অপহরণ মামলার জেরে যাত্রাশিল্পীর চুল কেটে শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ
নির্যাতনের শিকার নারী।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০২৫ | ০৩:৩১
নিজের ছেলেকে অপহরণের মামলা করেছিলেন। সেজন্য রুপা আক্তার নামে এক যাত্রাশিল্পীকে প্রকাশ্যে মারধর করে, তার চুল কেটে এবং মুখে কালি মাখিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় সংবাদ সম্মেলন করেছেন ভুক্তভোগী নারী। তিনি যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সদস্য।
ঘটনার পরপরই রুপা আক্তারের মুখে কালি মাখানো ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছবি দেখে নেটিজেনরা নিন্দা জানান এবং দোষীদের অবিলম্বে শাস্তির দাবি তোলেন। ফেসবুকে ছবি ছড়িয়ে পড়ার পরদিন বৃহস্পতিবার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।
আসক বিবৃতিতে বলেছে, ১২ নভেম্বর কয়েকজন দুর্বৃত্ত এই নারী নৃত্যশিল্পীকে প্রকাশ্যে মারধর, চুল কেটে দেওয়া এবং মুখে কালি মাখিয়ে হেনস্তা করে। সংস্থাটি এই ঘটনাকে শুধু একজন নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার ওপর আঘাত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিশ্রুত মৌলিক অধিকারের স্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
আসক আরও উল্লেখ করেছে, প্রকাশ্যে একজন নারীর ওপর এমন নিষ্ঠুর নির্যাতন দণ্ডবিধিতে নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন ও শ্লীলতাহানির অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত। এটি নারীর মর্যাদার প্রতি সরাসরি আঘাত। সংস্থাটি অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি করার এবং ভুক্তভোগী নারীর নিরাপত্তা, চিকিৎসা, সামাজিক ও আইনি সহায়তা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।
নির্যাতনের শিকার নৃত্যশিল্পী রুপা আক্তার গত বৃহস্পতিবার রাতেই কোতোয়ালি থানায় মামলা করেছেন। মামলার পর পুলিশ নগরীর জুবলীঘাট এলাকা থেকে শাহ আলম নামে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
গ্রেপ্তার শাহ আলম মামলার ৩ নম্বর আসামি। তিনি নগরীর চর কালীবাড়ি এলাকার মো. রাশেদের ছেলে। নির্যাতনের শিকার রুপা নগরীর বড় কালীবাড়ি শহিদুল ইসলামের স্ত্রী এবং বর্তমানে তারা পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন।
নির্যাতনের নেপথ্যে জমি ও চাঁদা দাবি
রুপা সমকালকে জানায়, প্রায় ১৫ বছর আগে তিনি বড় কালীবাড়ি লোকনাথ মন্দির এলাকার ব্রহ্মপুত্রের তীরের একটি বস্তিতে বাস্তুহারা সমবায় সমিতির কাছ থেকে ৩ লাখ টাকায় জমি কেনেন। গত বছর সেখানে ঘর তৈরি করতে গেলে সমবায় সমিতির সদস্য শাহ আলম চাঁদা দাবি করেন। ১ লাখ টাকা দেওয়ার পর তিনি আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করেন।
টাকা না পেয়ে গত বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর রুপার বাড়িতে হামলা করা হয়। এ ঘটনায় রুপা আদালতে মামলা করেন। এরপর ক্ষিপ্ত হয়ে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল রুপার অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে রনি সুলতানকে অপহরণ করা হয়। এই ঘটনায় অপহরণ মামলা করলে ৯ এপ্রিল আসামি শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
জানা গেছে, রুপার করা ভাঙচুর মামলার তদন্ত করতে পুলিশ গত বুধবার দুপুরে ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ চলে যাওয়ার পরই প্রতিপক্ষ রাস্তায় রুপাকে ধরে নিয়ে একটি গোপন কক্ষে বেঁধে মারধর করে, চুল কেটে ও মুখে কালি মেখে হেনস্তা করে। এ সময় তার সামনে মাদক ও টাকা রেখে ভিডিও ধারণ করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে রুপার স্বামী জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করলে পুলিশ গিয়ে তাকে উদ্ধার করে।
রুপা আক্তার বলেন, ‘পুলিশ চলে যাওয়ার পরই আমাকে রাস্তায় ধরে নিয়ে গিয়ে বেঁধে চুল কেটে মুখে কালি মেখে দেয়। আমি বিচার চাই।’ তার অভিযোগ, কোতোয়ালি থানার ওসির সঙ্গে আসামিদের গোপন সখ্য রয়েছে। অপহরণ মামলার এক নারী আসামি ওসির সঙ্গে থানায় টিকটক করেন। একজনকে আটক করার পর পরই তিনি আবার জামিনে বের হয়ে যান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মাসুদ জামেলী জানান, দুটি পরিবারের মধ্যে আগে থেকেই মামলা চলছিল এবং অপহরণ মামলার আসামিরা জামিনে ছিলেন। আরেকটি ভাঙচুর মামলার তদন্ত শেষে পুলিশ ফিরে আসার পরই রুপার ওপর নির্যাতন চালায় প্রতিপক্ষ।
কোতোয়ালি থানার ওসি শিবিরুল ইসলাম বলেন, ‘মামলা তদন্ত করে পুলিশ ফিরে আসার পর ওই নারীর সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে।’ আসামিদের সঙ্গে সখ্য প্রসঙ্গে তিনি জানান, ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকতেই পারে। মামলা হওয়ার পরে আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু আদালতে হাজির করার পরে যদি জামিনে বের হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে তাদের কিছু করার নেই।
- বিষয় :
- ময়মনসিংহ
- নির্যাতন
- শারীরিক নির্যাতন