বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল অচল
৩৫ টাকা নিয়ে বিরোধ কোটি টাকার ক্ষতি
অনির্দিষ্টকাল পরিবহন ধর্মঘট চলছে
পরিবহন শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের বিরোধে শনিবার রাতে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ২০০ বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। ছবি-সংগৃহীত
বরিশাল ব্যুরো
প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৫:৪১
বরিশাল নগরের নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় টার্মিনালে বাসের একটি রুট হলো মেঘনা তীরে হিজলা উপজেলা পর্যন্ত। এ রুটে মুলাদী উপজেলা পর্যন্ত ৭০ টাকা ভাড়া। শিক্ষার্থী পরিচয়ে অর্ধেক ৩৫ টাকা। এই ৩৫ টাকার জন্য পরিবহন শ্রমিক ও শিক্ষার্থীদের বিরোধে শনিবার রাতে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে ২০০ বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। এতে অন্তত কোটি টাকার সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। এর রেশে গতকাল রোববার থেকে অনির্দিষ্টকাল পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে।
জানা গেছে, ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আবু বক্কর শনিবার বিকেলে মুলাদী থেকে বাসে বরিশালে যান। ছাত্র পরিচয়ে তিনি ৩৫ টাকা দিতে চেয়েছিলেন। শনিবার বন্ধের দিন অর্ধেক নিতে অস্বীকার করেন জোহান পরিবহনের সুপারভাইজার। এ নিয়ে বিরোধের জেরে বিএম কলেজের কয়েকশ শিক্ষার্থী সন্ধ্যা ৭টা থেকে থেকে প্রায় দুই ঘণ্টা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে তাণ্ডব চালিয়েছেন। গণহারে বাস ভাঙচুর, দুটিতে অগ্নিসংযোগ এবং শ্রমিক ইউনিয়ন কার্যালয় ও দূরপাল্লা পরিবহনের কাউন্টারগুলো ভাঙচুর ও লুট করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তখন পুলিশ ছিল নিষ্ক্রিয়। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে শিক্ষার্থীদের লাঠিচার্জ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রায় আধা কিলোমিটার দূরত্বে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল ও বিএম কলেজ অবস্থিত।
গতকাল রোববার দুপুরে বাস টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, গ্লাস ভাঙচুর হয়নি এমন বাস নেই একটিও। সর্বত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা কাচের টুকরো। আগুন দেওয়ার পর দ্রুত নেভানো হলেও দুটি বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাসহ দক্ষিণাঞ্চলের পাঁচ জেলার দূরপাল্লার বাস নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় টার্মিনাল পার করতে হয়। দুপুর ১২টার পর শ্রমিকরা এসব রুটের বাসও আটকে দিয়েছেন।
মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার হোসেনের দাবি, দুটিতে আগুনসহ প্রায় ২০০ বাস ভাঙচুর করা হয়েছে। কাউন্টারগুলোতে নগদ অর্থ, ল্যাপটপ লুটসহ ক্ষতির পরিমাণ তিন কোটি টাকা। এত গ্লাস একসঙ্গে বরিশালে পাওয়া যাবে না। তাই সব গাড়ি সংস্কার করতে কিছুটা সময় লাগবে।
স্থানীয়রা জানান, বাস টার্মিনালে শিক্ষার্থীদের তাণ্ডবের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে সমালোচিত হয়েছে। তেমনি সব শ্রেণির যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার নিয়েও আলোচনা রয়েছে। শ্রমিকদের দুর্ব্যবহারের জন্য বেশির ভাগ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সূত্রপাত হয়।
বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের গত বছর ১৮ আগস্ট দেওয়া অফিস আদেশের একটি অনুলিপি সমকালের হাতে পৌঁছেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, জেলা বাস মালিক গ্রুপের অধীন সব বাসে শিক্ষার্থীদের অর্ধেক ভাড়া নেওয়া হবে। সাপ্তাহিক বন্ধের দিনও এ নিয়ম কার্যকর। কাউন্টার ক্লার্ক কিংবা পরিবহন শ্রমিক অর্ধেক ভাড়া নিতে অনীহা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শনিবারের ঘটনার জন্য পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে দুটি অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। অফিস নোটিশটির সত্যতা স্বীকার করেছেন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার। অভিযুক্ত শ্রমিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি।’
হামলার সময় ঘটনাস্থলে থাকা ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশের বিএম কলেজ শাখার সদ্য সাবেক সভাপতি হাসান রাজু বলেন, মুলাদীর বাসে হেনস্তার শিকার আবু বক্কর ছাত্র আন্দোলনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। সে লাঞ্ছিত হওয়ার খবর পেয়ে বিভিন্ন স্কুল, কলেজের শিক্ষার্থীরা বাস টার্মিনালে যায়। ছাত্ররা বাস ভাঙচুর করেছে। আবার কিছু বাস শ্রমিক ভাঙচুর ও আগুন দিয়েছে।
তিনি জানান, টেম্পো শ্রমিকদের সঙ্গে বাস মালিকদের জেরে তৃতীয় পক্ষও বাস ভাঙচুর করতে পারে। হামলার সময় পুলিশ নীরব দর্শক ছিল।
গত বছরের আগস্টে পট পরিবর্তনের পর বাস মালিক সমিতির সভাপতি ও টার্মিনালের নিয়ন্ত্রক হন মোশারফ হোসেন। তিনি বিএনপির উপদেষ্টা ও বরিশাল-৫ (মহানগর-সদর) আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের ভাই। এ নিয়ে বিরোধের জেরেও বাস টার্মিনালের অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে দাবি রাজুর।
শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার প্রসঙ্গে বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, এ জন্য মালিকরা দায়ী। তারা শ্রমিকদের আয়ের টার্গেট বেঁধে দেন। মজুরিতে শ্রম আইন মানা হয় না। তাই আয় বাড়াতে যাত্রীদের হেনস্তা করেন শ্রমিকরা। আইনের আশ্রয় না নিয়ে শিক্ষার্থীদের তাণ্ডব মেনে নেওয়ার মতো নয়।
বিএম কলেজের অধ্যক্ষ শেখ মো. তাজুল ইসলাম বলেন, শনিবার রাতের ঘটনায় সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ টোকাইরাও ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় তৃতীয় শক্তির ইন্ধন থাকতে পারে। রাতের অন্ধকারে কারা ভাঙচুর করেছে, তা চিহ্নিত করা দরকার। আমাদের ২০ জনের মতো ছাত্র আহত হয়েছে। অধ্যক্ষ বলেন, সমস্যা সমাধানে মালিক সমিতি ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গতকাল রোববার বরিশাল সফর করেন। কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে হামলার সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা প্রসঙ্গটি সাংবাদিকরা তুললে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
