ভে করা হয়েছে। শিগগিরই ঘাঘট লেককে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ কাজের দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার চিন্তাভাবনাও রয়েছে।
- বিষয় :
- ব্যয় পরিশোধ
