উদ্বোধনের আগেই পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের চারতলা ভবনে ফাটল
পৌনে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত জামালপুরের গুঠাইল পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের নবনির্মিত চারতলা ভবনে উদ্বোধনের আগেই ফাটল ধরায় নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সমকাল
আনোয়ার হোসেন মিন্টু, জামালপুর
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৭:০৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
উদ্বোধনের আগেই দেয়ালে দেয়ালে ফাটল ধরেছে জামালপুরের ইসলামপুর থানার অধীন গুঠাইল পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের চারতলা ভবনে। পৌনে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত নতুন ভবনে কাজ শুরুর আগেই ফাটল ধরায় নির্মাণকাজের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি ভবনটিতে ১০ সদস্যের পুলিশের একটি দল অবস্থান করলেও ভূমিকম্পের ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন তারা। তবে এর কিছুই জানেন না ভবন নির্মাণকারী সংস্থা গণপূর্ত বিভাগ। পুলিশ সুপার বলছেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
জানা গেছে, ইসলামপুরে যমুনা নদীর চরাঞ্চল ও তীরবর্তী অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষার স্বার্থে গুঠাইলে পুলিশ তদন্তকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ৬৬ শতাংশ জমির ওপর ছয়তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে চারতলা ভবন নির্মাণের জন্য ২০১৬ সালের জুন মাসে পৌনে ৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় কার্যাদেশ। ভবনটির প্রথম ও দ্বিতীয়তলার নির্মাণকাজ করে ময়মনসিংহ জেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মাহবুব এন্টারপ্রাইজ। এতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৯৬ লাখ ৭৯ হাজার ৫২৯ টাকা। তৃতীয় ও চতুর্থতলার কাজ করে ঝালকাঠি জেলার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইসলাম বাদ্রার্স। এতে ব্যয় হয় ১ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া ময়মনসিংহের মেসার্স নাঈমা এন্টারপ্রাইজ ১ কোটি ৩২ লাখ ৫ হাজার টাকায় ভবনের সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে। কাজ শেষে ভবনটি পুলিশ বিভাগকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর ভবনটি আর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, যেখানে ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে সেই জায়গা ছিল নিচু। ভবন নির্মাণের আগে মাটি ভরাট করা হলেও ঠিকমতো কমপ্যাক্ট করা হয়নি। মাটির নিচে বেইজ ঢালাই দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের রড ও পরিমাণের চেয়ে কম সিমেন্ট দিয়ে দুর্বলভাবে। দেয়াল নির্মাণেও ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের ইট। কাজের সময় এলাকাবাসী গণপূর্তের প্রকৌশলীদের কাছে অভিযোগ করলেও ফল হয়নি; বরং প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন গণপূর্ত প্রকৌশলীদের সঙ্গে আঁতাত করে নিম্নমানের কাজ করেছে। যে কারণে নির্মাণের পরপরই দেয়ালে দেয়ালে ফাটল ধরে পুরো ভবনটিই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ভবনের বাইরে রং দিয়ে ভবনটি ঝকঝকে দেখিয়ে জামানতের টাকাও নিয়ে গেছে তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এদিকে গুঠাইল মিয়া বাড়ি গ্রামের নামজুল মিয়া অভিযোগ করেন, তাঁর বাবা আব্দুল হাকিম ও মা খোদেজা বেগমের দান করা জমির দলিল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা করেছেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, জমিটি তাঁর মা-বাবার দান বলা হলেও দলিলটি ভুয়া। যে কারণে দলিল বাতিলের মামলা করেছেন তিনি। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ভবনটির দেয়ালে বেশ কিছু ফাটলের কথা জেনেছেন তিনি। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা না হলেও নির্বাচনের আগে যমুনা নদীর চরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের ১০ সদস্যের একটি দল ওই ভবনে উঠানো হয়েছে। আর ভবনটির ফাটলের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।
তদন্তকেন্দ্রের ইনচার্জ দেবাশিষ চন্দ্র দত্তের ভাষ্য, তারা ভবনে ওঠার পর ফাটলগুলো দেখেছেন। ভবনটির পূর্ব পাশের দেয়ালে ৩৪ ফুট, পশ্চিম পাশের দেয়ালে ৭ ফুট ও উত্তরের দেয়ালেও লম্বালম্বি আকারে বড় বড় কয়েকটি ফাটল দেখা দিয়েছে। তারপরও সরকারি দায়িত্ব পালনের স্বার্থে সেখানেই অবস্থান করছেন তারা।
জামালপুর জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, জামালপুরের গণপূর্ত বিভাগ ঘুষ-দুর্নীতির আখড়া। জেলার প্রায় সব স্থাপনা নির্মাণ কাজেই অনিয়ম-দুর্নীতি করে বদনাম কামিয়েছেন তারা। এই ভবনটির অবস্থাও একই। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার ও নির্মাণ কাজের কারণেই নব-নির্মিত ভবনটিতে একাধিক ফাটল ধরেছে। তাঁর ভাষ্য, সারাদেশে যেভাবে ভূমিকম্প দেখা দিচ্ছে। তাতে ফাটল ধরা ভবনে দায়িত্ব পালন ও বসবাস করা পুলিশ সদস্যদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য ঠিকাদারদের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের নম্বর বন্ধ পাওয়া গেছে। কথা বলার জন্য গত বৃহস্পতিবার জামালপুর গণপূর্ত অফিসে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীকে পাওয়া যায়নি। মোবাইল ফোনে কথা হয় উপবিভাগীয় প্রকৌশলী কামরুল হাসানের সঙ্গে। গুঠাইল পুলিশ তদন্তকেন্দ্রের নতুন ভবনে ফাটলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তারা কিছুই জানেন না। তবে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
- বিষয় :
- ভবন ধস
